পাণিপথের প্রথম যুদ্ধ
কোনও রাজশক্তির যখন পতন আসন্ন হয়ে ওঠে তখন তার চারিদিকে কতকগুলি লক্ষণ দেখা দেয়। তার মধ্যে বুদ্ধিনাশটাই বড়।
ভারতেও কয়েকশো বছর ধরে যে তুর্ক-আফগান রাজশক্তি শাসন করছিলেন, যেটাকে সাধারণত ঐতিহাসিকরা পাঠান আমল ব’লে আখ্যা দেন—তাদের পতন ঘনিয়ে এল ঐ যুগের শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদীর আমলে। ইব্রাহিম লোদী যখন সিংহাসনে বসলেন তখন দিল্লীর সাম্রাজ্য বলতে দিল্লীর চারপাশে কয়েকটি মাত্র জেলা বোঝায়, তার বাইরে চারিদিকেই আফগান শাসক ও জমিদাররা প্রবল হয়ে উঠেছেন, হিন্দু জমিদাররাও সুযোগ বুঝে স্বাধীনভাবে মাথা তুলেছেন।
এই সঙ্কটকালে যে স্থিরবুদ্ধি ও কৌশলের প্রয়োজন তা ইব্রাহিমের ছিল না, তিনি কঠোর হস্তে এই সব জমিদারদের শাসন করতে প্রবৃত্ত হলেন। অথচ সে শক্তি তাঁর ছিল না। ফলে তিনি যতই রূঢ় আচরণ করেন ততই তারা বিরুদ্ধাচরণ করে, তাঁর আচরণ আরও রূঢ় হয়ে ওঠে।
এই যখন অবস্থা তখন পঞ্জাবের দৌলত খাঁ লোদী ও আলম খাঁ বাইরের শত্রুকে ঘরে আহ্বান করলেন। বাবুর বা বাবরকে জানালেন নিমন্ত্রণ। এ কথাটা একবার মনে হ’ল না যে, গৃহবিবাদটা বরং মিটিয়ে কয়েকজন জমিদার এক হয়ে ইব্রাহিমকে শাসন করা যাক্। এ রকম নির্বুদ্ধিতার ইতিহাস ভারতে অনেক আছে।
বাবর এঁদের আমন্ত্রণ-লিপি পেয়ে হাসলেন। ভাগ্যতাড়িত গৃহহারা বাবর বহুদিন ধরেই স্বর্ণপ্রসূ ভারতের দিকে লুব্ধ-দৃষ্টিতে চাইছিলেন, এই সুযোগে আর তিলার্ধও বিলম্ব করলেন না। সামান্য কয়েক সহস্র অনুচর নিয়ে ভারতে প্রবেশ করলেন ও প্রায় বিনা বাধায় লাহোর পর্যন্ত অধিকার ক’রে নিজের শক্তি সুপ্রতিষ্ঠিত করবার দিকে মন দিলেন।
এ আবার কি? এ রকম তো কথা ছিল না!
ব্যাপার দেখে দৌলত খাঁ ও আলম খাঁর চোখ কপালে উঠল। ওঁরা ভেবেছিলেন ভাড়া-করা গুণ্ডার মতো বাবর এসে ওঁদের কার্য উদ্ধার করে দিয়ে কিছু লুঠতরাজ ক’রে নিয়ে সরে পড়বেন। কিন্তু এখানে এমনভাবে জাঁকিয়ে বসে রাজ্য প্রতিষ্ঠায় মন দেবেন—এমন সম্ভাবনা তো তাঁদের মাথায় যায় নি! এ যে খাল কেটে কুমীর ঘরে আনা!
সাজ, সাজ—চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে গেল। দৌলত খাঁ সৈন্য সমাবেশ করতে লাগলেন বাবরকে তাড়াবার জন্য। বাবর দেখলেন বেগতিক, তাঁর তেমন কোনও আয়োজনই নেই—তিনি আবার কাবুলে পালিয়ে গেলেন।
তাই বলে তিনি চুপ ক’রে বসে রইলেন না। বহু চেষ্টাচরিত্র ক’রে হাজার বারো সৈন্য সংগ্রহ হতেই তিনি আবার ভারতে প্রবেশ করলেন এবং অল্প আয়াসেই লাহোর দখল ক’রে দৌলত খাঁকে দমন করলেন। এইবার নিশ্চিন্ত মনে দিল্লীর কথা ভাববার সময় পাওয়া গেল। তবে বাবর আর দেরি করলেন না—মাস দু’-তিনের মধ্যেই দিল্লীর পথে অগ্রসর হতে লাগলেন।
ইব্রালিম লোদীও অবশ্য ঠিক চুপ ক’রে বসে ছিলেন না। কিন্তু যারা আপন হ’তে পারত, যারা তাঁকে সাহায্য করতে পারত—তারা সকলেই এ বিপদে বরং মজা দেখতে লাগল। ব্যক্তিগত অসূয়া ও বিদ্বেষ এমনই জিনিস! একথা তারা একবারও ভাবল না যে, যে ব্যক্তি দিল্লীর রাজশক্তি নষ্ট করতে পারে সে পরে তাদের অধিকারও ক্ষুণ্ণ করতে চাইবে—এবং তখন তার সামনে দাঁড়ানো অত সহজ হবে না।
যাই হোক—ইব্রাহিম কোনওমতে প্রায় লাখখানেক সৈন্য সংগ্রহ ক’রে বাবরকে বাধা দেবার জন্য কিছুদূর এগিয়ে এলেন। কুরুক্ষেত্রের কাছে পাণিপথের প্রান্তরে উভয় সৈন্যের দেখা হ’ল।
সে বড় মজার যুদ্ধ। একদিকে অশিক্ষিত এবং অপ্রস্তুত এক লক্ষ সৈন্য, অপরদিকে মাত্র বারো হাজার সৈন্য এবং কয়েকটা কামান। এর আগে কামান-বারুদের ব্যবহার ভারতে বিশেষ হয় নি, তার সঙ্গে এদের পরিচয় ছিল না বললেই হয়। ইব্রাহিম লোদীর সৈন্যরা তো জানতই না। অকস্মাৎ মহা গর্জন ক’রে এক একটা লোহার বল যখন জ্বলতে জ্বলতে এসে ফাটতে লাগল তখন ওদের বিস্ময় ও আতঙ্কের শেষ রইল না। এ আবার কি সর্বনেশে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments