জীববৈচিত্র্য বিনাশের পূর্বাপর
বকপাখির ছদ্মবেশধারী ধর্ম জ্যেষ্ঠ-পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করেছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য কী? উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, মানুষ অহরহ মৃত্যু দেখে কিন্তু আপন মৃত্যুর কথা ভুলে থাকে। হোমো সেপিয়েন্স অর্থাৎ মনুষ্যজাতির ক্ষেত্রে অভিধাটি প্রযোজ্য। মানুষ ব্যাপক প্রজাতিবিলুপ্তির তথ্য জানে এবং নিজেও অবিরাম প্রজাতিবিলুপ্তি ঘটিয়ে চলেছে। কিন্তু নিজের বিলুপ্তি কখনো ভাবে না।
প্রজাতি বিলুপ্তি একটি জীবতাত্ত্বিক বাস্তবতা তথা প্রকৃতির আমোঘ নিয়ম। এই ধ্বংসের মধ্যেই নিহিত সৃষ্টির বীজ এবং বৈচিত্র্যের ভিত্তি। জীবকুলের উৎপত্তির পর ভূ-তাত্ত্বিক কালপর্বে অজস্র প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটেছে। পৃথিবীতে উৎপন্ন প্রজাতির মাত্র ১.৬ শতাংশ আজ বেঁচে আছে। মানবজনমের আগে বারবার গণবিলুপ্তি ঘটেছে। সর্বশেষ ৬.৫ কোটি বছর আগে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল সামুদ্রিক প্লাংকটন, মেরুদণ্ডীর অনেকগুলি বৃহৎ বর্গ এবং গোটা ডায়নোসর গোষ্ঠী। বিগত ২০ কোটি বছরের প্রতি শতকে প্রজাতিবিলুপ্তির হার ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ, জন্মেছে ততোধিক। জন্মমৃত্যুর চক্রাবর্তে কোনো প্রজাতিরই চিরজীবী হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। প্রকৃতিই প্রাণের স্রষ্টা ও বিনষ্টা এবং তা বিবর্তনক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। প্রজাতিবিলুপ্তির কারণগুলো সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অনেকটাই অস্পষ্ট, যেটুকু ডারউইন (১৮০৯-৮২) উদঘাটন করেছেন আমরা সেটুকুও মান্য করি না। আমরা নিজেরাই এখন প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটাচ্ছি, কিন্তু নিজেরাও যে এই পাকচক্রে বিলুপ্ত হতে পারি সে ক্ষেত্রে আমাদের আকাট ঔদাসীন্য। এটাও আরেক আশ্চর্য।
পৃথিবীতে সনাক্তকৃত জীবপ্রজাতির সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ, অচেনা-অজানা আছে আরও ৫০ লাখ, হতে পারে ৫ কোটি। ক্রান্তীয় বৃষ্টিবনে আরও ৩ কোটি পতঙ্গ ও ১৫ থেকে ২০ হাজার নলবাহী (ভাস্কুলার) উদ্ভিদ প্রজাতি থাকা সম্ভব। ছত্রাক ও মাকড়সার অনেকগুলো প্রজাতি সনাক্তকরণ এখনও বাকি। বিগত পাঁচ বছরে আমাজন বনাঞ্চলে আবিষ্কৃত হয়েছে ৩০০ নতুন প্রজাতির মাছ এবং চার প্রজাতির নতুন বানরজাতীয় প্রাণী। সবকিছু সনাক্ত করতে প্রয়োজন ২৫ হাজার বিজ্ঞানীর বহু বছরের শ্রম আর তাতেও জানা যাবে না ওইসব জীবের জীবনচক্র ও বাস্তুপরিবেশ। বাংলাদেশে অদ্যাবধি জ্ঞাত উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা যথাক্রমে ৬ হাজার ৬৩৪ ও ৫ হাজার ৩৫১। সীমিত আয়তনের এই ভূখ-ে বিগত কয়েক বছরে পাওয়া গেছে সপুষ্পক উদ্ভিদের ১২ নতুন প্রজাতি। এখানকার নলবাহী উদ্ভিদের ১০৬ ও প্রাণীর ১৩৭ প্রজাতি নানা পর্যায়ে বিপন্ন, বিলুপ্ত হয়ে গেছে মেরদণ্ডী প্রাণীর ১৩ প্রজাতি। বাংলাদেশের নিজস্ব বা একান্ত সপুষ্পক উদ্ভিদ প্রজাতির সংখ্যা ৬। এ হিসাব থেকে বাদ গেছে অণুজীব, ছত্রাক, শৈবাল ও নিম্নবর্গীয় উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতিগুলো। বলাবাহুল্য, খতিয়ান ক্রমাগত দীর্ঘতর হবে এবং বিলুপ্ত বিপন্ন ও নতুন প্রজাতির সংখ্যা বাড়বে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রজাতির বিপন্নতা ও বিলুপ্তির কারণ প্রাকৃতিক নয়, মানুষী কর্মকাণ্ডের ফল।
তবে আশার কথা, হিসাবটি নির্বিশেষ নয়। জীবপ্রজাতির ভূগোল রাজনৈতিক ভূগোল থেকে পৃথক। বাংলাদেশের জীবকুল ইন্দো-মালয়ীয় জীবাঞ্চলের অন্তর্গত, এখানে না থাকলেও আশপাশের দেশে কোনো কোনোটি টিকে থাকা সম্ভব।
সমস্যাটি কোনো একক দেশের নয় গোটা বিশ্বের
জীববৈচিত্র্য একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, প্রকৃতি ও পরিবেশ বিপর্যস্ত হলে জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় ঘটে। জীবজগৎ বিভিন্ন বাস্ততন্ত্রে বসবাস করে। প্রাকৃতিক নিয়মে এ বাস্ততন্ত্রের পরিবর্তন ঘটলে বিবর্তনক্রিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠে, ধ্বংস ও সৃষ্টির মধ্যে জীবকুলের পুনর্জনন ঘটে, উৎপন্ন হয় নতুন নতন প্রজাতি। অক্সিজেনহীন পৃথিবীতে একদা অবায়ুজীবী জীবকুলের উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটেছিল, বায়মণ্ডলে অক্সিজেন আসার পর এইসব জীবের গণবিলুপ্তি ঘটে, কিন্তু উৎপন্ন হয় বায়ুজীবী জীবকুল এবং আজকের সব উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি। এটাই বিবর্তন। কিন্তু মানুষ বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন ঘটালে প্রকৃতি পশ্চাদপসরণ করে, প্রহত হয় বিবর্তনক্রিয়া, লোপ পায় জীববৈচিত্র্য। প্রকৃতি ও মানুষের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মধ্যে গুণগত পার্থক্য দুস্তর।
মানুষ যখন থেকে জেনেছে, সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম জীব গোটা প্রকৃতি তার ভোগ্যবস্তু তখন থেকেই প্রকৃতির ওপর মানুষের অমিত আগ্রাসনের শুরু এবং নৃকেন্দ্রিকতাবাদের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments