লেখালেখির সত্যেন সেন
লেখক, রাজনীতিক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক সত্যেন সেন (১৯০৭-১৯৮১) কোনোটি বাদ দিয়ে কোনোটি করেননি। প্রয়োজনে সব কাজগুলো তিনি একই সঙ্গে করেছেন। অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে ১৯২১ সালে মাহাঙ্গু বানিয়া বা বাউ-এর সঙ্গে তিনি টঙ্গীবাড়িতে এক জনসভায় যোগদান করে তাঁর জীবনের গতিপথ নির্ধারিত হয়ে যায়। বাউ-এর মাধ্যমেই তিনি বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯২৪ সালে কলেজে পড়াকালে যোগ দেন বিপ্লবী দল যুগান্তর-এ। সে সময় ‘নবশক্তি’ পত্রিকায় কিছু কিছু কবিতা লিখেছিলেন বলেও জানা যায়। তারপরেই ১৯৩১ সালে ২৪ বছর বয়সে রাজনৈতিক কারণে জেল জীবন শুরু হয় অস্ত্রের মধ্যে তাঁর চিঠি পাওয়ার অপরাধে। তারপর জেল-বাহির-জেল এভাবে কেটে যায়। ১৯৬৮ সালের শেষভাগ পর্যন্ত প্রায় ৭৪ বছরের জীবনের প্রধান অংশটিও কেটেছে জেল-বাহির-জেল জীবনে। আর বাকি অর্ধেকটা শৈশব, কৈশোর ও জরাগ্রস্ত বার্ধক্য জীবন। কৈশোর জীবনে তিনি কবিতা লেখা শুরু করলেও সে চর্চা থেকে সরে যান। ১৯৩৪ সালে জেলে বসে তিনি লেখেন প্রথম গ্রন্থ ‘ভোরের বিহঙ্গী’ যা প্রকাশিত হয় ২৫ বছর পর ১৯৫৯ সালে। ১৯৫৭ সালে তিনি লেখেন ‘মহাবিদ্রোহের কাহিনী’ স্বাধীনতা সংগ্রামের শতবর্ষ স্মরণে। তা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় একবছর পর ১৯৫৮ সালে। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাননি, একটানা লিখে গেছেন। কোনো কিছুতেই তোয়াক্কা করেননি। দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও লিখে গেছেন, অন্যদের দিয়েও লেখিয়েছেন, সে এক আজব মানুষ। যাঁরা তাঁকে দেখেছেন তাঁরাই সেসব কথা বলে গেছেন। তা আজ কাহিনীর মতো শোনাবে। সত্যেন সেনের জন্ম হয়েছিল ১৯০৭ সালের ২৮ মার্চ মুন্সীগঞ্জ জেলার সোনারং গ্রামের ‘শান্তি কুটির’-এ এবং মারা যান ১৯৮১ সালের ৫ জানুয়ারি শান্তি নিকেতন-এ তাঁরই প্রিয় সেঝ দি’র বাসায়।
সত্যেন সেন ১৭ বছর বয়সে লেখালেখি শুরু করলেও শেষ জীবন পর্যন্ত তিনি লেখালেখি করেছেন। তবে পঞ্চাশের দশকের শেষদিক থেকে তিনি লেখালেখিতে বেশি ঝুঁকে পড়েন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো থেকেই লেখক সত্যেন সেনকে ভালোভাবে উপলব্ধি করা যাবে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে মহাবিদ্রোহের কাহিনী (১৯৫৮), ভোরের বিহঙ্গী (১৩৬৬), গ্রামবাংলার পথে পথে (১৩৭২), রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ (১৩৭৪), অভিশপ্ত নগরী (১৩৭৪), পাতাবাহার (১৩৭৪), আমাদের এই পৃথিবী (১৩৭৪), মশলার যুদ্ধ (১৩৭৫), সেয়ানা (১৩৭৫), পদচিহ্ন (১৩৭৫), আলবেরুণী (১৩৭৫), পাপের সন্তান (১৯৬৯), পুরুষমেধ (১৯৬৯), সাতনম্বর ওয়ার্ড (১৯৭৬), বিদ্রোহী কৈবর্ত (১৩৭৬), এটমের কথা (১৩৭৬), অভিযাত্রী (১৩৭৬), মেহনতি মানুষ (যৌথ ১৩৭৬), কুমারজীব (১৩৭৬), অপরাজেয় (১৩৭৭), মা (১৩৭৭), মানব সভ্যতার ঊষালগ্নে (১৩৭৭), উত্তরণ (১৯৭০), মনোরমা মাসীমা (১৯৭১), একূল ভাঙ্গে ও কূল গড়ে (১৯৭১), প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ (১৯৭১), বাংলাদেশের কৃষকের সংগ্রাম (১৯৭২), বিপ্লবী রহমান মাস্টার (১৯৭৩), জীববিজ্ঞানের নানা কথা (১৯৭৩), শহরের ইতিকথা (১৩৮০), সীমান্ত সূর্য আবদুল গাফ্ফার খান (১৩৮৩), ইতিহাস ও বিজ্ঞান (১ম খণ্ড) (১৩৮৪), ইতিহাস ও বিজ্ঞান (২য় খণ্ড) (১৯৭৯), ইতিহাস ও বিজ্ঞান (৩য় খণ্ড) (১৩৯৫), ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা (১৩৯২), জেলের কবিতা (১৯৮৭), জেল থেকে লেখা (২০০৭) ও নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিছে নিঃশ্বাস (২০১৫)। তাছাড়া আইসোটোপ, বিকিরণ, প্রাচীন চীন, প্রাচীন ভারতের স্বর্ণযুগ, বিশ্বমানবের মহাতীর্থে ও কমরেড মণিসিংহ নামে তাঁর কয়েকটি লেখা রয়েছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর বেশকিছু লেখা এখনো অগ্রন্থিত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। বিশেষ করে তাঁর চিঠিপত্র। বাংলা একাডেমি থেকে অধ্যাপক বদিউর রহমানের সম্পাদনায় তাঁর রচনাবলি দশ খণ্ডে (ইতোমধ্যে কয়েকটি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে) প্রকাশিত হতে যাচ্ছে।
সত্যেন জীবনে দু’টি বৈশিষ্ট্যের দিক হলো পড়াশোনা ও লেখালেখি। প্রথম জীবনে পড়াশোনাটাই বেশি করেছেন। ১৯৩৪ সালে প্রেসিডেন্সি জেলে সত্যেন সেনের সহবন্দি বামপন্থি লেখক গোপাল হালদার (১৯০২-১৯৯৩) স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন:
প্রেসিডেন্সি জেলে সত্যেনকে খুব কাছে থেকে দেখেছিলাম। তখন তিনি প্রচুর গান গাইতেন। রবীন্দ্র সঙ্গীত। এখানেই আবার দেখতাম
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments