বিজয়ের মাসে এক নারী মুক্তিযোদ্ধার বেদনাগাথা

লাখো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এ স্বাধীনতা। আমাদের প্রিয় স্বাধীনতার জন্য অনেক মা হারিয়েছেন তার সন্তান, নারী হারিয়েছেন তার সম্ভ্রম। ১৯৭১ সালে রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি নরপিশাচেরা তখন পৈশাচিক কার্যকলাপে নিয়োজিত, বহু নারীর জীবন ধ্বংসের খেলায় ছিল মাতোয়ারা। তেমনই ভয়াল কালো থাবার শিকার বীরাঙ্গনা নারী কাননবালা। তখন গোপালগঞ্জের ভাজন্দি গ্রামের এক হিন্দু পরিবারের কিশোরী কাননবালা। তারা ছয় ভাই ও দুই বোন। ১৯৭১ সালের আষাঢ় মাসের এক বৃষ্টিভেজা অন্ধকার রাতে রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা ঘিরে ফেলে কাননবালাদের বাড়ি। ঠাকুরমাকে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় তাকে। তার বাবা-মা-ভাইদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। কাননবালার চোখ বেঁধে তাকে নিয়ে তোলে নৌকায়, ভয়ে ও কষ্টে জ্ঞান হারায় কাননবালা। পরে নিজেকে আবিষ্কার করে ১৫-১৬ জন নারীর সাথে এক কক্ষে। তাদের পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়ংকর থাবা থেকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসেন মুক্তিযোদ্ধা মোশারফ শেখ, বর্তমানে তার স্বামী। মাত্র ২১ বছর বয়সে মোশাররফ শেখ বাড়ি থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। মোংলা বন্দর থেকে আসা হানাদার বাহিনীর অস্ত্র ও মালপত্র ছিনিয়ে নিতে গিয়ে বাঁ হাতে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। চিকিৎসা করে সুস্থ হলে জানতে পারেন পাকিস্তানি বাহিনী পাশের গ্রামের চার-পাঁচজন নারীকে ধরে নিয়ে ক্যাম্পে আটকে রেখেছে। তিনিসহ প্রায় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা হামলা চালান বাইকামারী ক্যাম্পে। হানাদার বাহিনী যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পালিয়ে গেলে উদ্ধার করেন প্রায় এক মাস ধরে বন্দি কাননবালাসহ আরও চার-পাঁচজন নারীকে। পাকিস্তানিদের তাদের প্রাপ্ত শান্তি দিতে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নেন কাননবালা এবং মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা অর্জনের পর বাড়ি ফিরে এলে তার পরিবার তাকে গ্রহণ করেনি। বাবা, মা ও ভাইয়েরা চলে যায় ভারতে।

সে সময় তার পাশে এসে দাঁড়ান মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ শেখ। কাননবালাকে বিয়ে করায় মোশাররফ শেখের পরিবার তাকে তাড়িয়ে দেয়। মোশাররফ শেখের এ মহানুভব মানসিকতা তাকে বেঁচে থাকার সাহস জুগিয়েছে। বিয়ের পর তার নাম হয় নাজমা বেগম। তিনি এক নতুন জীবনযুদ্ধের মুখোমুখি এসে দাঁড়ান। যুদ্ধে তার মতো অত্যাচারিত নারীদের প্রতি সমাজের বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি তার চলার পথকে করে তোলে আরও দুর্বিষহ। তার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। তার স্বামী মোশাররফ শেখ হকার এবং কাননবালা ৩৮ বছর ধরে গার্মেন্টসে ঝুট বাছাইয়ের পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। তার বাসা মিরপুর ১০-এর ওয়াপদা বিল্ডিংয়ের পেছনের বস্তিতে। তিনি স্বল্প আয়ের মধ্যেও তিন ছেলে ও এক মেয়েকে পড়াচ্ছেন। তবে বড় মেয়েকে আর্থিক অনটনের কারণে উচ্চমাধ্যমিক পাস করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। তার ছেলের পরীক্ষার ফি দিতে না পারায় মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে পারেনি। প্রায় ১৫ বছর আগে প্রশিকা তাদের মতো বীরাঙ্গনাদের জন্য ৩০০ টাকা মাসিক ভাতা চালু করলেও বর্তমানে তা বন্ধ রয়েছে।

ছোটবেলায় নারী হিসেবে নিজে পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তারপরও ছেলেমেয়েদের পড়ানোর মানসিকতা ও যুদ্ধে অংশগ্রহণের মতো সাহসী মনোভাব অন্য সব নারীর জন্য দৃষ্টান্তস্বরূপ।

শুধু নাজমা বেগম নন, আরও বহু বীরাঙ্গনা সমাজের ভয়ে নিজেদের লুকিয়ে রেখেছেন। সমাজের এ দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মতো হানাদার বাহিনীর পাশবিক অত্যাচারের শিকার এ নারীদের স্বীকৃতি * দিতে হবে। যুদ্ধের জন্য তাদের এ ত্যাগের মূল্যায়ন করতে হবে। দেশকে স্বাধীন করার জন্য, মুক্তিযোদ্ধা নাজমা বেগম বিশাল ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আজ স্বাধীন দেশ তার সন্তানের শিক্ষার নিশ্চয়তাটুকুও দিতে অক্ষম। সরকার ও বিভিন্ন সংগঠন আজ এগিয়ে আসতে পারে নাজমার মতো বীরাঙ্গনাদের সমাজে সম্মান নিশ্চিত করতে ও ভাতা প্রদানের মধ্য দিয়ে তাদের জীবন চলার পথকে সহজতর করতে।

কে আমি?, সামিহা সুলতানা অনন্যা, দ্যু প্রকাশন, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০২০

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice