'আভালাঁশ' ট্যাঙ্কারের পশ্চাদ্ভাগ উত্তোলন
লেখক: রিয়ার-অ্যাডমিরাল সের্গিয়েই পাভিচ্ জুয়েল্কো
পানি থেকে ছিন্নভিন্ন কালো পাহাড়ের মতো 'আভালাঁশে'র পিছন দিক উত্তোলনের কাজ শুরুর পূর্বে ডুবুরীদের জন্য প্রশিক্ষণ নেওয়ার কিছু পদ চালু করা হয়েছিল। প্রশিক্ষণের দ্বারা আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য বিশেষ কিছু অনুশীলনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। কয়েক বার পানির তলদেশে যাওয়ার পরে একেকজন ডুবুরীকে যার যার কর্মক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হত। ডুবুরীদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন জাহাজটির উদ্ধারকাজে ইঞ্জিনিয়ার ইয়েঙ্গেনি লেগোশিন। একইসঙ্গে ডুবুরীদের প্রশিক্ষণদান আর বাস্তব উদ্ধার কাজ করানো এক কঠিন কর্ম সন্দেহ নেই। শুরুতে জাহাজের বডি হাত দিয়ে পরীক্ষা করতে হল। জাহাজের এই বাইরের শরীরটা ৪ হাজার বর্গমিটারের; এটি পরীক্ষার পরে জাহাজের ভিতরের কক্ষগুলো পরীক্ষার দরকার ছিল। প্রথম ডুবুরীরা জাহাজের পশ্চাদ্ভাগ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, কিন্তু এর কোনো ছবি তাঁরা আঁকতে পারেন নি। ঘোলাটে পানিতে ট্যাঙ্কারের অবয়ব বুঝতে পারা প্রায় অসম্ভব ছিল। আর জাহাজের বেশির ভাগই ছিল পলিমাটির আস্তরণে ঢাকা।
জাহাজের ভিতরে লোহার বডির ধারালো কিনারার মাঝ দিয়ে এক-পা এক-পা করে ডুবুরীরা প্রয়োজনীয় কক্ষে ঢুকত, জরুরি কাজ নিষ্পন্ন করে ফিরে আসত।
রোজ একই ডুবুরী একাধিক স্থানে কাজ করে নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছিল। পলিমাটি সরিয়ে ফাটলগুলো মেরামতের চেষ্টা চলছিল। এ পর্যায়ে ডুবুরীদের কিছু নতুন বন্ধু জুটেছিল। পানির নিচে ডুবুরীদের কাজ করার সময়ে তাদের আশপাশে ঘুরঘুর করতো ডলফিন বা শুশুক। ডুবুরীরা তামাসা করে তাদের ডাকত 'ভাইজান' বলে। আদতে শুশুক পানির নিচে চোখে দেখে না, নাক দিয়ে শুঁকে শুঁকে তারা চলাফেরা করে। তারা নিঃশব্দে কর্মরত ডুবুরীর কাছে এসে সরু নাক দিয়ে 'ধাক্কা' দিত। প্রথম প্রথম এদেরকে হাঙ্গর মনে করে ডুবুরীরা তৎক্ষণাৎ ভয় পেয়ে পালাত। পরে যখন শুশুক বলে চিনতে পারল তখন তারা ওদের সঙ্গে খেলা করত। কর্ণফুলীর একঘেয়ে অন্ধকারে শুশুকের সঙ্গ তাদের উপকারেই এল।
'ইজিতিয়ে' নামে উদ্ধারকারী জাহাজের পাটাতনে রশি, পোন্টুন, কাঠের ঢাল পুরোদমে তৈরি করা হচ্ছিল। এসব কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সিনিয়র নাবিক আলেক্সান্ন্দ্র ব্রোখিন্। তাঁকে সাহায্য করছিলেন পিলুগিন্ এবং ক্লেসেনে নামে দুই নাবিক। 'ইজিল্মেতিয়েত্'-এর ক্যাপ্টেন ভাদিমির শের্বাকভ্ তাঁর নাবিকদের কাজকর্মে খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন। প্রথম অভিজ্ঞতার স্বাদ না পাওয়া পর্যন্ত কাজটাকে কঠিন মনে হয়েছিল। কিন্তু কাজটা রপ্ত হয়ে গেলে নাবিকরা হাসিমুখে কাজ করতে লাগল।
ট্যাঙ্কারের পিছন দিক খুবই ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। এমনকি কামানের গোলা লেগে গর্ত হয়ে গিয়েছিল এক-দেড় মিটারের। জাহাজের এই অংশের একটি দরজাও আস্ত ছিল না আর ইঞ্জিনরুম বিস্ফোরণে পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছিল। খবর পেয়ে কর্মক্ষেত্রে চলে এসেছিলেন চীফ ইঞ্জিনিয়ার মোলচান ও প্রধান ডুবুরী বন্দারেক্কো। ডুবুরীদের পুনঃপ্রশিক্ষণের কাজ তাঁদের ঘাড়ে চাপল। যান্ত্রিক ত্রুটিগুলোর সমাধানে ভূমিকা রাখলেন লেগোশিন।
জাহাজের কোন্ কোন্ জায়গা দিয়ে পানি ঢুকছে তা কাগজপত্র ছাড়া বলা যাচ্ছিল না। একেকটা পাইপ কোথা দিয়ে কোথায় যাচ্ছে কেবল হাত দিয়ে ছুঁয়ে তা বলা কঠিন ছিল। তাছাড়া ইঞ্জিনরুম ছিল পলিমাটিতে ভর্তি। সেখানে আরো নানা যন্ত্রাংশ বিশৃঙ্খলভাবে স্তূপাকারে জমে ছিল। কিছু কিছু স্থানে ডুবুরীরা প্রবেশ করাটাই অসম্ভব ছিল। অবশেষে যখন কমবেশি তথ্য পাওয়া গেল 'আভালাশ'-কে তোলার চিন্তাভাবনা শুরু হল। ২য় র্যাঙ্কের ক্যাপ্টেন লেগোশিন্ এ-কদিন এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে তাঁর বিশ্রামের সময় কখন তা নজরেই আসত না। যেখানেই কর্মরত মানুষের জটলা সেখানেই তিনি। জাহাজ উত্তোলনের ব্যাপারে তিনি নিজস্ব পরিকল্পনা জানালেন। জাহাজের সকল কক্ষ থেকে পাম্প করে পানি সরাতে হবে। যখনই কোনো কক্ষ থেকে পানি সরানো হবে তখনই ঐ কক্ষের কাজ শেষ হলেই কেবল আরেকটি কক্ষের কাজ শুরু হবে। এ পদ্ধতি ছিল খুবই দীর্ঘমেয়াদী, কিন্তু অতিশয় নির্ভরযোগ্য। কিন্তু এ পদ্ধতির সমস্যা একটাই: দরকার হবে প্রচুর শক্তিশালী পাম্প।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments