বিভূতিভূষণের কিশোরসাহিত্য
বাংলা শিশুসাহিত্যের প্রচলিত ধারায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্থান নির্ণয় করা ভারী শক্ত। আমার ছেলেবেলায় ‘রাজর্ষি’ ও ‘রামের সুমতি’র সঙ্গে আর একটিমাত্র বই পড়বার অনুমতি পেয়েছিলাম মায়ের কাছে, সে বইটি হল ‘পথের পাঁচালী’। দীর্ঘদিন আমার মনে বদ্ধমূল ধারণা ছিল ‘পথের পাঁচালী’ শিশুসাহিত্যের অন্তর্গত, তার আবার শিশুপাঠ্য সংস্করণ হয় কী করে? পরে জেনেছি বয়স্ক ও শিশু পাঠকদের সাহিত্যের আঙিনায় লক্ষ্মণের যে গণ্ডিটি টানা হয়েছে বিভূতিভূষণ বেশিরভাগ সময়েই তা মনে রাখেননি। কেন না তাঁর শিল্পীসত্তার মধ্যে সবসময় লুকিয়ে ছিল একটি কিশোর মন। তিনি ছোটোদের সঙ্গে একেবারে তাদের সমবয়সি হয়ে মিশতে পারতেন এবং তাঁর মধ্যে আরোপিত ছেলেমানুষি মোটেই থাকত না। সেইজন্য কিশোর পাঠকদের মনের খুব কাছাকাছি পৌঁছোতে তাঁর একটুও অসুবিধে হয়নি, নয়তো তাঁর কিশোর পাঠ্য রচনার পরিমাণ যেমন বেশি নয় তেমনই তাদের শুধুমাত্র শিশুসাহিত্যের মলাটবন্দি করাও সঙ্গত মনে হয় না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বিভূতিভূষণ যখন সাহিত্যক্ষেত্রে এসেছেন তখন বাংলা শিশুসাহিত্যের শৈশব পেরিয়ে গিয়েছে, অবনীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, দক্ষিণারঞ্জন মজুমদার, সুনির্মল বসু অর্থাৎ শিশুসাহিত্যের দিকপাল লেখকরা সকলেই এসে গিয়েছেন এবং তাঁদের রচনার সঙ্গে বাঙালি শিশু ও কিশোরদের পরিচয় ঘটেছে। তবুও বিভূতিভূষণ কিশোরচিত্তে নিজের জন্য একটি স্থায়ী আসন করে নিলেন ‘চাঁদের পাহাড়’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে।
অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি শিশুসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপাদান। শিশুর মনে কৌতূহল বেশি, কল্পনাও। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কল্পনাকে বাস্তব মোড়কে পুরে দেখার বাসনা তীব্র হয় এবং সেটি আর এক ধরনের কল্পনা। পরির দেশ কিংবা দৈত্য-দানব-রাক্ষস-খোক্ষস শিশুদের যতটা মুগ্ধ করে কিশোর মনকে ততটা লুব্ধ করে না, তারা ভালোবাসে অজানা ভৌতিক-ভয়াল পরিবেশ এবং অচেনাদেশে গিয়ে ভয়ংকর বিপদের সম্মুখীন হবার গল্প শুনতে। ‘চাঁদের পাহাড়’ ঠিক সেই প্রত্যাশাই পূর্ণ করে। এ উপন্যাসের নায়ক অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় যুবক। তার তরুণ তাজা মন পাটকলের বাবু হবার কথা ভাবতেই পারে না—রেসের ঘোড়া শেষকালে ছ্যাকরাগাড়ি টানতে যাবে? কখনোই নয়। অতএব শুরু হয় আফ্রিকার চাঁদের পাহাড়ের গল্প। লীলা মজুমদার লিখেছেন, ‘চাঁদের পাহাড়ের নামটিও মন গড়া নয়, সত্যিকার আফ্রিকার সত্যিকার পাহাড়ের স্থানীয় নামের অনুবাদ মাত্র।’ অথচ উপন্যাসটির অনুবাদ কিন্তু বিদেশি ছায়ায় লেখা হয়নি।
ছোটোদের জন্য নিছক অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি লেখার সময়েও বিভূতিভূষণের সত্যনিষ্ঠা অভূতপূর্ব। আফ্রিকা যাবার ইচ্ছা তাঁর ছিল, বিচিত্র জগতের জন্য উপাদান সংগ্রহের সময় তাঁর সে বাসনা তীব্র হয়। আফ্রিকা ভ্রমণকারীদের রচনা অত্যন্ত খুঁটিয়ে পড়ে তিনি ‘চাঁদের পাহাড়’ রচনায় হাত দেন এমনকী ডিঙ্গোনেক বা বুনিপের কথাও সংগ্রহ করেছিলেন জুলুল্যান্ডের আরণ্য অঞ্চলের প্রচলিত প্রবাদ থেকে।
এই আহরণ শুধু কিশোরমনের উপযোগী করে নয়, কিশোরমনের ঔৎসুক্য নিয়েও। তাঁর আফ্রিকা ভ্রমণের বাসনার কথা ‘ঊর্মিমুখর’ দিনলিপিতেও রয়েছে, ‘বাইরে কোথাও ভ্রমণের পিপাসা আবার জেগে উঠেছে। ভাবছি আফ্রিকা যাব, শম্ভু আজ এসেছিল, সে বললে, তার কে একজন আত্মীয় মাকিনন ম্যাকেঞ্জির আপিসে কাজ করে, তারই সাহায্যে যদি কিছু হয়... জগতের খানিকটা অন্তত দেখতে চাই।’ শেষ পর্যন্ত বিভূতিভূষণের যাওয়া হয়নি, শংকরের হয়েছিল, চাঁদের পাহাড়ের নায়ক শংকরের সঙ্গে লেখকের মানস-ভ্রমণ সম্পূর্ণ হয়েছিল বলেই ‘চাঁদের পাহাড়’ এত বাস্তব, পড়তে পড়তে চীনে প্রবাদটির সত্যতা অনুভব করতে কিশোর পাঠকদের একটুও কষ্ট হয় না, যেন লেখকের সঙ্গে একাত্ম হয়ে তারাও উচ্চারণ করে, ‘ছাদের আলসের দিব্যি চৌরস একখানা টালি হয়ে অনড় অবস্থায় সুখে-স্বচ্ছন্দে থাকার চেয়ে স্ফটিক প্রস্তর হয়ে ভেঙে যাওয়াও ভালো, ভেঙে যাওয়াও ভালো, ভেঙে যাওয়া ভালো।’
বিভূতিভূষণ কোথাও তাঁর কিশোর পাঠকদের ফাঁকি দিয়ে ভোলাবার চেষ্টা করেননি অথচ এই ছেলে ভোলানো ব্যাপারটি আমাদের শিশুসাহিত্যে অত্যন্ত বেশি। শিশুসাহিত্য রচনা করা খুবই কঠিন সে অর্থেও। শিশুর মন ও
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments