রেবতীমোহন বর্মণ

রেবতীমোহন বর্মণআর আমাদের ভিতরে নেই। ৬ মে (১৯৫২) তারিখে তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা শহরে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন। সুদীর্ঘ বারো বৎসর কাল দুরারোগ্য কুষ্ঠ-ব্যাধির সহিত সংগ্রাম করে শেষ পর্যন্ত এই ব্যাধির হাতেই তিনি নিজের জীবনকে সঁপে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

তাঁর মৃত্যুতে আমরা যে শুধু একজন বিশিষ্ট বিপ্লবীকে হারালাম তা নয়, মার্কসবাদের একজন একনিষ্ঠ ছাত্রও আজ চিরদিনের মতো আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে তাঁর আরো অনেক অবদান দেওয়ার ছিল, কিন্তু দুষ্ট ব্যাধি তা থেকে আমাদের বঞ্চিত করে দিল।

তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কৃতী ছাত্র ছিলেন। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় একজন সুলেখকও ছিলেন তিনি। কিন্তু এই পরিচয় তাঁর একমাত্র পরিচয় নয়। তাঁর রাজনীতি ও বৈপ্লবিক জীবন থেকেই তাঁর আসল পরিচয় আমাদের পেতে হবে। এই জীবনের তাগিদেই তিনি লেখক হয়েছিলেন।

স্কুলে পড়ার সময়ে তিনি পড়া ছেড়ে দিয়ে অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করেন। এই আন্দোলনের জোর কমে যাওয়ার পরে তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেন এবং উত্তীর্ণ ছাত্রদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এই সময়ে তিনি ঢাকার শ্রীসংঘেও যোগদান করেন। গোড়ার এই সংঘটিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তদের একটি যুব সংগঠন ছিল। পরে সংঘের সভ্যরা বৈপ্লবিক কার্যক্রম (সরকারী দপ্তরের ভাষায় সন্ত্রাসবাদী কর্মপদ্ধতি) গ্রহণ করেছিলেন। রেবতী বর্মণ পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহ জেলার অধিবাসী হলেও শ্রীসংঘের সভ্য হিসাবে তাঁর কর্মস্থল ছিল কলিকাতা, বাঁকুড়া ও বীরভূম জেলা। এইরূপ বৈপ্লবিক কর্মব্যস্ততার ভিতর দিয়েও তিনি কৃতিত্বের সহিত কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ. পরীক্ষা পাশ করেছিলেন। তিনি ‘রেণু’ নামে একখানা মাসিক পত্রিকা বার করে তার সম্পাদনার ভার নিয়েছিলেন। পরে এই কাগজখানার পরিচালনার ভার নিয়েছিলেন শ্রী ভুপেন্দ্রকিশোর রক্ষিত রায়। যতটা মনে হয় এই সময় থেকেই কমরেড রেবতী বর্মণ রুশদেশের কর্মধারার প্রতি ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হচ্ছিলেন। এই সময়েই (১৯২৯ সালে) প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘তরুণ রুশ’ নামক বইখানা।

বর্তমান শতাব্দীর তিন দশকে বাংলার হাজার হাজার রাজনীতিক কর্মীদের মতো কমরেড রেবতী বর্মণও বিনাবিচারে বন্দী হন। এই অবস্থায় তাঁকে বিভিন্ন বন্দী-শিবিরে বাস করতে হয়েছিল এবং তিনি শেষ বাস করেছিলেন রাজপুতনার দেউলী বন্দী-শিবিরে। সম্ভবত এখানেই তাঁর শরীরে কুষ্ঠরোগের জীবাণু প্রবেশ করে।

বন্দী-শিবিরে থাকার সময়ে কমরেড বর্মণ গভীর মনোযোগের সহিত মার্কসবাদের মূল সাহিত্যগুলো পড়া শুরু করে দেন। এই অধ্যয়নের ভিতর দিয়েই তিনি কমিউনিস্ট মতবাদ গ্রহণ করেন এবং এও স্থির করে ফেলেন যে মুক্তি পাওয়ার পরে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিবেন।

একটি কথা এখানে বলে রাখা ভালো কমরেড রেবতী বর্মণ যে মামুলী ধরনে মার্কসবাদের পড়াশুনা করেননি তার পরিচয়ে পাওয়া যায় তাঁর ‘ক্যাপিটাল’ বইখানা থেকে। ‘ক্যাপিটাল’এর প্রতিপাদ্য বিষয়ের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মতো ভারতের যে-কোনো ঘটনা পেলেই তিনি তা বই-এর মার্জিনে নোট করে রাখতেন। মার্জিনে জায়গা না থাকলে ছোট ছোট কাগজের টুক্রাতে ছোট ছোট হরফে লিখে সে-সব ‘ক্যাপিটাল’-এর বিভিন্ন পৃষ্ঠার সঙ্গে এঁটে রাখতেন। এই বইখানা আজ আমাদের নিকটে থাকলে তা থেকে সকলে বুঝতে পারতেন যে কত অধ্যাবসায়ী ছাত্র কমরেড রেবতী বর্মণ ছিলেন। আমাদের বড় দুর্ভাগ্য যে তাঁর এই বইখানা আজ আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর লেখা পুস্তক-পুস্তিকাগুলো ছাড়া তাঁর কোনো স্মৃতিচিহ্নই আমাদের নিকটে নেই, তাঁর একখানা ফটো পর্যন্ত নয়।

বন্দী-শিবিরে বসে বসে বাইরের কাজের জন্যে তিনি নিজেকে আরো নানাভাবে তৈরি করেছিলেন। বাংলার ভূমি-সমস্যা বোঝার জন্যে সেটলমেন্টের রিপোর্টগুলো সবই তিনি পড়েছিলেন। বাংলাদেশের যত জায়গায় ছোট-বড় যত ইতিহাস আছে সে-সবও তিনি পড়েছিলেন।

১৯৩৮ সালের আগে কমরেড রেবতী বর্মণের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না। ১৯৩৮ সালে তিনি বন্দীদশা থেকে মুক্তি পান। তার পরেই তাঁর

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice