ঢাকার তবলা ও গান
বাংলায় সাধারণভাবে এবং ঢাকাতে বিশেষভাবে তবলার পৃষ্ঠপোষকতার শখ সার্বজনীন। এর বড় কারণ এই যে, এখানে হিন্দুস্থানের প্রসিদ্ধ তবলাবাদকরা সব সময়েই আসা-যাওয়া করতেন এবং এখানকার বিত্তবান সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ তবলা বাজানোতে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। ওয়াজেদ আলী শাহ্' বিশেষ তবলাবাদক হোসাইন বখশের পুত্র আতা হোসাইনও বাবার মতো তবলাবাদনে বিখ্যাত ছিলেন এবং বলা হয়ে থাকে তার বাজানোতে এতই নৈপুণ্য ছিল যে লোকেরা শুধুমাত্র তবলা শ্রবণ করেই মুগ্ধ হয়ে যেত। আতা হোসেইন দীর্ঘদিন ঢাকায় থেকেছেন এবং এখানকার শাসক শ্রেণির লোকেরা (আমিরগণ) তাঁর সম্মান করতেন। স্থানীয় তবলা বাদক ছিলেন খয়রাতী জমাদার, ইনি প্রকৃতপক্ষে মাহুতদের জমাদার ছিলেন কিন্তু এই বিদ্যায় তার পূর্ণতা ছিল। দুনী খান যিনি প্রসিদ্ধ তবলা বাদক ছিলেন, প্রথমত তিনি খয়রাতী জমাদারের শিষ্য ছিলেন। অতঃপর মাটিয়া বুরজ গিয়ে হোসেইন বখশের শিষ্য হন। হোসাইন বখশও কয়েক বার ঢাকায় এসেছেন। অন্য একজন আতা হোসাইন ছিলেন যাকে আতা হোসাইন 'পাথরচাক' বলা হতো। ইনি লক্ষ্মৌর অধিবাসী ছিলেন এবং পূর্বে বর্ণিত আতা হোসাইনের শিষ্য ছিলেন। একশ' বছরেরও পূর্বের কথা যে, মিঠন খান, যিনি লক্ষ্মৌর অধিবাসী এবং খুব বড় গায়ক ছিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তবলা বাদনেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন, প্রকৃতপক্ষে হাত এবং গলা একত্রে খুবই কম দেখা যায়। তিনি এখানে আসেন এবং অধিবাস গ্রহণ করেন। এই মিঠন খান, সুপন খানের নানা ছিলেন। সুপন খানকে আমিও দেখেছি এবং তার বাদনও শুনেছি। আমাদের বাল্যাবস্থায় সুপন খানের দূর দূরান্ত পর্যন্ত প্রসিদ্ধি ছিল। সুপন খানও প্রথমত জমাদারের শিষ্য ছিলেন এবং পরে যখন হোসাইন বখশ ঢাকা এসে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন, হোসাইন বখশের শিষ্য হন। সুপনের শিষ্যদের মধ্যে খাজা আহম্মদ বখশ এবং বাহাদুর খান, কাজী আলাউদ্দীন মরহুম খুবই ভাল তবলা বাদক ছিলেন। উভয়ের শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও সাহসী ছিলেন না এবং কখনই প্রতিযোগিতায় আসতেন না। সুপন খানের স্ত্রীর নামও সুপন ছিল এবং সে ছিল ঢাকর নামকরা ঢারণ এবং নিজেও খুব সুন্দর বাজাত।
এটা ঐ সময়ের কথা যখন সমস্ত হিন্দুস্থানের নামিদামি গায়ক, রবাব এবং সেতার বাদক মর্যাদা লাভের আশায় এখানে বারংবার আসতেন, বছরের পর বছর এখানে থাকতেন এবং ঢাকার এরূপ অনুরাগী হয়ে পড়তেন যে, মিঠন খানের মতো সারা জীবনের জন্য এখানেই রয়ে যেতেন কিন্তু কিছু লোক এমনও ছিলেন যে বসবাস তাদের ঢাকায় থাকত এবং ময়মনসিংহ কুমিল্লা এবং সিলেট পর্যন্ত রইসদের দরবারে ঘুরে বেড়াতেন। কাশেম আলী খান রবাব বাদক ছিলেন। রবাব বাজানোর পূর্ণতার জন্য আগরতলা-রাজ তাকে পাঁচশত টাকা মাসিক ভাতা প্রদান করতেন। ফয়েজ উদ্দীন খান প্রকৃতপক্ষে কাশ্মীরী ছিলেন। তাঁর সুরেলা কণ্ঠের চর্চা আজও বিদ্যমান। রওশন খান একজন পাঞ্জাবি গায়ক ছিলেন, যিনি সারেঙ্গী ভাল বাজাতেন এবং বেহাগ রাগ বাদনে তার দক্ষতা ছিল, টপ্পাও খুবই ভাল গাইতেন। বলা হয়ে থাকে টপ্পা গানের রেওয়াজ তাঁর থেকেই প্রসার পেয়েছে। মুহম্মাদ খানও পাঞ্জাবি ছিলেন, তার ভাই কালু খানও গায়ক ছিলেন। মুহাম্মাদ খান খেয়ালগানে পারদর্শী ছিলেন এবং কালুখান ধ্রুপদ আলাপে পারদর্শী। তিনি মুহম্মাদ খানের শিষ্য ছিলেন। হাকীম রমজান থাকতেন চৌধুরী বাজারে, ঠুম্মী রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন এবং তার নাম ছিল 'রজ'। মিঠন খান যার কথা আগেই বলা হয়েছে, তার খ্যাতনামা শিষ্য ছিলেন শহরের প্রসিদ্ধ ধনী মীর আলী মেহেদী। মীর আলী মেহেদী, মাঝলে সৈয়দ আজাদ' এবং 'আওধ পাঁচ' এর বিখ্যাত পত্র-সম্পাদক নবাব সৈয়দ মুহম্মদের দাদা ছিলেন। তিনি খেয়াল গাইতেন। মীর গোলাম মুস্তাফা মরহুম খাঁটি গদ্য রচনায় বিখ্যাত ছিলেন এবং তাঁকে মির্জা গালিবের অনুসারী বলা হতো। তিনিও খেয়াল গাইতেন। দীর্ঘজীবন পেয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর গানও আমি শুনেছি।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments