মনের রোগ সম্পর্কে কয়েকটি সাধারণ কথা

লেখক: ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়

মনের রোগ নিয়ে জ্ঞানী-গুণীজন যে উঁচুদরের আলোচনা করেছেন এবং করবেন তার জন্য তাঁদের আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সাধারণ মানুষের রোগ সম্পর্কে ধারণা কিন্তু কেতাবী তত্ত্বের সঙ্গে অনেক সময়েই মেলে না। আমার কাছে সাধারণ মানুষের ধারণা যেভাবে ধরা পড়েছে, তারই কিছু বিবরণ এখানে দিচ্ছি।

এমন এক সময় ছিল একথা আপনারা সকলেই জানেন-মনের রোগকে শয়তান বা প্রেতাত্মা প্রভাবিত বলে মনে করা হত। তখন তাদের যে চিকিৎসা হত তাও আমাদের সবার জানা। তবুও পুনরুল্লেখ করছি। তাদের পা বেঁধে মাথা নীচুর দিকে করে ঘরের ছাদের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হত এবং মাঝে মাঝে তাদের নগ্ন দেহের উপর আঘাত করে প্রেতাত্মা বা শয়তানকে শাস্তি দেওয়া হত। ফরাসী বিপ্লবের অব্যবহতি পরেই এই উন্মাদাগারগুলির অধ্যক্ষ, এক চিকিৎসক, প্রথম উন্মাদদের প্রতি অমানবিক আচরণের অবসান ঘটান। সেই থেকে ইউরোপের প্রায় সব দেশেই 'বাতুলতা' একট রোগ বলে গণ্য হয়। বিজ্ঞান অনুমোদিত চিকিৎসায় দেহের রোগের মতন মনের রোগেও উপশম ঘটতে পারে এই বিশ্বাস সকলেই পোষণ করতে লাগল্পে। তারপর অনেকদিন গেছে। চিকিৎসারও অনেক উন্নতি হয়েছে। আশু উপশমের ব্যবস্থা সবক্ষেত্রে না হোক অনেক ক্ষেত্রে আমাদের করায়ত্ত। কিন্তু জটিল ও গুরুতর মনোরোগ যথা স্কিজোফ্রেনিয়া, ম্যানিকডিপ্রেসিভ, সাইকোসিস ইত্যাদির পুনরাক্রমণ রোধ করা যাচ্ছে না।

আমার আলোচনা কিন্তু চিকিৎসা-সংক্রান্ত নয়। সাধারণ মানুষ তাঁদের জ্ঞান, বুদ্ধি ও সংস্কৃতি-অনুযায়ী মনোরোগ সম্পর্কে যে ধারনা এই বিশ শতকের শেষ দশকের কাছে এসেও পোষণ করছেন, তাই নিয়েই দু'চার কথা বলব। কিছুদিন আগে মানবমনে একটি প্রবন্ধে লিখেছিলাম যে মুসলমানদের নমাজ পাঠ সম্পর্কে যিনি পুরোপুরি অনভিজ্ঞ, তিনি কোনও রাস্তা বা কোনও মাঠের একপাশে একখানা গামছার ওপরে এক ব্যক্তির নমাজ, পাঠের সময়কার অঙ্গভঙ্গী লক্ষ্য করলে নিশ্চয়ই মনে করবেন লোকটি অস্বাভাবিক বা উন্মাদের মত আচরণ করছে। অন্য গ্রহবাসী কেউ যদি দারুণ শীতের ভোরে গঙ্গাসাগরে স্নানরত বৃদ্ধবৃদ্ধাদের দেখেন, তাঁর নিশ্চয়ই মনে হবে এরা অস্বাভাবিক—অবশ্য যদি তাঁর স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক সম্পর্কে ধারণা আমাদের মত হয়। কিছুদিন আগেও আদিবাসীদের দু'একটি সম্প্রদায় মুণ্ডমালা গলায় ধারণ করে গর্ব বোধ করত: সম্প্রদায়ের মধ্যে এ ছিল শৌর্যসূচক একটি মহৎ কাজ—আমাদের কাছে যা বর্বরতা অথবা উন্মত্ত হিংসাত্মক আচরণের নিদর্শন। এই কম্পিউটারের যুগে শিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ার রোগীর আত্মীয়রাও অনেক সময় বলেন যে এক বন্ধুর বাড়ীতে রাত্রিবেলায় চা খাবার পর থেকে ভদ্রলোকের রোগ লক্ষণ দেখা দিয়েছে; চায়ের সঙ্গে তারা কিছু মিশিয়ে দিয়েছিল, নিশ্চয়, তুকতাক্ মারণউচাটন ইত্যাদি কথাগুলো শুধু যে প্রচলিত তাই নয় অনেকের মধ্যেই এই বিশ্বাসগুলি জাগ্রত এবং মনের রোগের ক্ষেত্রে এর প্রভাব অনেকেই স্বীকার করেন। অবশ্য সম্প্রদায় বিশেষের নিজস্ব ধ্যান ধারণা, তাঁদের বিশ্বাস এবং সংস্কারকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে সব ডাক্তারই জানেন যে শতকরা পঞ্চাশ-জন রোগী ঝাড়ফুক, কালীবাড়ি, পীর ফকির, সাধু-সন্ন্যাসী ইত্যাদির দ্বারা চিকিৎসিত হয়ে তারপর তাঁদের কাছে আসেন। রোগ ততদিনে প্রায় চিকিৎসার বাইরে চলে যায়।

এ থেকে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, দেড়শো বছর আগেকার ধারণা এখন ও জনসাধারণের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে প্রভাব বিস্তার করে আছে। বিজ্ঞানের অধ্যাপকের পুত্রের হাতে যখন অসুখ সারাবার মাদুলী বা তাবিজ দেখতে পাই, আজুলে হাজার টাকা দামের রত্ন ঝক্ করে, তখন বুঝতে পারি মনোরোগের সংজ্ঞা, তত্ত্ব এবং শ্রেণীবিভাগের মধ্যে কোথাও বোধহয় গোলমাল আছে যার জন্য মনোরোগ সম্পর্কিত প্রাচীন ধারনায় এখনও জনসাধারণ আচ্ছন্ন।

কোনও আধুনিক মনোরোগ বিদ্যার বই খুললে দেখতে পাই বিশেষজ্ঞরা মনোরোগের তত্ত্ব এবং কারণ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মত পোষণ করেন যা অনেক সময় একেবারে বিপরীত ধর্মী। তরুণ চিকিৎসকরা বিভ্রান্ত বোধ করেন নিশ্চয়ই। রোগের শ্রেণীবিভাগ ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে (রোগের কারণ,

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice