লেভ টলস্টয়
ইংল্যাণ্ড যদি শ্রেষ্ঠ নাট্যকারের জন্য গর্ব করে তা হলে রাশিয়াও শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকের জন্য গর্ববোধ করতে পারে। টলস্টয় নিঃসন্দেহে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক। তাঁর লেখা ‘ওঅর অ্যাণ্ড পীস’, ‘আনা কারেনিনা’, ‘রেসারেক্শন’ প্রভৃতি উপন্যাস বিশ্বসাহিত্যে বিস্ময়কর অবদান। এর মধ্যে ‘ওঅর অ্যাণ্ড পীস’ সত্যিই অতুলনীয়। এটিকে সার্থকভাবেই ‘এপিক উপন্যাস’ বলা চলে। এক বিরাট ক্যানভাসের ওপর আশ্চর্য দক্ষতার সঙ্গে তিনি যে-সব চিত্ৰ অঙ্কিত করেছেন তা দেখে শুধু মুগ্ধ হওয়া নয়, বিস্মিতও হতে হয়।
এই বৃহৎ ও মহৎ উপন্যাসের বিস্তৃত ক্ষেত্রে প্রায় শ পাঁচেক চরিত্রের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় এবং আশ্চর্য, তাদের প্রায় সকলকেই রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষ বলে বোধহয়। কয়েকটি প্রতিনিধিমূলক নারী ও পুরুষ চরিত্রকে বিদেশী আমরাও যেন একান্ত চেনা ও জানা বলে অনুভব করতে পারি। বলা বাহুল্য, এই সাফল্য সাধারণ শক্তিতে সম্ভব নয়। সত্যিই তাঁর অনন্যসাধারণ প্রতিভার পরিচয়ে বিহ্বল হয়ে পড়তে হয়। টলস্টয়-এর সমসাময়িক জনৈক বিখ্যাত রুশ সমালোচক ‘ওঅর অ্যাণ্ড পীস’ সম্বন্ধে তাঁর অভিমত কয়েকটি কথায় চমৎকার ভাবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ওঅর অ্যাণ্ড পীস’ হচ্ছে মানবজীবনেরই পূর্ণাঙ্গ ছবি, তৎকালীন সমগ্র রাশিয়ার সম্পূর্ণ চিত্র এবং জনসাধারণের ইতিহাস, সংগ্রাম ও সব কিছুর আলেখ্য যার ভিতর দিয়ে জনগণ তাঁদের সুখ, দুঃখ, বেদনা ও মহত্ত্ব অনুভব করতে পারেন।
এ কথা বলা নিষ্প্রয়োজন যে কথাশিল্পী টলস্টয় বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে চিরদিনই বিস্ময়ের কারণ হয়ে থাকবেন। এবং এ-ও বলা নিষ্প্রয়োজন যে এই কথাসাহিত্যিকের আশ্চর্য পরিচয় ছাড়াও তাঁর আরও একটি বিশেষ পরিচয় আছে। তা হচ্ছে ঋষি ও দার্শনিক টলস্টয়ের পরিচয়। অবশ্য অনেকের মতে সাহিত্যস্রষ্টা টলস্টয়-এর তুলনায় ঋষি টলস্টয় অনেক নিষ্প্রভ। কিন্তু তা হলেও এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে একদা ঋষি টলস্টয়-এর চিন্তাধারায় পৃথিবীর বহু মানুষ প্রভাবিত হয়েছেন। আমাদের গান্ধীজীও তাঁদের মধ্যে একজন। ঋষি টলস্টয় খ্রীস্ট ও বুদ্ধের বিশেষ ভক্ত ছিলেন। খ্রীস্ট ও বুদ্ধ সম্বন্ধে কিছু বলতে গেলে তিনি আবেগে গদগদ হয়ে উঠতেন। তিনি অহিংসারও পূর্ণ সমর্থক ছিলেন। একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যাক। একবার গোর্কি তাঁকে বলেন, ‘যে সব সক্রিয় লোক জীবনের অন্যায়কে যে-কোনো উপায়ে, এমন কি হিংসার দ্বারাও প্রতিরোধ করতে চান, তাঁদের আমি পছন্দ করি।’
শুনে টলস্টয় গোর্কির হাতটা সস্নেহে টেনে নিয়ে শুধু বলেন, ‘কিন্তু হিংসাটাই যে সবচেয়ে বড় অন্যায়। তুমি এই স্বত-বিরোধিতার হাত থেকে কেমন করে রক্ষা পাবে?’
বস্তুত টলস্টয় খ্রীস্ট ও বুদ্ধের অহিংসামন্ত্রে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তবে তাঁদের একান্ত অনুরাগী ভক্ত হলেও তাঁদের জীবনের অলৌকিক সব গালগল্প বিশ্বাস করতেন না। তিনি সব কিছুই তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও নিজস্ব যুক্তির দ্বারা পরিচ্ছন্ন করে তবে গ্রহণ করতেন। তাঁর চিন্তায় ও কর্মে সততা ও আন্তরিকতাও ছিল অপূর্ব। তিনি যা চিন্তা করতেন বোধহয় শুধুমাত্র তা-ই বলতেন এবং প্রাণপণে তা করার চেষ্টা করতেন। মুখে একরকম বলে কাজে আর একরকম করা তাঁর প্রকৃতিতে ছিল না। অন্তত তা করতে তিনি বিশেষ যন্ত্রণাবোধ করতেন। এজন্য তিনি জীবনে প্রচুর ত্যাগ স্বীকার করেছেন। একে একে তিনি সর্বপ্রকার দৈহিক ভোগসুখ ত্যাগ করেছেন, শীতের দেশে যথেষ্ট প্রয়োজনীয় তাঁর চিরদিনের মদ্যপানের অভ্যাস ছেড়ে দিয়েছেন এবং এমন কি অনেক চেষ্টায় অবশেষে তাঁর সামান্য ধূমপানের অভ্যাসও ত্যাগ করেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি যে মারা গেলেন তাও একরকম তাঁর অন্তরের আদেশ রক্ষা করার জন্যই বলা চলে। সুতরাং এ কথা নিঃসংশয়ে বলা যেতে পারে যে শুধু স্রষ্টা টলস্টয়ই নয়, ঋষি টলস্টয়, মানুষ টলস্টয়, প্রত্যেকেই ছিলেন অসাধারণ, অসামান্য এবং সমকালে তুলনারহিত।
এই আশ্চর্য মানুষটি ১৮২৮ সালে রাশিয়ায় তাঁর মায়ের পৈত্রিক বাসস্থান ইয়াস্নায়া পোলানা-তে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments