বাঙালি মনীষা: অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
লেখক: মফিদুল হক
বাংলাদেশে বিদ্বজ্জনের একেবারে আকাল পড়ে নি, জ্ঞান-সাধনায় নিমগ্ন মানুষও দুর্লক্ষ্য নয়, কিন্তু বাঙালি মনীষা আমি বিশেষ দেখতে পাই না। বাঙালির মনস্বিতার একটি আলাদা মাত্রা রয়েছে, এর গড়নটি আমরা পরিপূর্ণভাবে বুঝি পাই পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মধ্যে, উনিশ শতকের বঙ্গীয় সমাজে। তিনি জ্ঞানের সাধক বটে, তবে বিশুদ্ধ জ্ঞান বলতে যেমন পরীক্ষাগারের শীতলতা বোঝায় তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রক্তমাংসের সজীব এই সাধনা, যে-সাধনার পরতে পরতে মিশে থাকে মানবিকতা। জ্ঞানোপলব্ধি সাধককে সমকালীন সমাজ থেকে অনেক অগ্রসর করে দিলেও সেই অগ্রমান্যতা তিনি মানতে রাজি নন, বরং পরম নিষ্ঠা ও একাগ্রতা নিয়ে ব্রতী থাকেন সকলকে সেই অগ্রবর্তিতার সাথী করে নিতে। এমন প্রবলভাবে সামাজিক মনস্বিতাকেই আমি বলব বাঙালি মনীষা, আর সময়কালে তার সার্থক প্রকাশ দেখি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মধ্যে; যাঁকে দেখে-জেনে-চিনে মনে হবে না তিনি গভীর প্রজ্ঞা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ দ্বারা নিয়ত গ্রহণ করছেন সাহিত্য ও সমাজের পাঠ এবং ভাবনার দার্শনিকতার শক্তিতে সবকিছু বিশ্লেষণ করে চলছেন সৃজনশীল এক জ্ঞানতত্ত্ব দ্বারা। তাঁর ভাবুক সাহিত্য-সমালোচনা এবং গবেষণামূলক প্রবন্ধ মনন সমৃদ্ধির উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি সার্থক অধ্যাপক, প্রবলভাবে সামাজিক মানুষ, চারপাশের অগণিতজনকে বিপুল ভালবাসা নিয়ে আকড়ে ধরেন এবং দেশ-সমাজ ও রাজনীতির সমস্ত সঙ্কট মুহূর্তে প্রবলভাবে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। ব্যষ্টি ও সমষ্টির কল্যাণে নিজেকে এমনভাবে উৎসর্গিত করা ঋদ্ধ পুরুষ আমাদের সমকালে আর নেই এবং সেখানেই অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের বিশিষ্টতা।
তাঁর গুণের বর্ণনা দিতে গেলে সে হয়ে যাবে দীর্ঘ ফিরিস্তি এবং তারপরও বাদ থাকবে অনেক কথা। সেই প্রয়াস নেওয়ার আরেক সমস্যা হল তাঁর বহুধা বিস্তৃত ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন ও বিচিত্র দিকগুলোর পুরো হদিশ করা একক কারো পক্ষে খুব মুশকিল। তিনি বহুবিচিত্রভাবে ছড়িয়ে দিয়েছেন নিজেকে, ফলে যত মানুষকে যতভাবে তিনি স্পর্শ করেন তার পরিচয় পেতে হলেও একজনকে হন্যে হয়ে ফিরতে হবে দশ দিক। এমনি ব্যক্তিত্বের বিচারে তাই সত্তার বহুমুখিতার চাইতে নির্যাসটুকু অনুধাবনের চেষ্টা নেওয়াটাই অনেক যুক্তিযুক্ত। সেই বিচারে আনিসুজ্জামানের মননশীলতা ও মানবিকতা উভয়ের উত্তুঙ্গ শৃঙ্গ আমাদের সবসময়ে অভিভূত করে।
সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি এই তিনের সম্মিলন ঘটিয়ে রচিত হয়েছে আনিসুজ্জামানের চিন্তাশীল ও গবেষণামূলক প্রবন্ধসমূহ। যখন তিনি পুরনো বাংলা গদ্যের বিন্যাস কিংবা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নথিপত্র ঘেঁটে গদ্যরীতির বৈশিষ্ট্য খুঁজে নিতে চেষ্টা করেন তখন বৃহত্তম সামাজিক বৃত্তটি তাঁর দৃষ্টিসীমায় থাকে উজ্জ্বল। ফলে তাঁর দেখায় থাকে এক বিপুল মাত্র, যা অর্জিত হয় পঠন-পাঠনের ব্যাপ্তি ও উপলব্ধির গভীরতা থেকে।
আবার চর্যাপদ কি মধ্যযুগের সাহিত্য কি বাঙালি মুসলিম সাহিত্যিকদের গদ্যরচনা যখন তিনি বিশ্লেষণ করেন, তখন বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করতে হয় টেক্সটের পরস্পরা ও অর্থবহতাকে তিনি কত সহজে পর্যায় ও তাৎপর্য চিহ্নিত করে সাজিয়ে দিতে পারেন, অনায়াসে শনাক্ত করতে পারেন বিভিন্ন বিশিষ্টতা। সাহিত্য-বিচারের এই গভীরতা ও দক্ষতা এমন সহজ ভঙ্গিতে পরিবেশিত হয় যে পন্ডিতম্মন্যতার কোনো ছাপ সেখানে থাকে না।
চিন্তার বিশালতা ও সারল্য, যেটা তাঁর রচনায় প্রতিফলিত, সেটা আসলে তাঁর জীবনচর্যারই বৈশিষ্ট্য। তিনি সর্বদা এক আটপৌরে সহজিয়া মানুষ, তাঁর গভীর প্রজা এবং সাহিত্য ও সমাজবিচারের বিপুল পারঙ্গমতার কোনো ছাপই তাঁর আচরণে মিলবে না।
তাঁকে আমি প্রথম কাছ থেকে দেখি ১৯৬৭-'৭৮ সালে, তখন আমরা সবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তখনও চট্টগ্রামে যান নি। আমাদের বিভাগ আলাদা, কিন্তু রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে অগ্রজদের সুবাদে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ মিলেছিল। সেই সময়, আমি কখনো ভুলি নি, কী এক কাজে তাঁর কাছে গিয়েছিলাম বাংলা বিভাগে। তিনি কলাভবনের বারান্দায় এসে আমার সঙ্গে কথা বললেন কাঁধে হাত রেখে, যেন আমি তাঁরই সমকক্ষ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments