রাসসুন্দরী—আমার জীবন
রাসসুন্দরীর ‘আমার-জীবন’ বাংলা সাহিত্যের এক বিশেষ মূল্যবান গ্রন্থ। আত্মজীবনী রচনার কোন আদর্শই তখন বাংলাসাহিত্যে ছিল না। নিজের জীবনকে কেন্দ্র করে যে সাহিত্যসৃষ্টি করা চলে ঐ ধারণা তখনও সাহিত্যিক মহলে স্বীকৃত হয়নি। বাংলা গদ্য তখন সবে মাত্র বঙ্কিম দেবেন্দ্র যুগ পার হয়েছে। এ হেন অবস্থায় পঁচাশী বছরের এক বৃদ্ধার হাত থেকে ‘আমার জীবন’ সৃষ্টি অল্প বিস্ময়ের ব্যাপার নয়। দেবেন্দ্রনাথের ‘আত্মজীবনী’ তখনও প্রকাশিত হয়নি। দেশবাসীর কাছে আত্মজীবনী রচনা ও পাঠের কোন মানদণ্ড স্থির হয়নি। তবু রাসসুন্দরী তাঁর যে জীবনকথা লিখে গিয়েছেন তা তাঁর অসম সাহস ও আত্মবিশ্বাসের পরিচায়ক।
রাসসুন্দরী কিছু মহামানবী নন; তাঁর জীবনে এমন কিছু ঘটেনি যাতে পাঠকসাধারণের বিশেষ ঔৎসুক্য প্রকাশের কারণ থাকতে পাবে। তিনি সম্পত্তিশালী গৃহস্থের ঘরের বৌ, পববর্তী জীবনে কর্ত্রী। লেখাপড়া শেখা তখনকার দিনে মেয়েদের পক্ষে সহজ ছিল না। কতকষ্টে লোকচক্ষু এড়িয়ে তিনি যে একটু একটু করে পড়তে শিখেছিলেন তার বিবরণ তাঁর লেখাতেই আছে। তবু শুধু প্রাণের একান্ত বাসনায় সেই অল্পশিক্ষিত গ্রাম্য বধু একদিন লিখতে পড়তে শিখলেন—এবং এমন সহজ সরলভাবে তাঁর জীবনকথা ব্যাখ্যা করে গেছেন যাতে বিশেষ চিত্তাকর্ষক ঘটনা কিছু না থাকলেও পাঠকের মন মুগ্ধ হয়।
‘আমার জীবন’ দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে তাঁর জীবনের কিছু কিছু ঘটনা সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে, দ্বিতীয় ভাগ ভগবৎ-বন্দনাতেই পরিপূর্ণ। এই দুইভাগে ষাট বছর বয়স পর্যন্ত তিনি লিখেছেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল পরবর্তী দিনগুলিকে নিয়ে একটি তৃতীয় ভাগ করার। গ্রন্থের শেষ পরিচ্ছেদে লিখেছেন—“আমার জীবন-চরিত দ্বিতীয় ভাগ এই পর্যন্তই ক্ষান্ত থাকিল। আমার জীবনান্ত হইলে আমার বংশের মধ্যে যিনি ইচ্ছা করেন তিনি আমার শেষভাগ লিখিবেন।” জীবনে কোন কিছুর অভাব ছিল না তাঁর। ধনজন, পুত্রকন্যা, আত্মীয়স্বজনে ঘর পূর্ণ ছিল—যা পেয়েছিলেন তা অল্প নয়। কিন্তু আরও বেশী চাওয়ার লোভ ছিল না বলেই সারাজীবন তিনি আনন্দের সঙ্গে কাটিয়েছেন। কখনও কারও সঙ্গে বিবাদ বিসম্বাদ করতে হয়নি তাঁকে, যা কিছু সংসারে দেখেছেন তাই তাঁর ভালো লেগেছে। সংসারে সব জিনিষকে ভালো লাগার একটা বিশেষ ক্ষমতা না থাকলে অত তৃপ্তির সঙ্গে, অত শান্তির সঙ্গে নিজের জীবনের কথা বলা যায় না। লেখাপড়া অল্প জানতেন, তাই গ্রন্থ শেষে সবিনয়ে বলেছেন—“এই বইখানি আমার নিজ হস্তের লেখা। আমি লেখাপড়া কিছুই জানি না। পাঠক মহাশয়েরা তোমরা যেন অবহেলা না কর, দেখিয়া ঘৃণা করিও না। অধিক লেখা বাহুল্য। তোমরা সব জান, যাহাতে পরিশ্রম সফল হয় করিবে।”
শ্রদ্ধেয় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছেন। তাঁর দু একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করলেই সপ্রমাণ হবে তখনকার রসিক সমাজে এই গ্রন্থ কেমন সমাদর পেয়েছে। তিনি লিখেছেন, “মনে করিয়াছিলাম যেখানে কোন ভাল কথা পাইব সেইখানে পেন্সিলের দাগ দিব। পড়িতে পড়িতে দেখি, পেনসিলের দাগে গ্রন্থকলেবর ভরিয়া গেল। বস্তুতঃ ইঁহার জীবনের ঘটনাবলী এমন বিস্ময়জনক এবং ইঁহার লেখায় এমন একটি অকৃত্রিম সরল মাধুর্য আছে যে গ্রন্থখানি পড়িতে বসিয়া না শেষ করিয়া থাকা যায় না।” রাসসুন্দরী স্বভাবতঃই ছিলেন ধর্মশীলা। কিন্তু সে ধর্ম বাইরের আড়ম্বর-সর্বস্ব নয়, সে-ধর্ম একান্তভাবে তাঁর জীবনের সুখদুঃখ ভালমন্দের সঙ্গে জড়িত। এই কথাটি তাঁর গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে ফুটে ওঠে। সেই মূল বক্তব্যটি সম্বন্ধে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বলেছেন, “ইঁহার ধর্ম বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠান আড়ম্বরে পর্যবসিত নহে, ইঁহার ধর্ম জীবন্ত আধ্যাত্মিক ধর্ম। জীবনের প্রত্যেক ঘটনায় ইনি ঈশ্বরের হস্ত দেখিতে পান, তাঁহার করুণা উপলব্ধি করেন, তাঁহার উপর একান্ত নির্ভর করিয়া থাকেন; এক কথায় তিনি ঈশ্বরেতেই তন্ময়। এরূপ উন্নত ধর্মজীবন সচরাচর দেখা যায় না।” শেষ পর্যন্ত এর ধর্মমূল্যকেই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বড় করে দেখেছেন আর বলেছেন এমন উপাদেয় গ্রন্থ ঘরে ঘরে থাকা উচিত।
রাসসুন্দরী অল্পস্বল্প কবিতা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments