শহীদ রাসিমণি
হাজং অঞ্চলের যে সমস্ত সংগ্রামী কৃষক সৈন্য ও পুলিশদের আক্রমণের ফলে শহীদ হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকের নামই জানা যায় নি। আবার অনেকের নাম বিস্মৃতির তলায় চাপা পড়ে গেছে। শহীদের মধ্যে শুধু পুরুষরা নয়, মেয়েরাও ছিলেন। মেয়েদের মধ্যে শুধু একটি নাম আমাদের কাছে উজ্জ্বল আর অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি হলেন শহীদ রাসিমণি। এই বীরাঙ্গনা সশন্ত্র পুলিশের অত্যাচারের প্রতিরোধ করতে গিয়ে গুলীর মুখে জীবন দিয়েছিলেন।
এই ঘটনার পিছনকার ইতিহাসটা একটু খুলে বলি। ১৯৪৬ সনের প্রথম ভাগে ময়মনসিংহ শহরে ছাত্র ফেডারেশনের উদ্যোগে ‘ভিয়েতনাম দিবস’ উদ্যাপন করা হয়। এই উপলক্ষে ছাত্ররা বিরাট সভা ও মিছিল করেছিল। পুলিশ মিছিলের উপর গুলী চালায়। ফলে একজন ছাত্র মারা যায়। সেদিন এই ঘটনাটা সারা ময়মনসিংহ জেলায়, কি শহরে, কি গ্রামাঞ্চলে সর্বত্র দারুণ উত্তেজনার সৃষ্টি করে তুলেছিল। এই ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে সুসঙ দুর্গাপুরে হাজার হাজার কৃষক-জনতার এক মিছিল সমস্ত শহর পরিভ্রমণ করে। মিছিল যখন থানার পাশ দিয়ে যাচ্ছে, এমন সময় বাধা পেল। পথটা থানা সংলগ্ন জমির উপর দিয়ে হলেও দীর্ঘ দিন থেকে সর্বসাধারণের চলাচলের পথ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এবার থানার পক্ষ থেকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সেই পথটা আটকে দেওয়া হয়েছে। মিছিলের জনতা এমনিতেই উত্তেজিত, তার উপর এ ভাবে বাধা পেয়ে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। তারা সেই কাঁটাতারের বেড়া ভেঙ্গে দিয়ে তাদের চলার পথ মুক্ত করে নিল। হাজার হাজার জনতার এই মারমুখো মূর্তি দেখে পুলিশ ভয়ে কোনো কথা বলল না। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া দেখা দিল পরে।
সরকার কিছু দিন থেকেই হাজং আন্দোলনকে সমূলে ধ্বংস করবার জন্য মনে মনে পাঁয়তারা করছিল। এবার দুর্গাপুরের এই ঘটনার পর তারা আর দেরী না করে তাদের এই উচ্ছেদ-অভিযান শুরু করল। যে সমস্ত গ্রাম বা অঞ্চল আন্দোলনের শক্তিশালী কেন্দ্র, সরকারের পুলিশ কোনো উপলক্ষ ছাড়াই সেই সমস্ত জায়গায় গিয়ে হামলা করতে লাগল। তারা ঘরে ঘরে তল্লাশী চালাল, মনের ঝাল মিটাবার জন্য মারপিট চালাল, যাকে খুশী তাকেই ধরে বেঁধে নিয়ে আসতে লাগল। সরকারের ইঙ্গিতে পুলিশ এই ভাবে গ্রামের পর গ্রামে অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছিল। এদের পরিকল্পনা ছিল, এই ভাবে আন্দোলনের কেন্দ্রগুলির উপর অত্যাচার চালিয়ে ওরা আন্দোলনকে চিরদিনের মত নির্মূল করে দেবে।
দুর্গাপুর থানার অন্তর্গত বহেরাতলী এমনি একটি গ্রাম। গ্রামটি সোমেশ্বরী নদীর তীরে। এই গ্রামের জংগী কৃষকরা বহুদিন থেকেই আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে এসেছে। সেই কারণেই এই গ্রামটি কর্তৃপক্ষের বিষনজরে পড়েছিল। একদিন পাঁচজন সশস্ত্র পুলিশ সেই গ্রামে গিয়ে হানা দিল। সেদিন এই গ্রামের জঙ্গী কৃষক কর্মীরা কোন এক সভায় যোগ দিতে গিয়েছিল। পুলিশ অবাধে গ্রামের ভিতর ঢুকল আর ঘরে ঘরে গিয়ে মার পিট আর নানারকম উৎপাতের সৃষ্টি করে চলল। শুধু তাতেই ক্ষান্ত হলো না, তারা গ্রাম ছেড়ে চলে আসার সময় কুমুদিনী নামে সতেরো-আঠারো বছরের একটি তরুণীকে জোর করে তাদের সঙ্গে টানতে টানতে নিয়ে চলল।
আইন ও শান্তি-শৃঙ্খলার রক্ষক পুলিশ এইভাবে তাদের কর্তব্য সমাপন করে ফিরে চলল। কিন্তু তাদের বরাত ভালো নয়। কিছুটা এগিয়ে এসেছে, এমন সময় এক দল কৃষকের সঙ্গে একেবারে মুখোমুখি দেখা। তারা সংখ্যায় ত্রিশ-চল্লিশ জনের মতো হবে। তাদের মধ্যে দশ-বারো জন মেয়ে। বহেরাতলী থেকে যারা সভায় যোগ দিতে গিয়েছিল, সেই জঙ্গী কৃষকরাই হল্লা করতে করতে ফিরে আসছে। তাদের প্রায় সবার হাতেই সাথের সাথী বল্লম। তখনকার দিনে সভাসমিতিতে বা মিছিলে যেতে হলে কেউ খালি হাতে যেত না। এদের সামনে পড়ে গিয়ে পুলিশরা প্রমাদ গণল।
পুলিশদের হাতে বন্দিনী কুমুদিনী তার গ্রামের পরিচিত লোকদের দেখতে পেয়ে আর্তকণ্ঠে সাহায্যের জন্য চীৎকার করে উঠল।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments