মূল্য ও মজুরী

পুঁজিতন্ত্রে শ্রমিক পুঁজিপতির নিকট তাহার শ্রমশক্তি বিক্রয় করে। পুঁজিপতি শ্রমিক ভাড়া করে এবং উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদনের জন্য তাহাকে কারখানায় খাটায়। শ্রমিক তাহার খাটুনির পরিবর্তে পুঁজিপতির নিকট হইতে মজুরী পায়। ইহাই শ্রমশক্তির ক্রয়-বিক্রয়।

শ্রমশক্তি একটী বিশেষ প্রকারের পণ্য। এই পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় সমাজের দুইটী মূল শ্রেণীর—বুর্জোয়া ও শ্রমিকের—সম্বন্ধ প্রকাশ করে। আমরা পূর্ব্বেই দেখিয়াছি, শ্রমিকের ভরণ-পোষণের দ্রব্যাদির মূল্যদ্বারাই শ্রমশক্তির মূল্য স্থির হয়। পুঁজিপতি সর্ব্বদাই এই মূল্য অপেক্ষা কম মজুরী দিতে চায়। শ্রমিক কি প্রকারে জীবন যাপন করে, পুঁজিপতির সে দিকে লক্ষ্য রাখার প্রয়োজন নাই।

জীবনধারণের দ্রব্যাদির মূল্যদ্বারা শ্রমিকের শ্রমশক্তির মূল্য স্থির হয়। কিন্তু শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান অনেক রকম অবস্থার উপর নির্ভর করে। জীবনযাত্রার মান শুধু শরীরের চাহিদা পূরণই নয়, সঙ্গে সঙ্গে মানসিক চাহিদা পূরণ হইতেছে কিনা তাহাও দেখা প্রয়োজন। ইহার একটা সামাজিক ও নৈতিক দিক আছে। জীবনযাত্রার মান চিরকাল একই রকম থাকে না। ইতিহাসের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ইহারও পরিবর্ত্তন হয়। একশ’ বছর আগেকার শ্রমিকের এবং এখনকার শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান একই প্রকার নয়। গ্রীষ্ম প্রধান দেশে শ্রমিকেরা একরকম জীবন যাপন করে, শীত প্রধান দেশে অন্য রকমে জীবন যাপন করে। সুসভ্য দেশে শ্রমিকের শরীরের ও মনের চাহিদা একরকম, অনুন্নত দেশে অন্য রকম কিন্তু পুঁজিতন্ত্র সর্ব্বদাই এই জীবন-যাত্রার মান খাটো করিয়া রাখিতে চেষ্টা করে। মজুরী প্রায় সকল সময়ই শ্রমশক্তির মূল্য অপেক্ষা কমই থাকে।

আমরা পূর্ব্বেই দেখিয়াছি, মজুর যে-সময়টা কারখানায় কাজ করে তাহার দুইটী ভাগ। একটী আবশ্যক শ্রমসময় এ সময়টার জন্য শ্রমিককে মজুরী দেওয়া হয়; অপরটী উদ্বৃত্ত শ্রমসময়-এ সময়ের খাটুনির জন্য শ্রমিককে কিছুই দেওয়া হয় না। কিন্তু পুঁজিতন্ত্রে এইরূপই প্রতীয়মান হয় যেন শ্রমিক তাহার পুরা খাটুনিরই মজুরী পাইতেছে। ‘একদিনের জন্য মজুরী’—এইরূপ উক্তিতে আসল সত্যটী ঢাকা পড়িয়া যায়। ধরা যাউক্, একজন খনির মজুর প্রতি টন কয়লা উঠানোর জন্য ১ পাউণ্ড মজুরী পায়। এই ১ পাউণ্ডে তাহার জীবিকা নির্ব্বাহ হয় না। সে হয়ত মনিবের নিকট মজুরী বাড়ানোর জন্য আবেদন করিল। মনিব উত্তর করিল—আরো বেশী কয়লা তোল, আরো বেশী মজুরী পাইবে। ইহাতে মনে হইতে পারে মনিব শ্রমিকের খাটুনি অনুসারেই তাহার প্রাপ্য চুকাইয়া দিতেছে। বস্তুত, শ্রমিক ত আর জানেনা, মনিবের জন্য সে প্রতিদিন কতটুকু মূল্য উৎপাদন করিতেছে। শ্রমদিবসটীকে প্রকাশ্যে দুই ভাগ করা হয় না যে শ্রমিক বুঝিতে পারিবে এই অংশটীতে সে নিজের জন্য কাজ করে, অপর অংশটীতে মনিবের জন্য কাজ করে।

মধ্যযুগের কর্ভি-ব্যবস্থায় কৃষক সপ্তাহের কয়েকটা দিন নিজের জমিতে এবং বাকী দিনগুলি মনিবের জমিতে কাজ করিত। এখানে আবশ্যক শ্রমসময় এবং উদ্বৃত্ত শ্রমসময়ের বিভাগ সুস্পষ্ট। অতীত যুগের দাসপ্রথায়, মনে হয়, দাস বুঝি সবটা সময়ই মনিবের জন্য খাটিতেছে; খাটুনির পুরা সময়টার মধ্যে একটা অংশ যে আবশ্যক শ্রমসময় তাহা একেবারেই ঢাকা পড়িয়া যায়। কিন্তু পুঁজিতন্ত্রে অন্যরকম। ‘এক দিনের জন্য মজুরী’ বলাতে মনে হয় যেন শ্রমিক বুঝি শ্রমদিবসের সারাটা ক্ষণ নিজের জন্যই খাটে; সবটাই বুঝি আবশ্যক শ্রমসময়; একটা অংশ যে উদ্বৃত্ত শ্রমসময় তাহা ঢাকাই থাকিয়া যায়।

আমরা পূর্ব্বেই দেখিয়াছি মজুরী প্রায় সব সময় শ্রমশক্তির মূল্যের নীচেই থাকে; এদিকে আবার শ্রমশক্তির মূল্যও অনেক কারণেই পরিবর্ত্তিত হয়। বুর্জোয়া এবং শ্রমিকের মধ্যে মজুরী লইয়া সংঘর্ষ লাগিয়াই আছে। যে-পক্ষ ঐক্যবদ্ধ নয় এই সংঘর্ষে তাহাদের হার হয়। যতদিন শ্রমিকেরা শ্রমিক সঙ্ঘ অথবা ট্রেড ইউনিয়নে সঙ্ঘবদ্ধ হয় নাই, ততদিন পুঁজিপতিরই ছিল সুবিধা। এখন শ্রমিকেরা তাহাদের দাবী-দাওয়া ট্রেড ইউনিয়নের মারফত পেশ করে। পুঁজিপতি একক শ্রমিকের সঙ্গে যে-ভাবে ব্যবহার করিত ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে সে-ভাবে ব্যবহার করিয়া পারে না। ট্রেড ইউনিয়ন সত্ত্বেও পুঁজিপতি শ্রমিককে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice