বল-নাচের পর
‘তাহলে আপনারা বলছেন ভালোমন্দের স্বাধীন বিচারশক্তি মানুষের নেই, সব হচ্ছে পরিবেশের ব্যাপার, মানুষ পরিবেশের ক্রীড়নক। কিন্তু আমার মনে হয় সব হল দৈবের হাতে। নিজের বিষয়ে বলি শুনুন...’
বললেন আমাদের সকলের মাননীয় বন্ধু ইভান ভাসিলিয়েভিচ একটি আলোচনার উপসংহারে। ব্যক্তির উন্নয়নের জন্য আগে দরকার পরিবেশ বদলানো, যে অবস্থায় লোকে আছে সে অবস্থাটা বদলানো, এই নিয়ে চলেছিল আমাদের কথাবার্তা। সত্যি বলতে, ভালো কা মন্দের বিচারশক্তি অসম্ভব- এমন কথা কেউ বলে নি, কিন্তু ইভান ভাসিলিয়েভিচের অভ্যেস ছিল, আলোচনা প্রসঙ্গে নিজের মনেই যে সব ভাবনা উঠেছে তারই জবাব দেওয়া এবং সেই উপলক্ষে নিজের জীবনের নানা ঘটনার কথা বলা। মাঝে মাঝে গল্পতে তিনি এত মত্ত হয়ে যেতেন যে কেন বলছেন মনে থাকত না, বিশেষ করে এজন্য যে তিনি সর্বদা গল্প বলতেন গভীর আন্তরিকতায় ও সততায়।
এবারেও তিনি তাই করলেন।
‘আমার কথা বলি। ওভাবে নয়, আমার সারা জীবনটাই গড়ে পরিবেশের দরুন নয়, সম্পূর্ণ অন্য কিছুর উঠেছে অন্যভাকে ফলে।’
‘কিসের ফলে?’ আমরা শুধালাম।
‘সে অনেক কথা। বুঝতে গেলে অনেক কিছু বলতে হয়।’
‘বলুন না শুনি।’
মাথা ঝাঁকিয়ে মূহূর্তখানেক ভেবে নিলেন ইভান ভাসিলিয়েভিচ।
‘হ্যাঁ,’ তিনি বললেন, ‘একটা রাত্রি, বরং একটা সকাল আমার জীবনে আমূল পরিবর্তন আনে।’
‘কি হয়েছিল?’
‘হয়েছিল কি দারুণ প্রেমে পড়েছিলাম। অনেকবার প্রেমে পড়েছি, কিন্তু এমন গভীরভাবে নয়। অনেক দিন আগেকার কথা ওর মেয়েদের এদ্দিনে বিয়ে-থা হয়ে গিয়েছে। ওর নাম ব., ভারেঙ্কা ব...’ মহিলার পদবীটা বললেন ইভান ভাসিলিয়েভিচ। ‘পঞ্চাশেও ওর চেহারা ছিল তাকিয়ে দেখার মতো, কিন্তু যৌবনে, আঠারো বছর বয়সে ও ছিল মোহিনী: দীর্ঘাঙ্গী সুঠাম লাবণ্যময়ী, গরীয়ান, রাণীর মতো, হ্যাঁ, ঠিক রাণীর মতো। ভঙ্গিটা ছিল একেবারে খাড়া হয়ে, যেন খাড়া না হয়ে সে পারেই না। মাথাটা থাকত একটু পিছনে হেলানো। রোগা বলতে হাড্ডিসার হলেও এটা তার দীর্ঘাকৃতি ও রূপের সঙ্গে মিলে চেহারায় এমন একটা রাণীর মতো ভাব আনত যে লোকে সভয়ে পিছিয়েই যেত যদি না তার হাসিটা হত এত উচ্ছল, মনভোলানো, চোখদুটো এত দীপ্ত অপরূপ, যদি না তার যৌবনোচ্ছল সত্তায় থাকত এত মোহ।’
‘ইভান ভাসিলিয়েভিচ বর্ণনা দিতে পারেন বটে।’
‘যতই বর্ণনা দিই, আপনাদের বোঝাতে পারব না সে দেখতে কেমন ছিল। তবে সেটা অন্য কথা। যে ঘটনাটার কথা বলছি সেটা ঘটে পঞ্চম দশকে। প্রাদেশিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন। জানি না ভালো কি মন্দ, কিন্তু সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের না ছিল কোন পাঠচক্র না ছিল মতবাদের বালাই; আমরা ছিলাম শুধু নওজোয়ান আর থাকতাম ঠিক জোয়ানদের মতো, পড়াশুনো করতাম আর ফুর্তি চালাতাম। অত্যন্ত ফুর্তিবাজ ও তুখোড় ছোকরা ছিলাম আমি তারপর পয়সাকড়ি ছিল মন্দ নয়। একটা তেজী ঘোড়ার মালিক, মেয়েদের নিয়ে শ্লেজে চেপে পাহাড় গড়িয়ে নামতাম (স্কেটিং-এর রেওয়াজ তখনো আসে নি); বন্ধুদের সঙ্গে যেতাম মদের আড্ডায় (সে সব দিনে শ্যাম্পেন ছাড়া কিছু ছাতাম না; পকেটে পয়সা না থাকলে কিছুই খেতাম না, আজকালকার মতো ভোদকা চলত না আমাদের); কিন্তু আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ছিল পার্টি আর বল-নাচ। নাচতাম ভালোই, চেহারাটাও কুৎসিত ছিল না।’
‘থাক, আর বিনয় করবেন না,’ এক ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন। 'আপনার ফোটো আমরা সবাই দেখেছি। খারাপ কেন, চেহারাটি খাসা ছিল আপনার।’
‘হয়ত ছিল, কিন্তু কথাটা ওটা নিয়ে নয়। কথাটা হল, আমার সে সময় হাবুডুবু প্রেম। শ্রোভটাইডের শেষ দিনে গেছি একটা বল-নাচে মার্শালের ওখানে, বৃদ্ধটি দিলদরাজ, ধনী, অতিথি আপ্যায়ন করতে ভালোবাসতেন। তাঁর স্ত্রী ঠিক স্বামীর মতো অমায়িকভাবে অতিথিদের অভ্যর্থনা করলেন। পরনে মখমলের গাউন, মাথায় হীরের টায়রা, বার্ধক্যের ছাপ লাগা গোলগাল শাদা গলা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments