ধীরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতি
লেখক: কাজল বন্দোপাধ্যায়ায়
১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয় 'ভাষা শহীদ গ্রন্থমালা'। এই গ্রন্থমালার বই স্বপ্ন লেখার দায়িত্ব পেয়ে আমি যেমন সম্মানিত বোধ করি, তেমনি উদ্বিগ্ন। বিষয়টির নানা দিক ও মাত্রা রয়েছে। বিষয়টিকে সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মতভাবে উপস্থিত করাও ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। 'স্বপ্ন' বিষয়টি মনোবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু মনোস্তত্ত্বের বস্তুবাদী ধারার সঙ্গে তখনও আমার পর্যাপ্ত পরিচয় ঘটেনি। আমাদের দেশের জ্ঞানবিজ্ঞানের এলাকায় মনোবিজ্ঞানী হিসেবে ফ্রয়েড, ইয়ুং, এ্যাডলারদেরই জয়-জয়কার; শিল্পসাহিত্যেও ফ্রয়েডীয় ভাবধারার বিশাল, প্রায় একচ্ছত্র প্রভাব। এমনকি মার্ক্সবাদীরাও দেখেছি ফ্রয়েডীয় মনোস্তত্ত্বের ভাববাদী চরিত্র সম্পর্কে অবগত নন। এরূপ একটি পরিস্থিতিতে শ্রদ্ধেয় যতীন সরকার আমাকে অত্যন্ত বড় সাহায্য করেন। তিনিই আমাকে বলেন শ্রী ধীরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের দুইখণ্ডে প্রকাশিত বই পাভলভ পরিচিতি-র সাহায্য নিতে। বাংলাভাষায় বিচ্ছিন্নতাতত্ত্বের (Theory of Alienation) প্রবক্তা হিসেবে শ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম ও বইয়ের সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচয় ছিল। ওঁর লেখা বিচ্ছিন্নতার ভবিষ্যত বইটি কিনে আমি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে দিয়েছিলাম, তিনিও বিচ্ছিন্নতার ধারণাটি সম্পর্কে ঐ বইয়ের সাহায্য নিয়ে প্রবন্ধাদি লিখেছিলেন মনে পড়ে। এবারে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ধীরেনবাবুর পথিকৃতের ভূমিকার সঙ্গে সবিস্তারে পরিচিত হলাম। শুধু পাভলভপরিচিতি-র লেখক নন, শ্রী ধীরেন গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতার পাভলভইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা এবং আমৃত্যু তার প্রাণপুরুষ। ঐ ইনস্টিটিউট থেকে তাঁরা দীর্ঘকাল প্রকাশ করেছেন মনোস্তত্ত্ব, সমাজ, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে চমৎকার মননশীল পত্রিকা মানবমন।
জাস্বপ্ন বইটি প্রকাশিত হলে আমি তার একটি কপি ধীরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের নিকট পৌঁছুবার জন্যে উদগ্রীব বোধ করি। তখন একবার কলকাতা যাওয়ার সুযোগও এসে গিয়েছিল। পিএইচডি-পর্যায়ের গবেষণা করার জন্যে স্বপ্নভিত্তিক সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে ভাবছিলাম। কলকাতা কিংবা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অবকাশ কিছু রয়েছে কি-না, খুঁজেছি। কলকাতায় ধীরেনবাবুর বাড়িতেই ছিল পাভলভ ইনস্টিটিউটের কার্যালয়। সেখানে গিয়ে দেখা পেয়েছিলাম এক অক্লান্ত মনীষী-বুদ্ধিজীবীর। মানবমন পত্রিকার অন্যান্য কর্মীদেরকে দেখলাম, তাঁদের কাউকে-কাউকে নিয়ে ধীরেনবাবুর ছিল একটি নাটকের গ্রুপও। ধীরেনবাবুর নিজের লেখা নাটকও তারা মঞ্চস্থ করেছে। কিন্তু, নাটক তো 'বাহা'। মনোবিদ হিসেবে চিকিৎসা-কর্মকাণ্ড, মানবমন পত্রিকাসহ পাভলভইনস্টিটিউটের বিভিন্নমুখী কাজ-এসবই ছিল মূল। একদিন এমন একটি সভায় উপস্থিত দেখলাম অধ্যাপক সুশীল কুমার মুখোপাধ্যায়, উ. বেলা দত্তগুপ্ত, প্রমুখকে। তাঁরা গবেষণা-কাজের ব্যাপারে আমাকে অনেক উৎসাহ দিলেন, স্বপ্ন বইটির ব্যাপারেও। মানবমন পত্রিকার পুরনো কিছু সংখ্যা আমাকে বিনামূল্যে দিলেন। ধীরেনবাবুর কন্যা উশ্রীও পিতার পাভলভ ইনস্টিটিউটের কর্মী। গোটা পরিবারই একটি আদর্শ-উজ্জীবিত দল। পাভলভ মনোস্তত্ত্ব সম্পর্কে উশ্রীর ইংরেজিতে লেখা একটি পুস্তিকা আমি পরবর্তীকালে অনুবাদ করি। কাজকান চায়। উজ্যাৎ উকিল চট্টজোর উৎ ম্যাসাচ্যাক
ধীরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে সেবারে সংঘঠিত যোগাযোগ দীর্ঘকাল বজায় ছিল। মানবমন পত্রিকায় স্বপ্ন বইটির একটি সমালোচনা ছাপা হয়েছিল। এ-ব্যাপারে একবার তিনি আমাকে নিম্নরূপ একটি চিঠি লিখেছিলেন—
১৩২/১এ বিধান সরণি
কলকাতা ৭০০০৪৪
১১/৪/৮৭
প্রীতিভাজনেষু,
শরীর ভাল যাচ্ছিল না। উত্তর দিতে দেরি হল। মনে কিছু করবেন না। বইটি ভাল লেগেছে। 'মানবমন' এর ১৯৮৮ জানুয়ারী সংখ্যায় বইটির সমালোচনা প্রকাশ করার ইচ্ছে আছে। অক্টোবর সংখ্যায় স্থানাভাব ঘটেছে। এ বিষয়ে আপনার formal সম্মতি দিয়ে একটা চিঠি দেবেন।
প্রতিটি চিঠির সঙ্গে ঠিকানাটা লিখবেন। আমি একটু অগোছালো ব্যক্তি। রোগীদের চিঠি ও অন্যান্য চিঠি এলে সপ্তাহে প্রায় ৫০/৬০ খানা চিঠি লিখতে হয়। ঠিকানা হাতের কাছে পেলে সুবিধে হয়।
আপনার এখানে আসার সম্ভাবনা আছে জেনে সুখী হলাম।
প্রীতিনমস্কার। ইতি শুভার্থী
ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়
পরবর্তী সময়ে ১৯৯০-৯৪ সালে আমি যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার কাজ করেছি, তখনও বেশ ক'বার ধীরেনবাবুর কাছে গিয়েছি। অনন্য একজন প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী হিসেবে ওঁর একটি সীমিত মাপের প্রতিষ্ঠাও আমি কলকাতায় দেখতে পেয়েছি। কিছু সভাসমিতিতে অন্তত ওঁর ডাক পড়তো। তবে, সে প্রতিষ্ঠা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments