জন কীটস
কীটস তখন ইতালী-তে। মৃত্যু শয্যায়। একদিন রাত্রে হঠাৎ তিনি তাঁর বন্ধু সেভার্ন-কে অনুরোধ করলেন, তাঁর সমাধিস্তম্ভের ওপর যেন এই কটি কথা লিখে দেওয়া হয়: ‘হীয়ার লাইজ ওআন হুজ নেম ওআজ রিট ইন ওআটার।’
বলা বাহুল্য এ গভীর অন্ধকারের কণ্ঠস্বর, বুক-ভাঙা নৈরাশ্যের আর্তনাদ। এ সত্য নয়, একেবারে সত্য নয়। কিন্তু কী দুঃখের কথা, তার কাছে তখন এটাই সত্য ছিল। তিনি যে ইতিমধ্যেই আশ্চর্য ও অবিস্মরণীয় কাব্য সৃষ্টি করেছেন এবং সবার অলক্ষ্যে তাঁর নাম যে সাহিত্যের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে তা তিনি অনুভব করতে পারেন নি। সেই দুঃখ, ব্যর্থতা ও নৈরাশ্যের দিনে তা অনুভব করাও বোধহয় সম্ভব ছিল না। অবশ্য তাঁর প্রতিভা সম্পর্কে তিনি যথেষ্টই সচেতন ছিলেন। প্রথম জীবনে তিনি সত্যিই মনে করতেন তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর নাম অবশ্যই ইংরেজ কবিদের মধ্যে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কিন্তু তখন বোধহয় তিনি ভাবতেও পারেন নি যে তাঁর জীবন এত শীঘ্র ক্ষয় হয়ে যাবে। তাছাড়া পরবর্তীকালে সাহিত্য-জীবনে বারবার বাস্তব অসাফল্য, তাঁর কবিতার কুৎসিত ও কঠোর সমালোচনা এবং সর্বোপরি তাঁর নিজের দারুণ অসুস্থতা তাঁর বিশ্বাসের মূল বোধহয় কিছুটা শিথিল করে দিয়েছিল। কিন্তু তবু সেই নৈরাশ্য, ব্যর্থতা ও অসুস্থতার মধ্যেও তিনি মনে করতেন, যদি আর কিছুকাল বাঁচেন তা হলে তিনি নিশ্চিত স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
কয়েকজন গুণগ্রাহী উদারহৃদয় বন্ধু ছাড়া এই পৃথিবী কীটস-এর প্রতি সদয় ছিল না। হৃদয়হীন মানুষ বারবার তাঁর গভীর সংবেদনশীল মনে নিষ্ঠুর আঘাত দিয়েছে। তাছাড়া প্রায় জন্মের পর হতেই দুর্ভাগ্য তাঁকে যেন বন্য জন্তুর মতই তাড়া করে ফিরেছে। তাই রোগে, দুঃখে ও হতাশায় মাত্র পঁচিশ বছরের মধ্যেই এই অত্যাশ্চর্য প্রতিভার আশ্চর্য জীবন শেষ হয়ে গেল। পরবর্তী যুগের মানুষ সে-কথা বারবার ভেবেছে আর এই হতভাগ্য কবির জন্য অশ্রু মোচন করেছে। সকলেই আক্ষেপ করেছেন, আহা, কীটস যদি আর কিছুদিন বাঁচতেন! পরবর্তী কালে টেনিসন তাঁকে ওআর্ডসওআর্থ, কোলরিজ, বায়রন, শেলী—সকলের উপরে স্থান দিয়েছেন। টেনিসন স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘তিনি বেঁচে থাকলে আমাদের সকলের চেয়ে বড় হতেন।’ রসেটি বলেছেন, ‘তাঁর সমসাময়িক খ্যাতনামা কবিদের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র সেক্সপীয়র-এর সত্যিকার উত্তরাধিকারী।’
তাঁর অকাল-মৃত্যু তাই কাব্য-প্রেমী মানুষমাত্রকেই চিরদিন দুঃখ দিয়েছে এবং দেবে। আর এই মৃত্যুই বা কী নিষ্করুণ! আজও তাঁর বিস্তৃত জীবন পাঠ করলে অশ্রু রোধ করে রাখা যায় না। অন্তত আমি তো কোনোদিন পারি নি।
১৭৯৫ সালের ৩১শে অক্টোবর ফিন্সবারি পেভমেন্ট-এ বিখ্যাত ইংরেজ কবি জন কীটস-এর জন্ম হয়। তাঁর বাবা-মা সম্পর্কে সামান্যই জানা যায়। তাঁর বাবা টমাস কীটস নাকি অশ্বপালন প্রতিষ্ঠান ‘সোয়ান এ্যাণ্ড হুপ’-এর প্রধান অশ্বরক্ষক ছিলেন। কীভাবে যেন তিনি পরে তাঁর মনিবের কন্যাকে বিবাহ করেন। এবং এই বিবাহের পরবৎসরই কবি জন কীটস-এর জন্ম হয়। কীটস-এর দুর্ভাগ্য, শৈশবেই তিনি তাঁর বাবাকে হারান। ১৮০৪ সালে হঠাৎ ঘোড়া হতে পড়ে যাওয়ার ফলে টমাস কীটস-এর মৃত্যু হয়।
কীটস-এর মায়ের সম্বন্ধে শুধু এইটুকু জানা যায় যে তিনি অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও বুদ্ধিমতী মহিলা ছিলেন। তিনি অতিশয় সন্তানবৎসলও ছিলেন। বিশেষত তাঁর বড় ছেলে জন-এর প্রতি তিনি একরূপ স্নেহান্ধ ছিলেন বললেও অত্যুক্তি হয় না। জন-এর সবকিছু খেয়াল-খুশীকেই তিনি প্রশ্রয়ের চোখে দেখতেন। আর জন-এরও খেয়াল-খুশী বা শখের যেন অন্ত ছিল না। ছেলেটা ঠিক অদ্ভুত প্রকৃতির না-হলেও সত্যিই ছিল কিছুটা অন্য ধরনের।
জন-ও তাঁর মাকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। অবশ্য মাকে কোন্ ছেলেই বা গভীরভাবে ভালো না বাসে! তবু তার মধ্যেও কিছু বিশেষত্ব ছিল। কিন্তু এমনই দুঃখের কথা, এই মাকেও তিনি মাত্র পনেরো বছর বয়সের সময় হারালেন। মায়ের টিবি হয়েছিল। অনেকদিন ভুগেছিলেন তিনি।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments