ঝরণা
স্নেগোভেৎসের উপকণ্ঠে আসতেই ভীষণ ঝড়বৃষ্টি সুরু হয়ে গেল।
চারিদিক অন্ধকার। বৃষ্টির পর্দার আড়ালে পাহাড়গুলো ঢাকা পড়ে গেছে। ধূলোর প্রচণ্ড ঘূর্ণি রাস্তা থেকে লোকের ফেলে যাওয়া ছেঁড়া কাগজের টুকরো আর কাটা ঘাসের গোছা উড়িয়ে নিয়ে চলেছে। বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়ল রাস্তায়। এক মুহূর্তের মধ্যেই রাস্তার গা বিচিত্র ফোঁটায় ভরে গেল।
বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য কাছের বাড়িটার দিকে আমরা দৌড় মারলাম। কাঠের গুঁড়ির বাড়ি। বহু পুরনো কালের চালটা সবুজ শ্যাওলায় সম্পূর্ণ ছেয়ে গেছে। রাস্তার লেভেলের নিচেই বাড়িটা দাঁড়িয়ে। মাটির গায়ে কয়েকটা সিঁড়ি, পাশটা পাথরের তৈরী, চলে গেছে দরজা পর্যন্ত।
লাফ দিয়ে বাড়িটার প্রবেশপথে ঢুকেছি এমন সময় অন্ধকার চিরে চমকে উঠল বিদ্যুৎ। মনে হল কেউ যেন রূপকথার দেশের গাছের সোনার আঁকাবাঁকা শিকড় মাটি থেকে উপড়ে এনে আকাশে ছাঁড়ে দিয়েছে।
মাটি কেঁপে উঠল, মুষলধারে বৃষ্টি নামল।
প্রবেশপথ থেকে ঘরে ঢোকার দরজাটা আধভেজান। মনে হল ভিতরে কেউ নেই। তবু দরজার সামনে থেমে হাঁকলাম:
‘আসতে পারি?’
‘নিশ্চয়ই,’ কে যেন ধরা গলায় জবাব দিল, ‘আসুন।’
রুকস্যাক আর লাঠিগুলো বাইরেই রেখে দিলাম। পাহাড়ের চারণভূমিতে রাখালদের কাছে গিয়েছিলাম, রুকস্যাক আর লাঠিগুলো যাত্রাপথে খুবই কাজ দিয়েছে। আমরা ঘরে ঢুকলাম।
বেশ সাজান গোছান ঘর, কিন্তু বড্ড যেন ফাঁকা ফাঁকা। আসবাবপত্র বলতে তো কেবল একটা টেবিল, দুটো বেঞ্চি আর চুল্লীর কাছে একটা বিরাট কাঠের খাট। বছর ষাটেকের একটি লোক খাটের উপর বসে। হাড় বের করা গোমড়া মুখ। কাঁধের উপর একটা ছাগলের চামড়ার কোট চাপান, পাদুটো ফিতে না লাগান ভারী বুটের ভিতর ঢোকান।
গৃহকর্তার মুখ দেখে মনে হল আমরা আসায় তাঁর মনে কোন ভাবেরই উদ্রেক হয়নি, এমন কি সাধারণ কৌতূহলও নয়।
‘বসুন,’ ভদ্রলোক বললেন। গোঁফে ঢাকা মুখের ভিতর একটা ঘরে তৈরী লম্বা পাইপ পুরে ধূমপান করতে লাগলেন।
ঝড় একেবারে ঘরের চালের উপর দিয়েই গর্জন করে ছুটে চলেছে। একেকবারে বাজ যখন পড়ে তখন কাঠের বাড়িটা থরথর করে কেপে ওঠে, দেয়ালে ঝোলান ছোট্ট তাকটায় সামান্য যা বাসনপত্তর রয়েছে সেগুলো ঠুংঠাং আওয়াজ তোলে।
ভদ্রলোক কিন্তু যেন সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। আমরা বা ঝড়—কারো প্রতিই তাঁর কোন খেয়াল নেই। থেকে থেকেই কেবল কাঁধের কোটটা সোজা করে নেন, আর অদ্ভুতভাবে দুহাত দিয়ে ধরে এক পায়ের উপর আরেক পা তুলে দেন।
‘আপনি কি অসুস্থ?’ আলাপ সুরু করার চেষ্টায় বললাম।
‘হ্যাঁ,’ ভদ্রলোক বিশেষ গা না লাগিয়ে বললেন।
‘কী হয়েছে?’
ভদ্রলোক আমায় একবার দেখে নিলেন। বোধ হয় উত্তরটা দেওয়া উচিত হবে কি না সেটাই সমঝে নিলেন। তারপর কিছু অনিচ্ছার সঙ্গেই বললেন: ‘পাদুটো নিয়ে ভুগছি।’
‘অনেকদিন থেকেই ভুগছেন?’ আমাদের দলের ডাক্তারী ছাত্রটি বলে উঠল। উজগরদে তার বাস। রোগীকে তখন তখুনি সাহায্য করার জন্য সে বিশেষ উৎসুক।
বুড়ো ভদ্রলোক ছেলেটির দিকে নির্লিপ্তভাবে তাকিয়ে রইলেন।
‘ট্রেঞ্চে থাকতেই সুরু হয়, সেই প্রথম জার্মানযুদ্ধে।’
খাঁটি রুশী ধাঁচের কথা: ‘জার্মানযুদ্ধ’। রাশিয়ার অভ্যন্তরে এখনো বুড়োদের মধ্যে ‘জার্মানযুদ্ধ’ কথাটা প্রচলিত।
‘আপনি এখানকার লোক নন?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘এখানকারই লোক, তবে রাশিয়া থেকে এসেছি।’
‘এখানে অনেকদিন আছেন কি?’
‘১৯১৫ সাল থেকে। যুদ্ধবন্দী।’
‘তারপর আর বাড়ি ফিরে গেলেন না কেন?’
‘এমনি,’ ভদ্রলোক কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘এখানকার লোকরা তো আর আমাদের পর নয়...বিয়ে করলাম...ছেলেপুলেও হল...দেশে আমার কেউ ছিল না।’
‘আপনি কোন অঞ্চল থেকে আসছেন?’ জিজ্ঞেস করল আন্না মামুলিয়া। পশুপালনবিদ সে, ওই আমাদের রাখালদের কাছে নিয়ে গিয়েছিল।
‘আমি স্মলেনস্কের লোক,’ বুড়ো একটু চাপা স্বরে বললেন, ‘পুনেভো গ্রামে বাড়ি।’
আমি চমকে উঠলাম।
‘ওগ্রিজ্কভোর কাছে কি? এই গেল বছরই তো আমি সেখানে গিয়েছিলাম।’
গৃহকর্তার মুখে কোন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments