১৯০৭–১৯৮১
সত্যেন সেন
বিক্রমপুরের সোনারঙ গ্রামের এক বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী পরিবারে ১৯০৭ সালে সত্যেন সেনের জন্ম। অল্প বয়সেই তিনি অসহযোগ আন্দোলনে ও...
See more >>-
আমি আর আমার তিনজন সাথী। আমরা গত ক’দিন ধরে ইয়াহিয়ার শিকারী কুকুরগুলির সন্ধানী দৃষ্টি এড়িয়ে পূর্ববঙ্গের সীমান্ত পেরিয়ে যাবার জন্য এগিয়ে চলেছি। এসব পথ দিয়ে জীবনে কোনোদিন চলি নি। এসব গ্রামের নামও শুনি নি কোনোদিন। কুমিল্লা জেলার গ্রামাঞ্চল। কুমিল্লা জেলার সীমানা ছাড়িয়ে বর্ডারের ওপারে আগরতলায় যাব। আপাতত এইটুকুই জানি, তারপর কোথায় যাব, কি করব, সে সম্পর্কে কোনোই ধারণা নেই। চলার পথের এপাশে ওপাশে, সামনে পেছনে বন্ধুভাবাপন্ন দরদী মানুষ যথেষ্ট আছে, কিন্তু শত্রুও আছে। শত্রুমিত্র বিচার করতে ভুল হলে মারাত্মক বিপদের মুখে পড়তে হতে পারে।
আজ সারাটা দিন একটানা হেঁটেছি। খাওয়া জোটে নি পথে, ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। বিকেল বেলা
-
টাঙ্গাইল শহর তখনও মুক্ত অঞ্চল। পশ্চিম পাকিস্তানের সৈন্যদের বর্বর আক্রমণের বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গের জেলায় জেলায়, শহরে ও গ্রামাঞ্চলে প্রতিরোধের সংগ্রাম শুরু হয়ে গিয়েছে। ভারতীয় বেতার মারফৎ রক্তপিপাসু পাক-সৈন্যদের হিংস্র আক্রমণ আর বাংলাদেশের সংগ্রামী মানুষদের গৌরবময় প্রতিরোধের কাহিনী প্রচারিত হয়ে চলেছে।
হামলাকারীর দল তখনও টাঙ্গাইল জেলায় এসে পৌঁছাতে পারে নি। টাঙ্গাইল শহরে মুক্তির উৎসব চলেছে। রাজপথের দু’ধারে প্রতিটি ভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা সগৌরবে উড়ছে। ‘জয় বাংলা’ সঙ্গীতে সারা শহর মুখরিত। কিন্তু সমস্ত আনন্দ-উৎসবের পেছনে আসন্ন বিপদের কালো ছায়া। শহরের মানুষ হাসতে গিয়েও দুঃসংবাদ বহন করে নিয়ে আসছে, মুক্ত শহরগুলি একের পর এক পাক-সৈন্যদের অধিকারে চলে যাচ্ছে। তারপর সেই হিংস্র জল্লাদের দল সেই
-
ইয়াহিয়ার জঙ্গী বাহিনী ২৫-এ মার্চ তারিখে পাবনা শহরে এসে ঢুকে পড়ল। শহরের মানুষ আতঙ্কিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিল। শীগ্গিরই এই ধরনের একটা ঘটনা ঘটে যাবে, তারা মনে মনে এই আশঙ্কা করছিল। কিন্তু সেই ঘটনা যে এতো তাড়াতাড়ি ঘটবে, সেটা তারা ভাবতে পারে নি। এই তারিখেই ঢাকা শহরে আক্রমণ শুরু হয়েছিল, কিন্তু সেটা গভীর রাত্রিতে। ওরা ২৫-এ মার্চ শেষ রাত্রিতে পাবনা শহরে এসে হামলা করল।
শহর থেকে মাইল চারেক দূরে হেমায়েতপুরের কাছে ইপসিক (ঊচঝওঈ)-এর অফিস। পাক-সৈন্যরা সেইখানে এসে ঘাঁটি গেড়ে বসল। তারপর সেখান থেকে কিছু সৈন্য শহরে এসে ট্রেজারী দখল করে নিল। তাছাড়া ২৭ জন সৈন্য টেলিফোন এক্সচেঞ্জ কেন্দ্র দখল করে বসল।
-
গভীর রাত্রিতে ওরা দিনাজপুর শহরে এসে ঢুকল। এ রাত্রি সেই ২৫-এ মার্চের রাত্রি, যে-রাত্রির নৃশংস কাহিনী পাকিস্তানের ইতিহাসকে পৃথিবীর সামনে চির-কলঙ্কিত করে রাখবে।
ওরা সৈয়দপুর থেকে এসে অতি সন্তর্পণে শহরের মধ্যে ঢুকল। শ’খানেক পাঞ্জাবী সৈন্য। শহরের ঢোকার মুখে প্রথমেই থানা। সৈন্যরা প্রথমে থানা দখল করে নিয়ে সেখানে তাদের ঘাঁটি করে বসল। তারপর তারা তাদের পূর্ব-নির্ধারিত পরিকল্পনা-অনুসারে শহরের টেলিগ্রাম ও টেলিফোনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলো। সেইদিনই শেষ রাত্রিতে দিনাজপুরের বিখ্যাত কৃষক নেতা গুরুদাস তালুকদার এবং আরও কয়েকজন বিশিষ্ট হিন্দু নাগরিক তাদের হাতে গ্রেফতার হলেন। এমন নিঃশব্দে ও সতর্কতার সঙ্গে এ সমস্ত কাজ করা হয়েছিল যে, শহরের অধিকাংশ লোক তার বিন্দুমাত্র আভাস
-
মুক্তি-আন্দোলনের ঊর্মিমুখর প্রবাহে সারা যশোর জেলা চঞ্চল আর উচ্ছল হয়ে উঠেছে। ছাত্র, যুবক, কৃষক, সাধারণ মেহনতী মানুষ সবাই এগিয়ে এসেছে। ই. পি. আর., পুলিশ, আনসার তারাও পিছিয়ে থাকে নি।
২৩-এ মার্চ তারিখে ই. পি. আর. বাহিনীর জওয়ানরা তাদের ক্যাম্পে স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলল, আর সেই পতাকার সামনে শ্রেণীবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ‘গার্ড অব অনার’ দিলো। অবাঙালিরা প্রতিবাদ তুলেছিল, কিন্তু তাদের এ আপত্তি টিকল না। ২৫শে মার্চ তারিখে ঢাকা শহরে ইয়াহিয়ার জঙ্গী-বাহিনীর বর্বর আক্রমণের খবর যখন এসে পৌঁছল, যশোরের মানুষ তাতে ভয় পাওয়া দূরে থাক, বিক্ষোভে ফেটে পড়ল, ক্রোধে গর্জন করে উঠল-এর উপযুক্ত প্রতিশোধ চাই। যশোর ক্যান্টনমেন্টে কামান, মর্টার আর মেসিনগানে সজ্জিত হাজার
-
আজ থেকে অন্ততঃপক্ষে দেড় শো বছর আগেকার কথা। সেদিনকার ঢাকা শহর আর আজকার ঢাকা শহরের মধ্যে মিলের চেয়ে অ-মিলই বেশী। বাড়িঘর, পথঘাট, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা, শিক্ষা-সংস্কৃতি-প্রভেদ ছিল সব দিক দিয়েই। বাদশাহী আমলের প্রভাব তখনও সমাজের সর্বদেহে ব্যাপ্ত হয়েছিল। বৃটিশ শাসনের মূল তখন দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে চলেছে বটে, কিন্তু নতুন যুগের নতুন অর্থনীতি তখনও এখানকার প্রচলিত অর্থনীতিকে মরণ আঘাত হেনে ব্যাপক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে তোলে নি, দুটো বিপরীত অর্থনীতি তখন সবেমাত্র পরস্পরের সঙ্গে মোকাবিলা করছে এবং দু-একটা সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে ছোটোখাটো সংঘাত ও শক্তি পরীক্ষার সূচনা দেখা দিয়েছে।
সেদিন এই নগর তথা সারা প্রদেশের অর্থনৈতিক জীবনে বুড়ীগংগার এক বিরাট ভূমিকা ছিল।
-
সেদিন বুড়ীগঙ্গার তীরবর্তী আমাদের এই বাকল্যাণ্ড বাঁধের কথা বলছিলাম আহমদউল্লাহ সাহেবের সাথে। বলছিলাম—কি ছিল আর কি হয়ে গেল! কি দেখেছিলাম সে সময় আর কি দেখছি আজ! দশ বছর আগে যে লোক ঢাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিল, সে যদি আজ ফিরে আসে, তাহলে বাকল্যান্ড বাঁধের শ্রী দেখে সে তাজ্জব বনে যাবে। আর যদি আমার মতো নেশাখোর ভ্রমণার্থীদের কেউ হয়, তাহলে মর্মান্তিক আঘাত পাবে। কতোদিনের কতো স্মৃতি এই নদী আর এই নদীতীরের সঙ্গে জড়িত হয়ে আছে! এখন তাই একান্ত বাধ্য হয়ে না পড়লে ও পথে পা বাড়াই না। কেনো এমন হলো? এই বাকল্যান্ড বাঁধের পিছনে একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসটা অনেকেরই হয়তো
-
হাজং অঞ্চলের যে সমস্ত সংগ্রামী কৃষক সৈন্য ও পুলিশদের আক্রমণের ফলে শহীদ হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকের নামই জানা যায় নি। আবার অনেকের নাম বিস্মৃতির তলায় চাপা পড়ে গেছে। শহীদের মধ্যে শুধু পুরুষরা নয়, মেয়েরাও ছিলেন। মেয়েদের মধ্যে শুধু একটি নাম আমাদের কাছে উজ্জ্বল আর অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি হলেন শহীদ রাসিমণি। এই বীরাঙ্গনা সশন্ত্র পুলিশের অত্যাচারের প্রতিরোধ করতে গিয়ে গুলীর মুখে জীবন দিয়েছিলেন।
এই ঘটনার পিছনকার ইতিহাসটা একটু খুলে বলি। ১৯৪৬ সনের প্রথম ভাগে ময়মনসিংহ শহরে ছাত্র ফেডারেশনের উদ্যোগে ‘ভিয়েতনাম দিবস’ উদ্যাপন করা হয়। এই উপলক্ষে ছাত্ররা বিরাট সভা ও মিছিল করেছিল। পুলিশ মিছিলের উপর গুলী চালায়। ফলে একজন ছাত্র মারা
-
দেওবন্দ শিক্ষা কেন্দ্র ও আলীগড় শিক্ষা কেন্দ্র এই উপমহাদেশের মুসলমানদের কাছে বিশেষ পরিচিত। অবশ্য আজকালকার দিনের শিক্ষিত তরুণ মুসলমানেরা আলীগড়ের নাম যে ভাবে জানে দেওবন্দ এর নাম তেমন করে জানে না। হিন্দুদের পক্ষে এ কথা সত্য, আলীগড়ের কথা তারা অনেকেই জানে কিন্তু দেওবন্দের কথা খুব কম লোকেই জানে। অথচ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে দেওবন্দ শিক্ষা কেন্দ্র যে দেশপ্রেমিক ভূমিকা গ্রহণ করে এসেছে, সেজন্য হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সকলের কাছেই তা স্মরণীয় থাকা উচিত ছিল।
এই উপমহাদেশের সুদুর পল্লী অঞ্চলে মুসলমানদের কাছে একসময় আলীগড়ের চেয়েও দেওবন্দের নামই কিন্তু অনেক বেশী পরিচিত ছিল। এর প্রধান কারণ দেওবন্দ কেন্দ্র উলেমাদের দ্বারা পরিচালিত এবং এখানে প্রাচীন
-
১৮২৬ সালের ১৭ই জানুয়ারী। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই দিনটি অবিস্মরণীয়। অবিস্মরণীয় বটে, কিন্তু স্মরণ করা যাক এই দিবসটির ইতিহাস ও তাৎপর্য আমাদের কজনেরই বা জানা আছে। আমাদের দেশের ঐতিহাসিকদের মধ্যে অধিকাংশের অজ্ঞতা, অবহেলা বা একদেশ দর্শিতার বশে এই দিবসটি বিস্মৃতির তলায় চাপা পরে গিয়াছে। আমাদের দেশের শিক্ষিত সমাজ, এমনকি রাজনীতিবিদ ও স্বাধীনতা সংগ্রামীরা পর্যন্ত এই দিবসটির তাৎপর্য সম্পর্কে উদাসীন। অথচ এই সময় থেকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা, এই তারিখেই যুক্ত প্রদেশের (বর্তমান উত্তর প্রদেশ) রায়বেরেলির সৈয়দ আহমদ তার দীর্ঘস্থায়ী ব্রিটিশ বিরোধী জেহাদ শুরু করেছিলেন।
এই ব্রিটিশ বিরোধী জেহাদ অর্থাৎ স্বাধীনতা সংগ্রাম একমাত্র মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তার দুটো কারণ
-
মওলবী লিয়াকত হোসেন
আজকের দিনে এই নামটি খুব কম লোকের কাছেই পরিচিতি। কিন্তু জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে, বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ নামটি বিশেষভাবে স্মরণীয়। বস্তুতঃ লিয়াকত হোসেন বাঙালী নন তাঁর জন্ম হয়েছিল বিহারে। তা হলেও বাংলাদেশকে তিনি জন্মভূমির মতোই আপন বলে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। আমরা বাঙালিরাও যেন সেই দৃষ্টি নিয়ে তাঁকে দেখতে পারি।
মৌলবী লিয়াকত হোসেন এর প্রাথমিক জীবন সম্বন্ধে আমাদের কোনো কিছুই জানা নেই। একজন উদ্যোগী ও সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হিসাবেই তাঁর সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয়। তাঁর রাজনৈতিক কার্যকলাপের মূল কেন্দ্র ছিল কলকাতা। ১৯০৫ সালের কথা। সে সময় বড়লাট লর্ড কার্জন নবজাগ্রত বাঙালী শক্তিকে নিষ্পেষিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে বঙ্গভঙ্গের
-
এটা খুবই আশ্চর্যের কথা, মাহমুদ আল হাসান নামটি আমাদের দেশের খুব কম লোকের কাছেই পরিচিত, দেশকে যারা ভালবাসেন, এই নামটি তাদের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়। দেওবন্দ শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষালাভ করে যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশিষ্ট অংশগ্রহণ করেছিলেন, সেই পতাকাবাহীদের মধ্যে তিনিই ছিলেন অগ্রগণ্য। তাঁর প্রভাবে ও দৃষ্টান্তে এই শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষাকর্মীরা সংগ্রামী প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠেছিল।
মাহমুদ আল হাসান ১৮৫১ সালে উত্তর প্রদেশের বেরিলিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় তিনি তাঁর পিতার সাথে মিরাটে ছিলেন। এই মিরাটেই সিপাহীদের মধ্যে সর্বপ্রথম বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল। ছয় বছর বয়সের বালক মাহমুদ আল হাসান তখন থেকেই এই বিদ্রোহীদের বীরত্বপূর্ণ কাহিনী এবং বিদ্রোহ ভেঙ্গে পড়ার পর ব্রিটিশ
-
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যাদের পরিচয় আছে, মৌলবী বরকতুল্লাহ্র নাম তারা অবশ্যই শুনেছেন। ১৯১৫ সালের ১লা ডিসেম্বর তারিখে কাবুলে স্বাধীন ভারতের যে অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়, রাজা মহেন্দ্রপ্রতাপ ছিলেন তার রাষ্ট্রপতি, আর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মৌলবী বরকতুল্লাহ্।
মৌলবী বরকতুল্লাহ্র বিপ্লবী জীবনের সবটাই কেটেছে ভারতের বাইরে, প্রবাসে এশিয়া, আমেরিকা, ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে। তাঁর ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপের জন্য তিনি ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের চক্ষুশূল, তাই স্বদেশে ফিরে যাবার পথ কোনো দিন তাঁর জন্য উন্মুক্ত হয়নি। অবশেষে একদিন দেশ থেকে বহুদূরে বিদেশের মাটিতে তাঁকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়েছিল।
তাঁর জন্মস্থান ছিল ভূপোলে। ১৯০১ সালে তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য লণ্ডনে গিয়ে শ্যামলী কৃষবর্মা
-
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯১৪-১৫ সাল একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পূর্ণ স্বাধীনতা ও সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী বিপ্লবীরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সুযোগে এক বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান সৃষ্টি করার জন্য যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল তা শেষ পর্যন্ত সার্থকতায় পরিণত না হলেও সেই বিপুল কর্মোদ্যোগ ও আত্মত্যাগের জন্য আমরা গর্ববোধ করে থাকি। এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা এই তিন মহাদেশে বিপ্লবীদের কর্মক্ষেত্র প্রসারিত ছিল। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বিপ্লবের সৈনিকরা এই অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে চলেছিল। সে এক উদ্দীপনাপূর্ণ রোমাঞ্চকর পরিবেশ।
এই পরিকল্পিত বিদ্রোহের কেন্দ্রগুলির মধ্যে দেওবন্দ শিক্ষাকেন্দ্র ছিল অন্যতম। দেওবন্দ শিক্ষাকেন্দ্রের অধ্যক্ষ স্বয়ং মাহমুদ আল হাসান এই কেন্দ্রের নেতৃত্ব করছিলেন। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপ্লবীরা দেওবন্দের
-
ডা. আনসারী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সর্বজন পরিচিত নেতা। তার পুরো নাম ডা. মুখতার আহ্মদ আনসারী। তাঁর পূর্বপুরুষেরা সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের আমলে বাইরে থেকে এদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। সেই সময় থেকেই তাঁরা সরকারের সামরিক ও বেসামরিক বিভাগে বিশিষ্ট পদ অধিকার করে এসেছেন। ডা. আনসারী ১৮৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান বর্তমান উত্তর প্রদেশের গাজীপুর জেলার ইউসুফপুর গ্রামে। ডা. আনসারী তাঁদের পরিবারের অন্যান্যদের মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করেছিলেন। মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করার পরেই তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্য নিজাম সরকারের বৃত্তি পেয়ে লণ্ডনে চলে গেলেন। সেখানে তিনি চিকিৎসা বিদ্যায় অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন এবং পর্যায়ক্রমে এল.
-
অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের ফলে সারা দেশ হতাশা ও অবসাদে ছেয়ে গিয়েছিল একথা সত্য, কিন্তু এই আশা ভঙ্গের বেদনা ও অবসাদ খুব বেশীদিন স্থায়ী হয়নি। ইতিপূর্বে স্বাধীনতা ছিল একটা দূর সুখ-স্বপ্ন, যাকে ঘিরে মানুষ কল্পনার জাল বুনত। কিন্তু এ যুগে নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে স্বায়ত্বশাসন শুধু স্বায়ত্বশাসন নয়, পূর্ণ স্বাধীনতা তাদের কাছে নিকট ও অনিবার্য আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ভারতবাসীদের এই চিন্তাধারা দ্রুত প্রবাহে এগিয়ে চলেছিল। ১৯১৯ সালের মণ্টেণ্ড চেমসফোর্ড রিফর্মকে তারা অবজ্ঞায় আবর্জনার স্তুপে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তাদের পুরনো দিনের ধারণাকে আঁকড়ে ধরে বসেছিল। তারা আশা করছিল ১৯২৮ সালে পুরোপুরি শ্বেতাঙ্গ সভ্যদের দ্বারা গঠিত সাইমন
-
১৯৪৬ সাল। ঢাকা জেলার শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় বৎসর। আজ থেকে বাইশ বছর আগে এখানকার ৯,০০০ সুতাকল শ্রমিক দীর্ঘ তিন মাসব্যাপী ধর্মঘট সংগ্রাম পরিচালনার মধ্য দিয়ে সারা বাংলার শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক রক্তরাঙ্গা অধ্যায় যোজনা করে দিয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের শ্রমিক তথা মেহনতী জনতার এ এক গৌরবময় উত্তরাধিকার। আজ আমাদের এখানকার শ্রমিক ভাইরা আর যারা শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত আছেন, তাঁদের মধ্যে এমন ক’জন আছেন যাঁরা সেই সময়কার সেই সমস্ত রোমাঞ্চকর ঘটনার সঙ্গে পরিচিত? বিশেষ করে তাঁদের মনে করেই এই কাহিনী লিখতে বসেছি।
নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যার ওপারে ১নং ঢাকেশ্বরী কটন মিল, এপারে ২নং ঢাকেশ্বরী কটন মিল, লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিল, চিত্তরঞ্জন কটন
-
নূর হোসেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর আসাম ডিব্রুগড়ের রেলওয়ে ওয়ার্কশপের কাজে অপশন দিয়ে ঢাকায় চলে এলো। ডিব্রুগড়ের ওয়ার্কশপের শ্রমিকদের মধ্যে হিন্দুর চেয়ে মুসলমানই ছিল বেশী। তারা সবাই পূর্ব-পাকিস্তানের লোক। শুধু নূর হোসেন নয়, এরা সবাই ফিরে এল, একজনও বাকী রইল না। কেনই বা থাকবে? তারা ভালো ভালো লোকের মুখে শুনেছে, পাকিস্তান যখন আসবে, তখন দেশে অভাব, অনটন, অশান্তি, শোষণ, জুলুম, অত্যাচার কোনো কিছুই থাকবে না। পাস্তিানের মানুষেরা সবাই মানুষের মতো বেঁচে থাকার সুযোগ পাবে। এতোদিনে, এতো লোকের চেষ্টায়, এতো ক্ষয়-ক্ষতি, রক্তারক্তির পর সেই পাকিস্তান যখন এসেছে, তখন তাকে ছেড়ে এতো দূরে ওই বিদেশ-বিভূঁয়ে পড়ে থাকার কোনো মানে হয়?
কাজেই আর সকলের
-
লোক মারফৎ নির্দেশ চলে এল। একটি চিঠি নিয়ে এসেছে ছেলেটি। চিঠির মধ্যে জরুরী নির্দেশ, আমাকে অবিলম্বে ১ নং ঢাকেশ্বরী মিলের কবির দল নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে। শুধু বেরিয়ে পড়া নয়, সেই দলের নেতৃত্বও নাকি আমাকেই করতে হবে। একবার ভেবে দেখুন ব্যাপারটা। কবি গানের সঙ্গে আমার কোনো কালেই তেমন ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল না। আর বেছে বেছে সেই দলের অধিকারী মনোনীত করা হয়েছে আমাকে! অতি বড় বীরপুরুষও অনুরূপ অবস্থায় আতঙ্কিত না হয়ে পারে না-আমি তো কোনো ছার।
১৯৪৬ সালের কথা। সাধারন নির্বাচন আসন্ন। তখন কমিউনিষ্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল না, অন্যান্য পার্টির মতো তারাও প্রকাশ্যে কাজ করবার অধিকারী ছিল। নারায়ণগঞ্জ মহকুমা ও ঢাকা
-
যে দিন থেকে সমাজে শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে, তখন থেকে শ্রেণী সংগ্রামও অব্যাহত গতিতে চলে আসছে। শ্রেণী-সমাজ কখনোই কোনো অবস্থাতেই শ্রেণী-সংগ্রাম থেকে ম্ক্তু থাকতে পারে না। তবে তা কখনও তীব্র ও ব্যাপক, কখনও মৃদু ও সীমাবদ্ধ, কখনও সরল, কখনও জটিল, কখনও প্রকাশ্য, কখনওবা প্রচ্ছন্নভাবে আবর্তিত হয়ে চলে। এই শ্রেণী-সংগ্রামের টানা-পোড়েনের মধ্যে দিয়ে মানব সমাজের ইতিহাস রচিত হয়ে চলেছে।
আমাদের এ দেশে এমন লোক এখনও আছে যারা শ্রেণী-সংগ্রামের মধ্যে-বিজাতীয় ভাবধারার গন্ধ পায় এবং অবজ্ঞা ভরে নাক সিঁটকায়। ইতিহাসের গতিধারা সম্পর্কে বেচারারা একেবারেই অজ্ঞ। আর আমরা-আমরাই কি পুরোপুরি সচেতন? মানব সমাজে শ্রেণীর উদ্ভবের পর থেকে সারা পৃথিবী জুড়ে মহাসমুদ্রের বুকে সংখ্যাহীন তরংগের মতো
-
প্রাচীন মিসরের জনৈক ভদ্রলোক তার ছেলেকে নিয়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিতে যাচ্ছেন আর পথে পথে উপদেশ দিয়ে চলেছেন, বাপুরে, খেটেখুটে মন দিয়ে লেখাপড়া করো, যাতে লেখাপড়া শিখে একজন লিপিকার (ঝপৎরনব) হয়ে উঠতে পার। আমাদের এই সমাজে পেটের ধান্দা মিটাবার জন্য নানা জনে নানারকম পেশা নিয়ে মেহনত করে চলেছে। কিন্তু এদের মধ্যে একমাত্র লিপিকারেরাই সুখে আছে, আর সকলের দুর্দশার চূড়ান্ত। কর্মকারদের মধ্যে থেকে কেউ রাষ্ট্রদূতের পদ পেয়েছে, এ আমি কোনো দিন দেখিনি। দেখছি তো কামারদের—এরা দিনের পর দিন এদের চুল্লির আগুনের সামনে বসে কাজ করে চলে, এদের হাতের আঙ্গুলগুলো কুমীরের নখের মতো বেঁকে যায় আর এদের গা থেকে মাছের ডিমের চেয়েও
-
সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিয়ে বিদেশী সওদাগরের বাণিজ্য তরী বাবেরু রাজ্যের ঘাটে এসে ভিড়ল। বিদেশী সওদাগরের তরী ঘাটে এসেছে, এই খবর শুনতে পেলে নগরে সাড়া পড়ে যায়। ছেলে বুড়ো কৌতূহলী হয়ে দেখতে ছুটে আসে। আজও তাই হয়েছে-ঘাটে ভিড় জমে গেছে। সওদাগরের অনুচরেরা উপস্থিত নগরবাসীদের উদ্দেশ্য করে বিচিত্র সুরে আর বিচিত্র ভঙ্গিতে তাদের নানাবিধ পণ্যের গুণাগুণের বিজ্ঞাপন দিয়ে চলেছে। লোকের মন কেমন করে আকর্ষণ করতে হয়, সে সব কায়দা-কানুন এরা ভালো করেই জানে। এদের এই বিজ্ঞাপনের ভাষা আর ভঙ্গি বাচ্চাদের কাছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। বড়রা আসে সাগরের উপরের নানা দেশের নানা রকম জিনিস দেখে চোখের সাধ মিটাতে, মাল নিয়ে দরাদরি
-
‘প্রাচীন যুগের’ আদালতের ইতিহাসের কথা বলতে চলেছি, কিন্তু আপনাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্নটাই জাগা উচিত, এই ‘প্রাচীন যুগ’ বলতে কোন যুগটাকে বোঝায়? কথাটা এভাবে বললে ঠিক হয়, সভ্যতার প্রাথমিক যুগের আদালত। শিরোনামটা যেমন আছে তেমনি থাক, আপনারা এই অর্থেই বুঝে নেবেন। তা হলেই হবে।
কতকাল আগেকার কথা বলা হচ্ছে? মোটামুটি ধরে নিন খ্রিষ্টপূর্ব তিন সহস্রাব্দ (খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০) থেকে দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝি (খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০) কাল পর্যন্ত। এই প্রসঙ্গে মিসর, সুমেরীয়া, ব্যাবিলন এই কটি দেশ এবং হিট্টীয় ও ইহুদী জাতির মধ্যে কি ধরনের আদালত ব্যবস্থা ছিল? এই সম্পর্কে যে সমস্ত দলিলপত্র পাওয়া গেছে, তা থেকে যা বলার বলবো। তার বেশী আর কেমন
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
উৎস
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.












