শিল্পকলার ভূমিকা
[তৎকালীন অস্ট্রিয়ার কোমোটাউ অন্চলের এক সৈনিক পরিবারে ১৮৯৯ সালে ফিশার জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম মহাযুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। তবে মূলত ছিলেন দর্শনের ছাত্র ও সাংবাদিকতায় অনুরাগী। কমুনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন ১৯৩৪ সালে। ১৯৪৫ সালে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কালে, অস্ট্রিয়ায় অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠায় অংশ নেন। কিছু সময় ওই সরকারে শিক্ষামন্ত্রীও ছিলেন। ১৯৫৯ সালের পর থেকে সম্পূর্ণরূপে সাহিত্যসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ওই বছরই প্রকাশিত হয় শিল্প-সমালোচনামূলক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ the Necessity of Art। মার্কসবাদীর দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত এই বইয়ে তিনি কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করেছেন—কেন শিল্পী বিশেষ পদ্ধতিতে আঁকেন, উপন্যাসবিচারের মাপকাঠি কি হবে, বা শিল্পকলাই বা কি? জার্মান ভাষায় রচিত উক্ত পুস্তকটি প্রকাশের পর থেকে ইউরোপে কৌতূহলী বিতর্কে’র জন্ম দিয়েছে। ১৯৬৩ সালে এটি ইংরেজীতে অনুদিত হয়। বর্তমান প্রবন্ধটি তারই প্রথম অধ্যায়।]
‘কবিতা অপরিহার্য—যদি আমি শুধু জানতাম কি কারণে।’ এই চমৎকার আত্মবিরোধী সুভাষণের সাহায্যে জন ককটিউ শিল্পকলার প্রয়োজনীয়তার সার-সংক্ষেপ করেছেন—একই সঙ্গে তুলে ধরেছেন অন্ত্য বুর্জোয়া যুগে এর সন্দেহজনক ভূমিকাও।
শিল্পের সম্ভাব্য ‘অবলুপ্তির’ কথা বলেছেন চিত্রকর মণ্ডারিন। বাস্তবতা, তিনি বিশ্বাস করতেন, ক্রমবর্ধমান হারে স্থান দখল করে নেবে শিল্পকর্মের যেটা তার মতে বাস্তবতার মধ্যে বর্তমানে অনুপস্থিত ভারসাম্যের একটি প্রয়োজনীয় বিকল্প। ‘জীবনের অধিকতর ভারসাম্য অর্জনের সঙ্গে শিল্প বিলুপ্ত হবে।’
শিল্পকলা ‘জীবনের বিকল্প’, মানুষকে পারিপার্শ্বিক জগতের সঙ্গে ভারসাম্যের অবস্থায় স্থাপনের জন্য শিল্পকলা একটি মাধ্যম—এই ধারণাসমূহের মধ্যে নিহিত রয়েছে শিল্পকলার প্রকৃতি ও তার প্রয়োজনীয়তার আংশিক স্বীকৃতির কথা। এবং যেহেতু পরিবেশের সঙ্গে মানুষের স্থায়ী ভারসাম্যের অবস্থা সর্বাধিক উন্নত সমাজেও কল্পনা করা যায়না, সেজন্যে এই ধারণা আমাদের জানিয়ে দেয় যে, পুরাকালেই শুধু প্রয়োজনীয় ছিল এমন নয়, ভাবীকালেও শিল্পের অনুরূপ প্রয়োজনীয়তা থাকবে।
তথাপি, শিল্পকলা কি বিকল্পের অতিরিক্ত কিছু নয়? এটা কি মানুষ ও পৃথিবীর মধ্যে গভীরতর সম্পর্কের কথা প্রকাশ করেনা? আসলে প্রকৃতই কি শিল্পের ভূমিকা একটি মাত্র সূত্রে সংক্ষেপ করা সম্ভব? একে কি বহু ও বিচিত্র প্রয়োজনীয়তা মেটাতে হয় না? এবং, শিল্পকলার উৎপত্তি সম্পর্কে চিন্তা করতে গিয়ে আদিতে এর ভূমিকা-সম্পর্কে যদি আমরা অবহিত হই, সমাজের পরি- বর্তনের সঙ্গে ঐ-ভূমিকারও কি পরিবর্তন হয়নি কিংবা নতুন ভূমিকা তার পরে যুক্ত হয়নি? সেটা জানতেও আগ্রহ জাগে।
এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজার চেষ্টা হয়েছে বর্তমান বইয়ে। আমরা এ-মতে বিশ্বাসী যে অতীতে, বর্তমানে ও ভবিষ্যতে সব সময় শিল্পের প্রয়োজনীয়তা ছিল, আছে এবং থাকবে।
প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে অবশ্য অনুধাবন করতে হবে যে, একটি বিস্ময়কর ব্যাপারকে অতি সহজভাবে নেবার প্রবণতা আমাদের রয়েছে। এবং এটা নিশ্চিতভাবে বিস্ময়কর লক্ষ লক্ষ লোক বই পড়ে, থিয়েটার দেখে, সিনেমায় যায়। এর কারণ কি? যদি বলা হয় যে, তারা বিক্ষিপ্তি, বিনোদন ও মনোরঞ্জন চায়, তাহলে উত্তরকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। কেন অপর একজনের জীবন ও জটিলতায় নিজেকে নিমজ্জিত করা, নিজেকে একটি চিত্রকর্ম, সংগীতাংশ অথবা উপন্যাস, নাটক বা চলচ্চিত্রের পাত্র-পাত্রীর সঙ্গে একাত্ম অনুভব করা বিক্ষিপ্তি, মনোরঞ্জক ও আমোদজনক? কেন আমরা এধরনের ‘অবাস্তবতাকে’ বাস্তবতার তীব্রতা মনে করে সাড়া দেই, এটা কি ধরনের অদ্ভুত, রহস্যময় বিনোদন? এবং যদি কেউ উত্তর দেন যে, একটি অসন্তুষ্ট অস্তিত্ব থেকে সমৃদ্ধ অস্তিত্বে ও ঝুঁকিবিহীন অভিজ্ঞতায় আমরা আশ্রয় নিতে চাই, তাহলে পরবর্তী প্রশ্ন দাঁড়ায়, কেনইবা আমাদের অতৃপ্ত জীবনকে অন্যদের চরিত্র ও কাঠামোর মাধ্যমে তৃপ্ত করার আকাঙ্ক্ষা, কেনইবা মিলনায়তনের অন্ধকার থেকে আলোকোজ্জ্বল মঞ্চের দিকে নিবিষ্ট চিত্তে তাকিয়ে থাকা, যেখানে শুধু অভিনয়ের আতসবাজি চলছে?
স্পষ্টত, মানুষ তার একান্ত নিজত্বকে অতিক্রম করে আরো বেশি হতে চায়। সে হতে চায় একজন সমগ্র মানুষ। আলাদা ব্যক্তিবিশেষ হয়েই সে সন্তুষ্ট নয়; ব্যক্তিগত
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments