দেবতা আর সৃষ্টিতত্ত্ব
সুদূর মহাকাশে আছেন,
দেবতা ভয়ঙ্কর
মানুষের সামাজিক সত্তা বা অস্তিত্ব নির্ধারিত করে তার চেতনাকে। আর এই চেতনায় ধরা পড়ে সামাজিক অস্তিত্বের রূপ, সেটা হচ্ছে—বাস্তব জগত। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি খুব উন্নত, সেজন্য তার মনের আয়নায় প্রতিফলিত বাস্তব-বিশ্বের ছবি সে রঙীন করে আঁকতে পারে। সে তার চিন্তাকে নানা অলঙ্কারে সাজায়, রূপ দেয় সুন্দর কাহিনিতে। কিন্তু এসবের ভেতরে রয়ে যায় সেই মূল জিনিসটি, যে উৎস থেকে সব কল্পকাহিনির উদ্ভব... বাস্তব পৃথিবী। কাহিনি যত জটিল আর বর্ণাঢ্যই হোক না কেনো, তার একেবারে ভেতরের মূল ব্যাপারটা কিন্তু ঠিকই থেকে যায়, হয়ত নীচে তলিয়ে থাকে। এই কল্পকাহিনি আর রূপক মানুষের সমৃদ্ধ মনীষার ফসল সমাজে মানুষের তৈরী অন্যান্য জিনিসগুলোর মতন।
এভাবে মানুষই তার দেবতাকে সৃষ্টি করেছে, সভ্যতার এক বিশেষ পর্যায়ে। দেবতার অস্তিত্ব থাকে শুধু মানুষের মনে,—কল্পনায়, তার বাইরে দেবমন্দিরে। এই দেবকুলের সৃষ্টি সভ্যতার অন্যান্য সব অনুপম বিষয়গুলোর মতোই অপূর্ব। সভ্যতার সেই শুরুতে মানুষ যখন প্রথম সমাজবদ্ধ হয়েছে, তখন তার নিজের প্রয়োজনেই দেবতাকুল সে সৃষ্টি করেছিল। সৃষ্টির পর থেকে এই অলীক মায়ামূর্তির দল মানুষের গড়া সভ্যতার চার হাজার বছর ধরে মানুষের অন্যতম সঙ্গী হয়েছিলেন,—আজও আছেন, একটু উন্নত আর সংস্কৃত রূপ নিয়ে। এভাবে মানুষ তারই মনঃসৃষ্টির মাধ্যমে নিজে শাসিত হয়ে চলেছে শত শতাব্দী ধরে।
আদিম অতীতে মানুষ প্রথম যখন তার সহচর পশু জগত থেকে স্বতন্ত্র হলো তখন সে তার চারপাশের প্রকৃতিকে প্রথমবারের মতো মানুষের চোখ আর বুদ্ধি দিয়ে দেখবার সুযোগ পেল। মানুষের তখন বন্যদশার নিম্নতম স্তর। তার বুদ্ধি অত্যন্ত স্থূল। প্রকৃতির লীলাখেলা বোঝার মতো জ্ঞান তার হয়নি। প্রাকৃতিক শক্তিগুলো মানুষের মঙ্গল আর অমঙ্গল দুটোই করতে পারে। কলনাদিনী নদী দিনরাত বয়ে চলেছে শান্ত, হঠাৎ একদিন বন্যা এলো, সে তার দুকূল ভাসিয়ে ধ্বংসরূপ নিয়ে অনাসৃষ্টি বাধাল। ছোট আগুনের শিখা মানুষকে তাপ দেয়, হিংস্র বন্য জন্তুকে দূরে সরিয়ে রাখে, সে মানুষের কতবড় সুকৃতিকারী। কিন্তু এই আগুনই যখন বিরাট বনে দাবানলের সৃষ্টি করে তখন তার প্রচণ্ড সংহাররূপের সামনে সব কিছু নিশ্চিহ্ন হয়। শান্ত সঞ্জীবনী বাতাস হঠাৎ ঝড় হয়ে প্রলয়কাণ্ড ঘটায়। একটা পাহাড় হঠাৎ অগ্নুৎপাত করে ভয়াবহ কাণ্ড করে। এভাবে আদিম মানুষ প্রতিটি প্রাকৃতিক শক্তির গুণাগুণের সঙ্গে পরিচিত হলো। বিপুল শক্তিধর প্রকৃতির বিভিন্ন রূপকে সে ভয় করতে শিখল। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির প্রথম সম্পর্ক হলো এ রকম। আর মানুষের দেবতা সৃষ্টির প্রথম পর্ব।
এই জড় শক্তিকে ভয় করে মানুষের বহুদিন কাটলো। প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে তার জীবন-ধারণ করতে হয়। এই নির্মম সংগ্রামের মাধ্যমেই তার বুুদ্ধিবৃত্তি ক্রমশ ধারালো হয়ে উঠল, বৃদ্ধি পেল উদ্ভাবনী শক্তি। এই অবস্থায় মানুষ বুঝতে পারে চৈতন্য বলে একটা কিছু আছে। মানুষের নিজের যে চৈতন্য আছে এ তো খুব স্পষ্ট, কারণ মানুষ তার ইচ্ছানুযারী ক্রিয়াবান হতে পারে। সে যখন মনে করে আমি এই কাজটা করব তখন সে সচেতন ইচ্ছানুসারেই সেটা করতে পারে। তার কাজটা করার পেছনে একটা সচেতন ইচ্ছা থাকে। এই সচেতন ইচ্ছা তার চৈতন্যের একটা গুণ। এই চৈতন্য মানুষের সত্তা থেকে আলাদা কিছু নয়, মস্তিষ্ক নামক একটা জৈব বস্তুর কাজবিশেষ। এই জৈব বস্তুটি চিন্তা করতে পারে। তবে তার চিন্তার খোরাক জোগায় বাইরের পৃথিবী। তাহলে বন্যা নিয়ে আসা নদী, দাবানল সৃষ্টিকারী আগুন, ঝড়ের বাতাস, অগ্নিগিরি সবারই চৈতন্য আছে। এই শক্তিগুলো যে কাজ করে সে তো দেখাই যাচ্ছে। কিন্তু সচেতন ইচ্ছা ছাড়া তো কেউ কাজ করতে পারে না, এ তো মানুষ তার নিজের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারে। তাই ক্রিয়াবান প্রাকৃতিক শক্তিগুলো নিশ্চয় সচেতন ইচ্ছাযুক্ত। আর যার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments