রূপো বাঙাল

আমি সকালে উঠেই চণ্ডীমণ্ডপে যেতাম হীরু মাস্টারের কাছে পড়তে।

আজ ঘুম ভাঙতে দেরি হওয়ায় মনে হল কাল অনেক রাত্রে বাবা বাড়ি এলেন মরেলডাঙা কাছারি থেকে। আমরা সব ভাইবোন বিছানা থেকে উঠে দেখতে গেলাম বাবা আমাদের জন্যে কী কী আনলেন।

চণ্ডীমণ্ডপের উঠানে পা দিতেই রূপো কাকা আমাদের বকে উঠল—এ্যাঃ, রাজপুত্তুর সব উঠলেন এখন! মারে গালে এক এক চড় যে চাবালিটা এমনি যায়! বলি, করে খাবা কীভাবে? বামুনের ছেলে কি লাঙল চষতি যাবা?

বাবা বাড়ি থাকতেও রূপো কাকা আমাদের চোখ রাঙাবে।

দাদা ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলে—রাতে ঘুম হয়নি রূপো কাকা।

—কেন রে?

—ছারপোকার কামড়ে। বাব্বাঃ, যা ছারপোকা খাটে।

—যা যা তাড়াতাড়ি পড়তে যা।

রূপো কাকা আমাদের আত্মীয় নয়, বাবার বন্ধু নয়, বাড়ির গোমস্তা কী নায়েব নয়, এমনকী রূপো কাকা হিন্দু পর্যন্ত নয়। রূপো কাকা আমাদের কৃষাণ মাত্র। মাসে সাড়ে তিন টাকা মাইনে পায়।

রূপো কাকার আসল নাম রূপো বাঙাল, ও জাতে মুসলমান। আমাদের গাঁয়ের চৌকিদার ও। পিসিমার মুখে শুনেচি রূপো কাকা নাকি সাজিমাটির নৌকাতে চড়ে ওর কুড়ি-বাইশ বছর বয়সের সময় দক্ষিণ দেশ থেকে আমাদের গ্রামের ঘাটে নিরাশ্রয় অবস্থায় এসে নেমেছিল। কেন এসেছিল দেশ থেকে তা শুনিনি। সেই থেকে আমাদের গ্রামেই রয়ে গিয়েছে—বিদেশ থেকে এসেছিল বলে উপাধি ‘বাঙাল’—এ উপাধিরই বা কারণ কী তা বলতে পারব না।

রূপো কাকা আমাদের বাড়ির কৃষাণগিরি করচে আজ বহুদিন। আমাদের ও জন্মাতে দেখেচে। কিন্তু সেটা আশ্চর্য কথা নয়, আশ্চর্যের কথা হচ্ছে এই যে, ও আমার বাবাকে নাকি কোলে করে মানুষ করেছে। অথচ রূপো কাকাকে দেখলে তেমন বুড়ো বলে মনে হয় না।

আমারই ঠাকুরদাদা হরিরাম চক্রবর্তী গাড় হাতে নদীর ধারে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সায়েবের ঘাটে কই মাছ কেনবার জন্যে। রূপো কাকা সাজিমাটির নৌকাতে বসে ছিল। ওর অবস্থা দেখে হরিরাম চক্রবর্তী ওকে গ্রামে আশ্রয় দেন। সে-সব অনেক দিনের কথা। রূপো কাকার বয়স এখন কত জানি না, মোটের উপর বুড়ো। ঠাকুরদাদা যখন মারা যান, বাবার তখন পঁচিশ বছর বয়েস। বাবাকে তিনি নায়েব-পদে বহাল করে গেলেন জমিদারবাবুকে বলে-কয়ে। সেই থেকে বাবা আছেন মরেলডাঙা কাছারিতে। আর বাড়িতে বিষয়সম্পত্তি দেখাশোনা, প্রজা, খাতকপত্র এসব দেখাশোনো করার ভার ওই সাড়ে তিন টাকা মাইনের কৃষাণ রূপো কাকার ওপর।

আমাদের অবস্থা ভালো গ্রামের মধ্যে—এ কথা সবার মুখেতে শুনে এসেচি জ্ঞান হয়ে অবধি। বড়ো বড়ো চার-পাঁচটা ধানের গোলা। এক-একটিতে অনেক ধান ধরে। কলাই মুগ অজস্র। প্রজাপত্র সর্বদা আসচে খাজনা দিতে।

এসব দেখাশোনা করে কে?

রূপো কাকা সব দেখাশোনা করত। আশ্চর্যের কথা, বাবা বিশ্বাস করে এই সামান্য মাইনের মূখ কৃষাণকে এত সব বিষয়-আশয় দেখবার ভার দিয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন।

বাবাকে সবাই ভীষণ ভয় করে চলতঃ; মুখের ওপর কথা বলতে সাহস করত

কেউ। কিন্তু রূপো কাকা বাবাকে বলত—বলি ও বাবু, তুমি যে এসো বাড়িতি ন-মাস ছ-মাস অন্তর, এতডা বিষয় দেখে কে বলো তো। আদায়-পত্তর ত এ বছর কিছু হলনি! হাতির পাঁচ পা দেখেছো নাকি? এত বড়ো সংসারটা চলবে কীসি?

বাবা দু-মাস অন্তর দু-তিন দিনের জন্য বাড়ি আসেন।

বাবার অনুপস্থিতিতে গোলার চাবি খুলে রূপো কাকা ধান পাড়ত, কলাই মুগ পাড়ত। খাতকদের কর্জ দিত। নিজের দরকার হলে নিজেও নিত।

আমরা সব ছেলেমানুষ, কিছুই বুঝিনে। ঠাকুরমা প্রবীণা বটে, কিন্তু ভালোমানুষ। বিষয়-আশয়ের কিছুই বুঝতেন না। আমাদের আছে সব, কিন্তু দেখে নেবার লোক নেই।

সে-অবস্থায় সব কিছুর ভার ছিল রূপো কাকার ওপর।

বাবা বাড়ি এসে পরদিন চণ্ডীমণ্ডপে বসতেন মহাজনি খাতা খুলে।

বলতেন—কে, কী নিয়েচে রূপো?

রূপো কাকা

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice