ভূমিকা: লেখকদের প্রেম
কয়েকজন বিশ্ববিখ্যাত বিদেশী লেখকের প্রেম-জীবন সম্পর্কে কিছু আভাস দিতে উদ্যত হয়ে আমার মনে হচ্ছে সর্বপ্রথম প্রেম সম্বন্ধেও কিছু লেখা প্রয়োজন। অবশ্য, বলাই বাহুল্য, প্রেম সম্বন্ধে কিছু লেখা খুব সহজ নয়। প্রেম বোধহয় জীবনের মতই গভীর রহস্যময়। জীবনের মতই এর অসংখ্য দিক ও অসংখ্য লক্ষ্য। তার কিছু আলোকিত, কিছু অন্ধকার। অন্ধকারই মনে হয় বেশী। তাছাড়া বিচিত্র এর গতি ও প্রকৃতি। সম্পূর্ণ না হলেও তার অনেকখানিই আজও দুর্বোধ ও দুর্জ্ঞেয়।
তাই প্রেমের কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞার্থ নির্দেশ করা শক্ত। বিভিন্ন ব্যক্তিকে আশ্রয় করে তা বিভিন্নভাবে উৎসারিত। কখনো তা শুধুমাত্র দেহের ভূমিতেই আবদ্ধ, কখনো তা অদৃশ্য পাখায় ভর করে আকাশচারী। আবার কখনো তা আকাশ ও মৃত্তিকায় সমান স্বচ্ছন্দচারী।
অবশ্য অনেকে মনে করেন আকাশচারী বা প্লেটনিক প্রেম একেবারেই সম্ভব নয়। সুতরাং কামহীন প্রেম সোনার পাথর বাটির মতই অসম্ভব বস্তু। তাঁদের মতে দেহলিপ্সা-পরিশূন্য যে-প্রেম তা সম্পূর্ণ অবাস্তব এবং এই ধরনের প্রেম বলে যা সচরাচর পরিচিত তা একরকম ‘পারভারশন’। তাঁরা বলেন কামই হচ্ছে প্রেম। প্রেম কামেরই ভদ্ৰ নাম ৷ যেমন খেঁদির ভালো নাম মঞ্জুলা বা মনীষা।
আবার কেউ কেউ বলেন, প্রেম কাম হতে উদ্ভুত হলেও পরিপূর্ণ অর্থে তা কাম নয়। প্রেম কামের অত্যন্ত সুপরিস্রুত সুকুমার অংশ। অনেক অবস্থার মধ্য দিয়ে পরিশুদ্ধ হয়ে তবে কাম একদা প্রেমে পরিণত বা রূপান্তরিত হয়। প্রথমে দেহাশ্রিত হলেও পরে তা দেহাতীত অবস্থায় এসে পৌঁছয় এবং তখনই তাকে প্রকৃত প্ৰেম বলা চলে। অপরাজিতার বীজকে যেমন অপরাজিতা ফুল বলা চলে না তেমনি কামকেও প্রেম নয়। দিনে দিনে ধীরে ধীরে সভ্যতা ও সংস্কৃতিই মানুষের অন্তরে প্রেমের জন্ম দিয়েছে। প্রেমই মানুষের মহোত্তম অনুভূতি এবং মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।
বলা বাহুল্য বিষয়টি বিতর্কমূলক। এবং যে-অনুভূতি সম্পূর্ণ আপেক্ষিক ও সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তির প্রকৃতিনির্ভর তাতে তর্কের সম্ভাবনা থাকবেই। তবু কোনো রকম তর্কের মধ্যে প্রবেশ না করেও বলা চলে যে, যে-চরিত্রেরই হোক, প্রেম সুদূর অতীতেও ছিল, বর্তমানেও আছে এবং হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবে। বাঁচার ইচ্ছার মত প্রেমের তৃষ্ণাও বোধহয় মানুষের সহজাত।
যাই হোক, দেখা যায় প্রেম বহুবিধ অর্থেই ব্যবহৃত হয়। কখনো সে শুধুমাত্র সম্ভোগেচ্ছা, কখনো সে বিশুদ্ধ ভালোবাসার তৃষ্ণা। কখনো সে মূর্ত, আবার কখনো সে অদৃশ্য, অনির্ণেয়, অনির্বচনীয়।
বিচিত্র প্রেমের গতি ও প্রকৃতি। কখন সে জাগে, কখন সে ঘুমোয়, কখন সে আসে, কখন সে যায় তার কোনোই স্থিরতা নেই। কখন যে সে হাসে, কখন যে সে কাঁদে তারও কোনো ঠিক নেই। কাঁদেই বোধহয় বেশী। প্রেম সুখের জন্য নয়—একথা বহু কবি ও মনীষীই বলেছেন।—‘ভালোবেসে যদি সুখ নাহি তবে কেন মিছে ভালোবাসা!’—অন্তরে এই অবাক প্রশ্ন অনেকেরই। —মনে হয় গভীর প্রেম হয়তো গভীর দুঃখ ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই ‘দুঁহু কোরে দুঁহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া।’
অভিজ্ঞজনেরা বলেন—যারা সুখের জন্য প্রেমের পিছু ঘোরে তারা কিছুই পায় না,—না প্রেম,—না সুখ। কবিও বলেছেন—‘ওরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না,—সুখও চলে যায়।’
তাই মনে হয় গভীরতম এবং মধুরতম বেদনাই প্রেমের প্রধানতম অঙ্গীকার। তবু আশ্চর্য, মানুষের অন্তরে প্রেমের তৃষ্ণা অনির্বাণ। স্থুল, সূক্ষ্ম, ব্যাপক বা গভীর যে-কোনো অর্থেই হোক, প্রেমের অনুভূতি ছাড়া জীবন যেন শূন্য, শূন্য,—বড় শূন্য। প্রেমের যাদুকরী স্পর্শ ব্যতীত জীবনের যেন কোনো অর্থই থাকে না। তাই প্রেম যত ক্ষণস্থায়ী হোক, প্রেমের জন্য প্রায় সকলেই আকুল। কবি শেলীও বলেছেন,—‘I love love though he has wings and like light can flee.’
কিন্তু যাক এসব কথা। এসব কথার শেষ নেই। সুতরাং বিশেষ করে লেখক বা সাহিত্যস্রষ্টাদের প্রেম সম্পর্কে আর দুচার কথা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments