অন্তিম হাসি
কমরেড ভরদ্বাজের সাথে আমার প্রথম দেখা লাহোরে ১৯৩৭ সালে। সেইসময় পার্টিকে বে-আইনী ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই সঙ্গে পার্টির সব সদস্যই ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’এ চলে গিয়েছিল। ভরদ্বাজের গায়ের রং ছিল শামলা, কাঁধ ছোট আর রোগা পাতলা শরীর। তাকে দেখে মনে হত না যে তার ভেতরে এত অফুরন্ত প্রাণশক্তি সঞ্চিত আছে যা দিয়ে সে এত পরিশ্রম করতে পারে বা একজন রাষ্ট্রবাদী বা সমাজবাদীব জীবনে যত রকম বিপদ আছে তার অনায়াস মোকাবিলা করতে পারে।
আমি সেই সময় কলেজে পড়তাম, সেই সময় আমার চিন্তাভাবনায় ব্যক্তি উপাসনার কোন স্থান ছিল না। তাই ভরদ্বাজের ব্যক্তিত্ব আমার উপর লেশমাত্র প্রভাব ফেলে নি। সেই সময় পাঞ্জাবে কংগ্রেস নিজেদের টানাপোড়েনে ব্যস্ত। যুব সম্প্রদায় বিভিন্ন রকম রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হয়ে কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টির দিকে ঝুঁকছে। সমাজবাদীদের স্লোগান হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘পপুলার ফ্রন্ট’। সেই সময় সমাজবাদী কম্যুনিষ্ট র্যাডিক্যাল গণতান্ত্রিক পার্টি, পুরানো বিপ্লবী সংগঠনগুলো ও নওজোয়ান ভারত সভা অর্থাৎ সব সংগঠনের সদস্যরাই কংগ্রেস সমাজবাদী পার্টির সদস্য ছিল। যদিও ‘পপুলার ফ্রন্ট’ ঠিক ফ্রন্ট ছিল না কিন্তু তা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ছিল। সারাদিন ব্রাড়লে হলের সভায় কোন গঠনমূলক প্রস্তাব বিচার করার থেকে অনেক বেশী সময় আলোচনা চলত ‘অমুক ব্যক্তি কি সি.আই.ডি-র লোক?’ আমি এক বছর ধরে দেখেছিলাম যে সব মিটিং—একে অপরের বিরুদ্ধে সি.আই.ডি-র লোক হওয়ার অভিযোগ আনছে, আর তাই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত “পপুলার ফ্রন্ট” ঠিক নিশ্চিত হতে পারছে না কে সি.আই.ডি-র লোক আর কে নয় !
সেই সব দিনে পাঞ্জাবের যুব সম্প্রদায় সশস্ত্র সংগ্রামের ভাবধারায় বিশ্বাসী হয়ে কোন পথের সন্ধান না পেয়ে কখনও অরাজকতা, কখনও আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে, কখনও সমাজবাদীদের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে, আবার কখনও র্যাডিকাল গণতান্ত্রিক পার্টির সঙ্গে থেকে আন্দোলন করার চেষ্টা করছে। এইরকম একটা সময়ে আমার দেখা হয় স্বর্গীয় ভরদ্বাজের সঙ্গে। লাহোরে তার আসার কথা গোপন রাখা হয়েছিল। মাত্র কয়েকজনেই তাঁর আসার কথা জানত।
ভরদ্বাজের লাহোরে আসার কিছুদিন আগে থেকে সমাজবাদী রাজনীতি বোঝার বা বোঝাবার জন্য লালা লাজপত রায় ভবনে ঘন ঘন সভা হত। সেই সময় সারা পাঞ্জাব থেকে সমাজবাদী যুব সদস্যদের যোগ নিতে বলা হয়েছিল। বাস্তবে এই সভাগুলোতে একটাই আলোচনা হত যে “অমুক ব্যক্তির সঙ্গে পুলিশের যোগ আছে কি নেই?” কিন্তু সভার বাইরে কংগ্রেসী সদস্যদের বা সরকারের এই ধারণাই ছিল যে পাঞ্জাবের যুব সম্প্রদায় বিপ্লবের জন্য তৈরী হচ্ছে। সেই জন্য খবরের কাগজে এই সব সভার খবর বেরোতে লাগল। আর সরকারের পুলিশ অজস্র সেপাই নিয়ে লাজপত রায় ভবন থেকে ব্রাডলে হল, গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে মিউনিসিপ্যাল বাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছিল। আমার মনে আছে যে আমরা অনেক দিন নাওয়া খাওয়া ভুলে কেবল পরস্পরের বিরুদ্ধে দোষারোপ করে পেট ভরাতাম। আর দোষারোপে দোষারোপে ক্লান্ত হয়ে যখন বাইরে বেরোতাম তখন প্রেসের লোক আমাদের ঘিরে ধরত আর জিজ্ঞাসা করত—“কিছু ঠিক হল?” আমরা খুবই গম্ভীর স্বরে উত্তর দিতাম—“হয়ে যাবে। দেখুন না কি হয়”? এই খবর পুলিশের কাছে যখন পৌঁছত তখন হয়ে যেত—“বিপ্লব হয়ে যাবে, দেখে যান।” আর সেই খবর শুনে ইনস্পেক্টরের হাত কাঁপতে কাঁপতে কোমরে ঝোলান পিস্তলের ওপর ঘোরা ফেরা করত।
এইসব সভাগুলো কখনও কখনও পাঁচ-ছয় দিন ধরে চলত। এর মধ্যে কতকগুলো বড় সভা হত। আর কিছু ছোট ছোট সভা হত যেখানে কোন একটা বিশেষ দল, তাদের সদস্যরা পরের বড়সভায় নিজেদের অবস্থান কিভাবে তুলে ধরবে তার আলোচনা চালাত। ছয় কিংবা সাতদিন পরে লাজপত রায় ভবনের লাইব্রেরীর ওপরের একটা ঘরে এই রকমই একটা দলের সভা ছিল। সেই সভাতে ভরদ্বাজ হাজির
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments