কিতাব
লেখক: নুরমুরাদ সারিখানভ
তুর্কমেন বিজ্ঞান আকাদমির সাহিত্য ইনস্টিটিউটের নির্দেশক্রমে আমার কাজ পুরনো পুঁথি জোগাড় করা। ভাগ্যচক্রে সেবার গিয়ে পড়েছিলাম কারা-কুমের একেবারে গভীরে, পশুপালক একটা আউলে, চারিদিকে বালির মধ্যে অনতিবৃহৎ একটা খাদের মতো জায়গাটা।
যা হয়, আউলের লোকেরা উৎসুক হয়ে উঠল: কোথা থেকে এসেছি, কেন এসেছি? আগমনের কারণ জানালাম। উঠেছিলাম কলখোজ সভাপতির বাড়িতে। তাঁর কাছে শুনলাম তাঁর পড়শী ভেলমুরাত-আগার কাছে একটি কিতাব আছে, ঠিক যেমনটি আমার দরকার তেমনি।
বললেন, ‘জিনিসটা খুবই দুর্লভ! ভেলমুরাত-আগা ওটিকে চোখের মণির মতো আগলে থাকে। কতবার বলেছে, অমন কিতাব সোনার সিন্দুকে তুলে রাখার মতো…’
গেলাম কিতাবের মালিকের কাছে। মালিককে ঘরেই পেলাম। লোকটির বয়স হয়েছে, এক বুক সুন্দর দাড়ি।
আমার দিকে চাইলে ঠিক স্তেপের শিকারীর মতো সন্ধানী দৃষ্টিতে, কিন্তু ভদ্রতা করলে যথেষ্টই।
‘বসো ছেলে, চুল্লির কাছে এসে বসো,’ ডাকলে সমাদর করে এবং সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হল প্রশ্ন: ‘কোত্থেকে আসা হল?’
জবাব দিলাম।
‘জন্ম কোথায়? কুলের লোকেরা কোথায় থাকে? কী করা হয়?’
সংক্ষেপে নিজের জীবন বৃত্তান্ত জানিয়ে বললাম পুরনো পুঁথির সন্ধানে রাজধানীর একটা প্রতিষ্ঠান থেকে আসছি।
‘ভালো কথা!’ বিশাল দাড়িতে হাত বুলিয়ে বুড়ো ফের আমায় নজর করতে লাগল। তারপর বৌয়ের দিকে ফিরে হুকুম দিলে, ‘কিতাবটা দাও তো!’
ছাউনির জাফরি কাটা দেয়ালে টাঙানো গালিচায় তৈরি চুভাল[১], তার ভেতর থেকে বুড়ি নকসা কাটা রেশমী রুমালে বাঁধা মস্ত এক কিতাব বার করলে। সসম্ভ্রমে সেটা সে স্বামীকে দিলে এমন ভাব করে যেন একটা পবিত্র জিনিস।
বুড়ো আরেকবার সন্ধানী দৃষ্টিতে চাইলে আমার দিকে।
বললে, ‘পেশার কথাটা যদি সঠিক বলে থাকো তাহলে এটা যে কী জিনিস বুঝতে দেরি হবে না।’
বইটা বেশ মোটা এবং ভারি, বিবর্ণ রঙীন কাপড়ে বাঁধানো, তাতে লালচে ফুলের ছাপগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে। প্রতিটি পাতায় সমান ছাঁদের টকটকে লাল আরবী হরফে প্রায় কুড়িটি করে পঙক্তি। পড়তে কোনো অসুবিধা হয় না—বোঝা যায় লিপিকার তার কাজটা ভালোই জানত। দানার পিঠে দানার মতো প্রতিটি হরফ সাজানো। বোঝা যায় এ কিতাব আগ্রহ করেই পড়া হয়, পাতার ধারগুলো দোমড়ানো, ভেতরে আঙুলের কালচে ছাপ।
তাড়াতাড়ি পাতা উলটিয়ে গেলাম, চোখ বুলিয়ে কিছু কিছু পড়েও দেখলাম। এটা ঠিক সেই জিনিস যার সন্ধানে আমার পেশার লোকেরা রাতে ঘুময় না, আউলে আউলে ঘুরে বেড়ায়, হাজার দুয়োরে করাঘাত করে... আরো একশটা আউল আর ছাউনি ঘুরলেও এমন একটা সংকলন মেলা কঠিন। আমার প্রথম কর্তব্য দাঁড়াল আলাপীর কাছ থেকে মনের আনন্দ যথাসম্ভব চেপে রাখা। কিন্তু অচিরেই পরিষ্কার হয়ে গেল যে বুড়ো তার গুপ্তধনের দামটা ভালোই জানে। ‘এ কিতাবের এক একটা শব্দেরই দাম এক এক জোড়া উট’ কথাটা সে খামোকাই বলে নি। বুড়োকে যাচাই করার জন্যে আমি পাণ্ডুলিপিটির কিছু কিছু জায়গা চেঁচিয়ে পড়তে শুরু করলাম। কয়েক ছত্র পড়তে না পড়তেই বুড়ো পরের পঙক্তিগুলো মুখস্থ আউড়ে গেল…
‘এবার বিশ্বাস হল তো ছেলে, এ কিতাব সোনার সিন্দুকে তুলে রাখার মতো?’ এই বলে সুর করে যে শ্লোকটি পড়ে শোনালে সেটা বোঝাই যায় তার একটি প্রিয় কবিতা। উদ্দীপনার সঙ্গে বললে, ‘দেখলে কেমন? যত পড়বে তত জমে যাবে, মাতাল করে ছাড়বে।’
এ সবই খুবই ভালো, কিন্তু পান্ডুলিপিটি দখল করা যায় কী করে? বোঝা গেল, বুড়ো ওটা বেচবে না। শুধু বুড়োই তো নয়, তার বৌ এবং আউলের অধিকাংশ বাসিন্দাই যে কিতাবটির ভক্ত।
আমি ভাব করলাম যেন ও কিতাবে আমার তত বেশি আগ্রহ নেই, অন্য প্রসঙ্গে কথা ঘোরালাম। জিজ্ঞেস করলাম: ওদের আউলটা নাকি আমু-দরিয়ার কাছে উঠে যাবার তোড়জোড় করছে, সেখানে নাকি
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments