তিনি বাংলা ও বাঙালির বিবেক
আমাদের কালের অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ বাঙালি আনিসুজ্জামান। জীবনাচরণে মার্জিত রুচির এমন বাঙালি সহজে চোখে পড়ে না। বাংলাদেশের যে-কোনো সংকটে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা পথিকৃতের। তাঁর অ্যাকাডেমিক প্রত্যয় ও অর্জন ছাড়িয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন বাঙালি সমাজের পুরোধা। তাঁকে ভারত সরকার ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি দিয়ে যে সম্মান প্রদর্শন করেছে তাতে আমরা গর্বি। তাঁর বহুমুখী কর্ম এ দেশের সমাজ ও সংস্কৃতিকে যে শক্তি জুগিয়েছে তা হয়ে উঠেছে অনুকরণী। অসাম্প্রদায়িক চেতনা সঞ্চার, গণতন্ত্র ও একটি শোষণমুক্ত সমাজ নির্মাণের জন্য তাঁর অবিচলিত ও দৃঢ় প্রত্যয় বাঙালিকে সতত প্রাণিত করছে।
পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে তাঁকে চিনি। প্রথমে ছিলাম তাঁর ছাত্র। দেখেছি তখন কত ছাত্রকে দীক্ষিত করেছেন সাহিত্যের রস গ্রহণে, রুচি নির্মাণে। কখনো দেশ-আত্মার মর্মপোলব্ধির জন্য আহ্বানও করেছেন। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজেদের জীবন ও মননকে কোনো কোনো শিক্ষার্থী করে তুলেছেন শানিত। ভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু হয়েছিল স্বাদেশিকতায় প্রত্যয়দীপ্ত দীক্ষা। এই কর্ম নানাভাবে, নানা দিকে প্রসারিত হয়েছে। আমরা যাঁরা দীক্ষা গ্রহণ করেছিলাম তাঁর কাছে কত কিছু যে পেয়েছি তা বিস্তারিত বলার নয়।
রবীন্দ্রনাথকে প্রতিষ্ঠায়, কখনো বাঙালির স্বরূপ চেতনার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকায়ও ছিলেন আনিসুজ্জামান। বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি কোনোদিনও সংকটমুক্ত থাকেনি। কতভাবে যে বিপর্যস্ত হয়েছে। এই বিপর্যয়কালে তাঁকে দেখি প্রতিবাদী ভূমিকায়।
শিক্ষাবিদ ও গবেষক আনিসুজ্জামান বাংলাদেশের যে-কোনো সংকটকালে বিশিষ্ট ভূমিকা রাখার জন্য হয়ে উঠেছেন দেশের বিবেক। দেশের সংকটকালে তাঁর ভূমিকা প্রাণিত করে বহুজনকে; বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছেল তা প্রবাহিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধেও তিনি হয়ে ওঠেন প্রাণসঞ্চারী এক সংগঠক। কতভাবেই না মুক্তিযুদ্ধে তিনি সহায়তা করেছেন। শরণার্থীদের ত্রাণে, কখনো ভারতে আশ্রিত বাংলাদেশের শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের সহায়তায়, কখনো মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা বিভাগে, কখনো সংবিধানের বাংলা অনুবাদে।
তাঁর কর্ম, বাঙালিত্বের সাধনা এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণের প্রয়াসে এক যোদ্ধার ভূমিকা এই মানুষটিকে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছে। তাঁর কীর্তি বাংলাদেশের মানুষকে এক গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করছে। তাঁর স্থির প্রত্যয় ও গন্তব্য থেকে কেউ তাঁকে টলাতে পারেনি। শত বাধা ও বিঘ্নেও তিনি তাঁর কর্মে অবিচল।
১৭৫৭-১৯১৮ এই কালসীমায় বাঙালি মুসলমান সমাজের (সাহিত্য, ধর্ম, রাজনীতি ও অর্থনীতি) সাহিত্যকর্মের অবস্থান ও বাংলা গদ্যের বিকাশ নিয়ে তাঁর অসাধারণ গবেষণা তাঁকে পথিকৃৎ চিন্তকের মর্যাদা দিয়েছে। সব মিলিয়ে তিনি আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক মানবিক ও বহুত্ববাদী সমাজ নির্মাণে পুরোধা ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। তাঁর মনীষা ও মনস্বিতার ব্যাপ্তি এখন তাঁকে প্রায় একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। তিনি এখন বাংলা ও বাঙালির বিবেক।

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice