গুরুদয়াল অধিকারী

গ্রামের নাম চৈতন্য নগর। মাঝখানে গুণেশ্বরী নদী, এপারে লেংগুরা, ওপারে চৈতন্য নগর। এই চৈতন্য নগর গ্রামেই গুরুদয়াল অধিকারীর বাড়ি। হাজংদের মধ্যে যারা উপজাতীয় পুরোহিত, তারাই ‘অধিকারী’ নামে পরিচিত। তাদের নামের পিছনে তারা এই পদবীটিকে ব্যবহার করে থাকেন। গুরুদয়াল অধিকারী মাঝারি কৃষক, তার উপরে উপজাতীয় পুরোহিত। তার সংসারে বিশেষ কোনো অভাব-অনটন ছিল না।

মণিদা বলছিলেন:

এই চৈতন্য নগর গ্রামে আমি বহুবার গিয়েছি। এই অঞ্চলের কোন্ গ্রামেই বা না গিয়েছি! এদিককার সবাই আমাকে চিনত। আর আমিও তাদের অনেককেই চিনতাম। হ্যাঁ, গুরুদয়াল অধিকারীর সঙ্গেও আমার আলাপ-পরিচয় ছিল। বয়স পঞ্চাশ আর ষাটের মাঝামাঝি হবে। দেখা হলেই হাসিমুখে কথা বলতেন। তিনি তার পূজা-আর্চা, ধর্মীয় ক্রিয়া-কর্ম নিয়েই সব সময় ব্যস্ত থাকতেন। কোনো দিন কোনো আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেছেন বলে মনে পড়ে না। তবে তিনি আমাদের আন্দোলনের বিরোধী তো ছিলেনই না, বরঞ্চ আমাদের সমর্থনই করে এসেছেন। আর এ অঞ্চলে আন্দোলনের ব্যাপারে আমাদের পক্ষে নেই, এমন লোক কমই খুঁজে পাওয়া যেত। কিন্তু আমাদের আন্দোলনের প্রতি বা আমাদের পার্টির প্রতি তাঁর মনের টানটা কতদূর গভীর, তা কোনো দিন যাচাই করে দেখবার সুযোগ হয় নি। শুধু আমি কেন্, তাঁর সম্পর্কে এ বিষয়ে কারু মনেই কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না।

সে সময় আমরা খুবই ব্যস্ত। দেশ বিভাগের আগেকার কথা বলছি। বাংলার কমিউনিষ্ট পার্টি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কলকাতা থেকে পার্টির মুখপত্র হিসাবে দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকা প্রকাশ করা হবে। একটা দৈনিক কাগজ চালাতে হলে বহু টাকার প্রয়োজন। এই গরীবদের পার্টি এত টাকা কোথায় পাবে! এই উদ্দেশ্যে পার্টি সভা ও পার্টি সমর্থকদের কাছে তিন লক্ষ টাকা সংগ্রহ করবার জন্য পার্টির পক্ষ থেকে ডাক পাঠানো হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এ ব্যাপারে ধনীদের কাছ থেকে কোনো মোটা টাকা আশা করা বৃথা। কাজেই অত্যন্ত ব্যাপকভাবে বহু লোকের কাছে হাত পেতে তিলতিল করে এই সংগ্রহ কার্য চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ব্যাপক ভাবে মুষ্টিভিক্ষা সংগ্রহ করে পত্রিকা প্রকাশ করার এইটাই সর্বপ্রথম প্রচেষ্টা। বাইরের কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন লোকেরা যা-ই মনে করুন না কেনো, শেষ পর্যন্ত আমাদের এই প্রচেষ্টা সাফল্যমণ্ডিত হয়েছিল।

সারা বাংলার পার্টি কমরেডরা বিপুল উৎসাহ নিয়ে এই তিন লক্ষ টাকা সংগ্রহের অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কে কত বেশী টাকা তুলতে পারে, তাই নিয়ে এক জেলার সঙ্গে আর এক জেলার, এক অঞ্চলের সাথে অপর অঞ্চলের যাকে বলে ‘সোশ্যালিট কমপিটিশন’ অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা চলছিল। সে সময় ধানের ফসল উঠছে।

স্বাধীনতা পত্রিকা তহবিলের জন্য সারা প্রদেশের কৃষকদের কাছ থেকে ধানও সংগ্রহ করা হচ্ছিল। আর সেই সংগ্রহ অভিযানের মধ্য দিয়ে যারা কোনদিন কমিউনিষ্ট পার্টি নামও শোনে নি, তাদের মধ্যেও স্বাধীনতা পত্রিকার লক্ষ্য ও কর্মসূচি সম্পর্কে প্রচারের কাজ চলছিল— কেনো এই পত্রিকা? কাদের জন্য এই পত্রিকা?

সারা প্রদেশের মতো আমাদের এই হাজং অঞ্চলেও অর্থসংগ্রহের অভিযানে অদ্ভুত উৎসাহ ও কর্মচাঞ্চল্য দেখা গিয়েছিল। এই অভিযানের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের অতি-পরিচিত সাধারণ মানুষগুলিরও নূতন করে পরিচয় পাচ্ছিলাম। পার্টির ডাকে যথাসর্বস্ব ঢেলে দেওয়ার জন্য এখানকার পার্টি-কমরেডদের সে কি এক আকুতি! শেষ পর্যন্ত এদের মধ্যে কিছু কিছু লোকে তাদের জমি দান করতে শুরু করল। কিন্তু এখানকার পার্টির প্রাণশক্তি যারা, সেই গরীব কৃষকদের এভাবে জমি-হারা করাটা কোনোমতেই বাঞ্ছনীয় নয়। কিন্তু এরা নিষেধ করলেও শুনতে চায় না, বোঝালেও বুঝতে চায় না, শেষ সম্বল জমিটুকুকে বিলিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত তাদের তৃপ্তি নাই। শেষ পর্যন্ত এখানকার পার্টিকে বাধ্য হয়ে এই নূতন সিদ্ধান্ত নিতে হলো যে, এই অঞ্চলে স্বাধীনতা-তহবিলের জন্য কোনো জমি-দান করা

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice