১৯০৭–১৯৮১
সত্যেন সেন
বিক্রমপুরের সোনারঙ গ্রামের এক বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী পরিবারে ১৯০৭ সালে সত্যেন সেনের জন্ম। অল্প বয়সেই তিনি অসহযোগ আন্দোলনে ও...
See more >>-
পূজার নাটমণ্ডপগুলি নাচঘরে রূপান্তরিত হবার আগে পূজা উপলক্ষে যাত্রা, কবিগান, কীর্তন, কথকতা-এই সমস্তই চলত। নাচঘর নিয়ে এলো নতুন জিনিস-ঢপ, কীর্তন, খেমটা আর বাইজীদের নাচ-গান।
জীবন বাবুর বাড়ির নাচঘরের মালিক গোকুল রায়ের পিতা গৌরচন্দ্র রায় ঢপ, কীর্তন প্রবর্তন করেছিলেন। ঢপ পূর্ববঙ্গের কোথাও প্রচলিত ছিল না। ঢপ কীর্তনের দল কলকাতা থেকে আমদানী করা হতো। সাধারণ কীর্তনের মতোই এই বিশেষ ধরনের কীর্তন বঙ্গীয় বৈষ্ণব ধর্মের আদি ভূমি নবদ্বীপ, শান্তিপুর ও কাটোয়ার মাটিতে জন্মলাভ করেছিল। ঢপ কীর্তনের প্রধান বিশেষত্ব এই যে, মেয়েরা এই কীর্তন গান গাইত।
পশ্চিম বঙ্গে বিশেষ করে কলকাতার নাগরিক আবহাওয়ায় খেমটা নাচ-গানের উৎপত্তি। কেউ কেউ মনে করেন সেখানকার হাফ আখড়াই গান
-
খুলনা শহরে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্ব শেষ হয়ে গেলেও ছাত্রেরা প্রতিরোধ-সংগ্রাম থেকে নিবৃত্ত হয় নি। ২৬-এ মার্চ থেকে শুরু করে ২রা এপ্রিল পর্যন্ত তারা গোপনে নানা জায়গায় পজিশন নিয়ে পাক-সৈন্যদের উপর ইতস্তত চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিল। এইভাবে তারা বেশ কয়েকজন সৈন্যকে হত্যা ও জখম করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু একথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, এই গুপ্ত আক্রমণ চালাবার কালে কোনো ছাত্র মারা যায় নি বা শত্রুর হাতে ধরা পড়ে নি।
২৮-এ এপ্রিলের যুদ্ধের পর মুক্তিবাহিনী যোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু তাই বলে তারা হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেয় নি। শত্রুর বিরুদ্ধে আক্রমণ করবার জন্য তারা বাগেরহাটে গিয়ে মিলিত হলো। বাগেরহাটে প্রাক্তন
-
টিয়া পাখির বাচ্চা মার কাছে সারাদিন গল্প শোনে। ওর মা কত-যে গল্প জানে! পুরনো একটা ভাঙ্গা বাড়ির ছোট্ট খুপড়িতে ওদের বাসা। সেই বাড়িতে মানুষজন কেউ নেই, ছাড়াবাড়িটা জংলা গাছে ছেয়ে গেছে। গোটা দুই শেয়াল নীচের ঘরে বাসা বেঁধেছে। এ ছাড়া এ বাড়িতে একদল চামচিকে আছে, সাপ-খোপ আছে, পোকামাকড় আছে, অনেক কিছ্ইু আছে। কিন্তু ওদের সঙ্গে টিয়া পাখির কোনোই সম্পর্ক নেই। টিয়া তার বাচ্চাটাকে নিয়ে দোতলায় ঘুলঘুলিটায় বাসা বেঁধে আছে।
মা মাঝে মাঝে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসে। সেই আধো আলো আধো অন্ধকারে ওই ছোট্ট বাসাটুকুর মধ্যে বাচ্চা কিন্তু বেশ মনের আনন্দেই আছে। মাঝে মাঝে মা যখন ওকে ফেলে বাইরে চলে
-
রানী রাজাকে বলল, রাজা, তোমার বড্ড বেশী ঘুম। তুমি দিনেও ঘুমোও, রাতেও ঘুমোও। এত ঘুম কি ভালো? এত ঘুম ঘুমোলে রাজ্য চালাবে কি করে?
রাজা বলল, সে কি, বেশী ঘুমোলাম আবার কখন? সারা দিনে রাতে তো চব্বিশ ঘণ্টা। তার মধ্যে এ কাজ আছে, ও কাজ আছে, নাওয়া আছে, খাওয়া আছে, আরও কত কি আছে। রাজার কাজের কি কোনো শেষ আছে? তার ওপর যখন তখন তোমার এই ঘ্যান-ঘ্যানানি, প্যান-প্যানানি। এর মধ্যে কি আর ঘুমোবার যো আছে! মনের সাধ মিটিয়ে ঘুমোতে না পেরে আমার গায়ে আর জুত লাগছে না, রোগাও হয়ে যাচ্ছি দিন দিন।
রানী অবাক হয়ে বলল, শোন কথা! রোগা না
-
১৮০৩ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটল। ভারতের রাজধানী দিল্লী শহর ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী অর্থাৎ ব্রিটিশ সরকারের কর্তৃত্বাধীনে এসে গেল, আসলে এটা একটা আকস্মিক ব্যাপার নয়। বহুদিন আগে থেকেই ভারতের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা তাকে এই অনির্বায পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছিল। যাদের দেখবার মত চোখ ছিল তারা দেখতেও পাচ্ছিলেন যে তার সর্বদেহে ক্ষয়রোগের লক্ষণগুলি ফুটে উঠেছে। এ এক বিরাট মহীরুহ, যার ভিতরকার সমস্ত সার পদার্থ একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাহলেও সাধারণের দৃষ্টির সামনে এতদিন সে তার প্রভুত্বব্যঞ্জক মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, অবশেষে সেই মহীরুহের পতন ঘটল; চমকিত হয়ে উঠল সবাই। দিল্লীশ্বরেরা জগদীশ্বরেরা শেষকালে এই হলো তার পরিণতি।
মুঘল সাম্রাজ্য সত্য কথা বলতে
-
দিগন্তে কালো মেঘের ঘনঘটা। বাংলাদেশে রাজনৈতিক আকাশে ঝড়ের পূর্বাভাস স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে ফুটে উঠছিল। বিপ্লবী আন্দোলনে গৌরবময় ঐতিহ্য-মণ্ডিত চট্টগ্রাম শহরের মানুষ এক আসন্ন ঝড়ের পূর্বসঙ্কেত শুনতে পেয়ে ব্যগ্র ও উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষায় দিন গুণে চলছিল।
পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকচক্রের দীর্ঘদিনের একটানা শোষণ ও জুলুমের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আহ্বান এসেছে। নেতাদের কাছ থেকে নয়, ছাত্র-জনতার উদ্বেল হৃদয়-সমুদ্র মন্থনের ফলে এই সংগ্রামী আহ্বান পর্যায়ের পর পর্যায় অতিক্রম করে আত্মপ্রকাশ করে চলেছে। মার্চের প্রথম ভাগ থেকেই সারা বাংলাদেশেই মানুষের মনে ঘনঘন উত্তেজনার বিদ্যুৎস্ফুরণ। চট্টগ্রামের মানুষ এ বিষয়ে কারু চেয়ে পেছনে পড়ে নেই। শহর আর শহরবাসীদের চেহারা ও চরিত্র দ্রুতগতিতে বদলে যাচ্ছে। মার্চের প্রথম থেকে এমন
-
এটা খুবই আশ্চর্যের কথা, মাহমুদ আল হাসান নামটি আমাদের দেশের খুব কম লোকের কাছেই পরিচিত, দেশকে যারা ভালবাসেন, এই নামটি তাদের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়। দেওবন্দ শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষালাভ করে যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশিষ্ট অংশগ্রহণ করেছিলেন, সেই পতাকাবাহীদের মধ্যে তিনিই ছিলেন অগ্রগণ্য। তাঁর প্রভাবে ও দৃষ্টান্তে এই শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষাকর্মীরা সংগ্রামী প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠেছিল।
মাহমুদ আল হাসান ১৮৫১ সালে উত্তর প্রদেশের বেরিলিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় তিনি তাঁর পিতার সাথে মিরাটে ছিলেন। এই মিরাটেই সিপাহীদের মধ্যে সর্বপ্রথম বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল। ছয় বছর বয়সের বালক মাহমুদ আল হাসান তখন থেকেই এই বিদ্রোহীদের বীরত্বপূর্ণ কাহিনী এবং বিদ্রোহ ভেঙ্গে পড়ার পর ব্রিটিশ
-
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯১৪-১৫ সাল একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পূর্ণ স্বাধীনতা ও সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী বিপ্লবীরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সুযোগে এক বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান সৃষ্টি করার জন্য যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল তা শেষ পর্যন্ত সার্থকতায় পরিণত না হলেও সেই বিপুল কর্মোদ্যোগ ও আত্মত্যাগের জন্য আমরা গর্ববোধ করে থাকি। এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা এই তিন মহাদেশে বিপ্লবীদের কর্মক্ষেত্র প্রসারিত ছিল। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বিপ্লবের সৈনিকরা এই অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে চলেছিল। সে এক উদ্দীপনাপূর্ণ রোমাঞ্চকর পরিবেশ।
এই পরিকল্পিত বিদ্রোহের কেন্দ্রগুলির মধ্যে দেওবন্দ শিক্ষাকেন্দ্র ছিল অন্যতম। দেওবন্দ শিক্ষাকেন্দ্রের অধ্যক্ষ স্বয়ং মাহমুদ আল হাসান এই কেন্দ্রের নেতৃত্ব করছিলেন। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপ্লবীরা দেওবন্দের
-
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যে সমস্ত জাতীয়তাবাদী মুসলমান নেতা সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দিয়ে গিয়েছেন, তাদের প্রথম সারির মধ্যে মওলানা আবুল কালাম আজাদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অবিভক্ত ভারতের সর্বত্র সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে এই নামটি সবচেয়ে সুপরিচিত। মওলানা আজাদ তাঁর আত্মজীবনীতে নিজের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে যে কথাগুলি লিখে গেছেন, তা থেকেই আমরা ভারতের এই প্রতিভাশালী, সদা সক্রিয়, স্থিরবুদ্ধি ও দৃঢ়চিত্ত চরিত্রটির পরিচয় পেয়েছি।
মওলানা আজাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে একজন বাবরের ভারত অভিযানের সময় হিরাট থেকে এদেশে এসেছিলেন। মোগল রাজত্বের যুগে এই বংশের বহু কৃতি পুরুষ ধর্মীয় ক্ষেত্রে এবং সরকারী প্রশাসন কার্যে বিশিষ্ট স্থান গ্রহণ করে এসেছেন। মওলানা আজাদের পিতামহের যখন
-
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে আবদুল গফফার খানের ভূমিকা চিরস্মরণীয়। সেই কারণেই তিনি ভারতের সর্বত্র ‘সীমান্ত গান্ধী’ নামে পরিচিত হয়েছিলেন। শুধু ভারতেই নয়, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের বীর দেশপ্রেমিকের খ্যাতি ভারতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। পাঠানদের হৃদয়রাজ্যের তিনি ছিলেন একচ্ছত্র রাজা। এই দুর্ধর্ষ ও যুদ্ধপ্রিয় পাঠান জাতিকে তিনি কি করে কোন্ মন্ত্রে শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ অহিংস সংগ্রামের সৈন্যবাহিনীতে পরিণত করতে সমর্থ হয়েছিলেন, দেশ বিদেশের লোকের মনে তা গভীর বিস্ময়ের উদ্রেক করেছিল।
তাঁর জন্ম ১৮৯০ সালে, পেশোয়ার জেলার চরসদ্দার তহশীলের অন্তর্গত উৎমন্জাই গ্রামে। তিনি এক বিশিষ্ট ভূস্বামী খান-পরিবারের সন্তান। সীমান্ত প্রদেশের পাঠান জাতির এই সমস্ত খান বা সমাজপতিরা দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ অফিসারদের তাঁবেদারী
-
মওলানা হাবিবুর রহমান লুধিয়ানী ছিলেন পাঞ্জাবের লুধিয়ানার অধিবাসী। তাঁদের বংশে একটি দেশপ্রেমিক ঐতিহ্য ছিল, যেটা নিঃসন্দেহে তাঁর চরিত্রের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। এখানে সেই পুরানো দিনের কাহিনীটির উল্লেখ করছি।
এই ঐতিহ্যের উৎস সন্ধানে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের যুগে। লুধিয়ানের ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বিশিষ্ট পরিবারটি এই মহাবিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিল। পরিবারের প্রধান ছিলেন আবদুল কাদের। দিল্লীশ্বর বাহাদুর শাহ্ স্বাধীনতার ঘোষণার পর আবদুল কাদেরকে দিল্লীতে চলে আসার জন্য নির্দেশ পাঠালেন। সেই নির্দেশ পেয়ে আবদুল কাদের এবং তাঁর বীর ছেলেরা দিল্লীর পথে যাত্রা করলেন। কিন্তু সে পথ বড় বিপজ্জনক, পথে পথে ব্রিটিশ সৈন্যদের ঘাঁটি। আবদুল কাদেরের সশস্ত্র দল সেই প্রতিরোধের
-
অনুচর জমিদারদের নিয়ে গোপন পরামর্শ সভায় বসেছিলেন খুলনার জমিদারদের মধ্যমণি স্বনামখ্যাত রায় বাহাদুর। কি করে কৃষকদের কাছ থেকে সমস্ত জমি ছিনিয়ে নিয়ে তাদের খাস করে নেওয়া যায়, এই নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছিল। উদ্দেশ্যটা সাধু। কিন্তু আইনের নানা রকম বাধা রয়েছে। সেটা না হয় কোনো মতে সামলানো গেলো কিন্তু স্বদেশীওয়ালাদের মধ্যে ওই যে একটা দল আছে, যারা ‘কৃষক‘ ‘কৃষক’ বলে চেঁচিয়ে মরছে, ওদের নিয়েও চিন্তা করতে হয়। ইংরাজদের তাড়িয়ে দিয়ে নাকি দেশ স্বাধীন করবে, তারপর কৃষকদের করবে জমির মালিক। যেন মামার বাড়ীর আবদার। কিন্তু ওরা সহজ পাত্র নয়, একটু কিছু হলেই হৈ হুল্লোড় বাঁধিয়ে বসে। রায় বাহাদুরের কপাল চিন্তার রেখায় কুঞ্চিত হয়ে
-
এমন একদিন ছিল যেদিন মানুষ কথা বলতে পারতো না। পশু পাখীদের মতোই ইশারায় ইঙ্গিতে এবং নানারকম স্ফুট-অস্ফুট ধ্বনি করে তার মনের ভাব প্রকাশ করবার জন্য চেষ্টা করতো। কিন্তু সমাজবদ্ধ মানুষের কাজ-কর্ম উৎপাদনব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাদের পরস্পরের মধ্যে ভাবের আদান প্রদানের প্রয়োজন ক্রমেই বেড়ে চলেছিল। এই প্রয়োজনের একান্ত তাগিদে বহুযুগের সাধনার ফলে মানুষ কথা বলতে শিখল। সৃষ্টি হলো ভাষার। এই ভাষার সৃষ্টি ও বিকাশের মধ্যদিয়ে মানুষের মনোজগতই যে শুধু বিপ্লব ঘটে গেলো তাই নয়, সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যেও তা বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এলো। এইভাবে কি বৈষয়িক, কি মানসিক, উভয় ক্ষেত্রেই ভাষা মানব সমাজের উন্নতির একটি প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াল।
মানুষ
-
বাঘ বলল, হালুম!
তার মানে? তার মানে আমার খিদে পেয়েছে, আমি খাব।
সেই ডাক শুনে সারা বনের পশু-পাখি চমকে উঠল। ওরে বাপরে বাপ, এক একটা ডাক ছাড়ে আর সারাটা বন যেন কাঁপতে থাকে থর থর করে। পশুরা হাঁকাহাঁকি ডাকাডাকি শুরু করে দিল—পালা, পালা, পালা!
একটা লম্বা ঘুম ঘুমিয়ে নিয়ে সন্ধ্যার পর গা মোড়ামুড়ি দিয়ে উঠে বসেছে বাঘ।
পেটে এখন খিদেয় আগুন জ্বলে উঠেছে। তাই বাঘ বলল,—হালুম! তার মানে আমার খিদে পেয়েছে, আমি খাব।
ঠিক এমনি সময় শেয়ালও বেরিয়েছে খাবারের খোঁজে। পড় তো পড় একে বারে বাঘের মুখোমুখি পড়ে গেল। অবশ্য বাঘ আর শেয়াল মামা-ভাগ্নে! মামা কি আর ভাগনেকে খাবে? কিন্তু
-
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে শেখ সাহেবের আলোচনা ভেঙে গেছে। সংবাদটা সমস্ত শহরবাসীর মনের উপর কালো ছায়ার মত নেমে এসেছে। বাতাসটা যেন ক্রমেই ভারী হয়ে আসছে। বেশ বুঝতে পারছি এক মহাবিপর্যয়ের ধারালো খড়্গ ক্ষীণসূত্রে আমাদের মাথার উপর ঝুলছে। যে-কোনো সময় তা ছিঁড়ে পড়ে যেতে পারে। আমরা ক-জন বন্ধু সেই কথা নিয়েই আলাপ আলোচনা করছিলাম। কিন্তু সেই ভয়ঙ্কর সময়টা যে এখনই এসে গেছে তা আমরা কেউ ভাবতে পারিনি।
বড়ভাই হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরের মধ্যে এসে ঢুকলেন। বড়ভাই ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী। ঘরের মধ্যে ঢুকেই তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, এখানে বসে বসে করছ কি তোমরা? এখন কি বসে থাকার সময় আছে! আজ রাত্রেই ওরা হামলা
-
সুত্রাপুরের ১৯নং ওয়ালটার রোডের বাড়িটাকে আজ ক’জনই-বা চেনে! কিন্তু আজ থেকে বছর তিরিশেক আগে এই বাড়িটা পুরানো ঢাকা শহরের অধিবাসীদের অনেকের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে সময় এই ঢাকা শহরে জমিদারদের সুপরিকল্পিত উচ্ছেদনীতির বিরুদ্ধে চান্দিনা স্বত্বের প্রজাদের এক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এই আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল এই বাড়িটি আর তার স্রষ্টা ছিলেন এই বাড়ির মালিক মহম্মদ সফীউল্লাহ।
বিদ্যার দিক দিয়ে ম্যাট্রিক ফেল হলেও সফীউল্লাহ তাঁর নিজের পাড়ায় সুশিক্ষিত হিসাবেই গণ্য ছিলেন। এই অঞ্চলের স্থানীয় মুসলমান সমাজে ম্যাট্রিক পাস করা ছেলে তখন সুলভ ছিল না। কোনোকিছু নিয়ে লেখালেখি করার প্রয়োজন হলে পাড়ার লোক তাঁর কাছেই ছুটে আসত। ফলে তিনি মুখে
-
কবি সত্যেন দত্ত বহুদিন আগে মেথরদের উদ্দেশ করে ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন করেছিলেন ‘কে বলে তোমারে বন্ধু অস্পৃশ্য অশুচি?’ কিন্তু তা হলেও মেথর সম্প্রদায় আমাদের সমাজে এখনও অশুচি বলেই গণ্য। আর এই বৃত্তি অবলম্বন করার ফলে যেই পরিবেশের মধ্যে তাদের বাস করতে হয়, তা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের পক্ষে একেবারেই প্রতিকূল। অথচ তারা তাদের কাজ থেকে হাত গুটিয়ে নিলে সারা শহর-জীবন অচল হয়ে পড়বে। জননীর মতো, চিকিৎসকের মতো শহর-জীবনকে যারা সর্বভাবে পরিচ্ছন্ন ও ক্লেদমুক্ত করে চলেছে তাদের কাজ কেমন করে নীচ ও মর্যাদাহানিকর হতে পারে? যাদের নিরলস সেবা সমাজের শুচিতাকে রক্ষা করে চলেছে, তারাই হলো অশুচি! মোটামুটি সবাই এই দৃষ্টি নিয়েই তাদের দেখে
-
ঢাকা শহরের সুরসিক লোকেরা এককালে তাদের শহরের আর একটা নামকরণ করেছিল-‘বাহান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি।’ সেই নাম আজ বিস্মৃতির পথে হারিয়ে গেছে। এই বাহান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির উপরে বাইশ পঞ্চায়েত তার সার্বভৌম কর্তৃত্ব নিয়ে সমাজ রক্ষার কাজ চালাত। তাদের কথার উপর কারুর কথা বলা চলত না। বাইশ পঞ্চায়েত আজও বেঁচে আছে। কিন্তু একে বেঁচে থাকা বলা চলে না। তার মূলগুলো একটা একটা করে মরে যাচ্ছে, ডালগুলো অবসন্ন হয়ে শুয়ে পড়েছে। পাতাগুলো খসে খসে পড়ে যাচ্ছে। তার আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে এলো বলে। কালের অমোঘ বিধান কে লংঘন করতে পারে। এমন প্রবল প্রতাপশালী সরদার আর তাদের পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা! কালের বিধানে তাদেরও আজ সসম্মানে
-
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কিছুকাল বাদেই ঢাকা শহর তথা পূর্ব পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ধারায় একটা জোয়ার এসে গিয়েছিল। অনেক দিনের খরা ও অজন্মার পর কি শহর, কি গ্রামাঞ্চল সর্বত্র আবৃত্তি, নাচ, গান, বিচিত্র অনুষ্ঠানের ঢল নেমে এলো। তার সাথে সাথেই এলো নাট্যাভিনয়। যা এতোদিন এখানকার মুসলমান সমাজের কাছে যেন নিষিদ্ধ ক্ষেত্র বলেই গণ্য ছিল। সেই জোয়ারের বেগ আজও স্তিমিত হয়নি, কিন্তু তার প্রাথমিক উচ্ছ্বাস আজ প্রতিকূল পরিবেশের গায়ে মাথা ঠুকে ঠুকে মরছে। উপযুক্ত নাটক নাই, হল নাই, ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা নাই, অভিজ্ঞতা নাই, দৃঢ়মূল সংগঠনও নাই। নাই বলতে কিছুই নাই। নিয়মিতভাবে চর্চা করবার উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকলে নাট্যাভিনয়ের কালোপযোগী উন্নতি করা কোনোমতেই সম্ভব নয়।
-
মনে হয় যেন এই সেদিনের কথা। সেদিনকার ঢাকা শহরের ছবিটা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসছে। সবচেয়ে বেশী করে মনে পড়ে সেই সময়কার ঘোড়ার গাড়ীর কথা। সেদিন যদি বলত, সামনে এমন দিন আসছে যেদিন শহরের বুক থেকে ঘোড়ার গাড়ীর নাম-নিশানা লোপ পেয়ে যাবে তা হলে কিছুতেই তা বিশ্বাস করতে পারতাম না। কথাটাকে হেসেই উড়িয়ে দিতাম। ঘোড়ার গাড়ী নেই, গাড়োয়ানরা নেই, অথচ ঢাকা শহর চলছে এমন একটা কথা ভাবা যায়! অথচ আমার এই চোখের সামনে দিয়ে এই ঘটনাটা ক্রমে ক্রমে ঘটে গেল। আজ সারা শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখুন, বড়জোর দশ-বারোটা ঘোড়ার গাড়ীর খোঁজ পাবেন। পথ দিয়ে চলতে চলতে কখনো-কখনো তাদের
-
খুলনা জেলার মঙ্গলা পোর্ট। চালনার মতই এই বন্দরেও দেশ-বিদেশের জাহাজ যাতায়াত করে। রফতানির মাল জাহাজে ওঠে, আর আমদানির মাল জাহাজ থেকে নামে। কিন্তু অন্যান্য বন্দরের মতো এখানে জাহাজ ভিড়াবার জন্য ডকইয়ার্ডের ব্যবস্থা নেই। জাহাজগুলিকে মুড়িংবয়ার সঙ্গে বেঁধে দিয়ে মালপত্রের ওঠানামা চলে।
মঙ্গলা পোর্ট খুলনা শহর থেকে বহু দূরে। জলপথ ছাড়া সেখানকার সঙ্গে যাতায়াতের কোন ব্যবস্থা নেই। ফলে মঙ্গলা পোর্ট যেন সব কিছু থেকে এক প্রান্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আছে। সারা প্রদেশ জুড়ে স্বাধীন বাংলার আন্দোলন চলছে। কিন্তু এখানে তেমন কোনো আন্দোলন নেই। তাহলেও এই বাংলাদেশের যেখানেই যত দূরেই থাকুক না কেনো এই আন্দোলন প্রতিটি বাঙালির মনে সাড়া জাগিয়ে তুলেছে। মঙ্গলার
-
ইকবাল ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম পরিচয় বনগাঁ শহরে। তিনিই আমাকে খুঁজে নিয়েছিলেন, না আমিই তাঁকে খুঁজে বের করেছিলাম, সে কথাটা এখন ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে খুব অল্প সময়ের ভেতরেই আমাদের দু’জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে একথা ওকথা বলতে বলতে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের এক বিয়োগবিধুর ও মর্মস্পর্শী কাহিনী বলে চলেছিলেন। ইকবাল ভাইয়ের সঙ্গে ইতিপূর্বে পরিচয় না থাকলেও আমি তাঁর নাম শুনেছি। তাঁর বাড়ি যশোর জিলার ঝিনাইদহ মহকুমায়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে এসে তিনি কোনো এক কলেজে অধ্যাপকের কাজ শুরু করেছিলেন। ভেবেছিলেন, অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার মধ্য দিয়েই জীবনটা কাটিয়ে দেবেন। এর চেয়ে আনন্দময় জীবন আর কি হতে পারে! কিন্তু
-
আজ থেকে অন্ততঃপক্ষে দেড় শো বছর আগেকার কথা। সেদিনকার ঢাকা শহর আর আজকার ঢাকা শহরের মধ্যে মিলের চেয়ে অ-মিলই বেশী। বাড়িঘর, পথঘাট, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা, শিক্ষা-সংস্কৃতি-প্রভেদ ছিল সব দিক দিয়েই। বাদশাহী আমলের প্রভাব তখনও সমাজের সর্বদেহে ব্যাপ্ত হয়েছিল। বৃটিশ শাসনের মূল তখন দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে চলেছে বটে, কিন্তু নতুন যুগের নতুন অর্থনীতি তখনও এখানকার প্রচলিত অর্থনীতিকে মরণ আঘাত হেনে ব্যাপক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে তোলে নি, দুটো বিপরীত অর্থনীতি তখন সবেমাত্র পরস্পরের সঙ্গে মোকাবিলা করছে এবং দু-একটা সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে ছোটোখাটো সংঘাত ও শক্তি পরীক্ষার সূচনা দেখা দিয়েছে।
সেদিন এই নগর তথা সারা প্রদেশের অর্থনৈতিক জীবনে বুড়ীগংগার এক বিরাট ভূমিকা ছিল।
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
উৎস
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.












