মার্কসবাদ ও বিজ্ঞান
লেখক: আবদুল কাদের
মার্কস দুটি কৃতিত্বের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। প্রথম কৃতিত্ব আধুনিক বস্তুবাদ (দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ) এবং দ্বিতীয় কৃতিত্ব ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (সামাজিক বস্তুবাদ)।
আধুনিক বস্তুবাদের মূলকথা, বস্তু স্বনির্ভর এবং বস্তুর ভিতরের দুই বিপরীতের দ্বন্দ্বই বস্তু এবং বস্তুজগতে পরিবর্তন নিয়ে আসে। এ কথার অর্থ বস্তু ও শক্তি মূলত অভিন্ন। কাজেই বস্তুর অন্তর্নিহিত শক্তিই বস্তুর পরিবর্তনের নিয়ামক। মার্কস-পূর্ববর্তী বস্তুবাদকে বলা যায় জড়বাদ। জড়বাদী ধারণা অনুসারে জড় বহির্ভূত শক্তি জড়ের উপর সক্রিয় হলে তবেই জড়জগতে পরিবর্তন আসে। এখানে শক্তি এক অতিপ্রাকৃত ধারণা হিসেবে অবস্থান করে। জড়বাদের আর এক নাম যান্ত্রিক বাস্তুবাদ। যান্ত্রিক বস্তুবাদকে যান্ত্রিক বস্তুবাদ না বলে যান্ত্রিক ভাববাদ বলাই শ্রেয়, কারণ এটা বস্তুবাদের ছদ্মবেশে ভাববাদ ছাড়া কিছুই নয়। অপরদিকে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (সমাজের আধুনিক বস্তুবাদী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ) এর মূলকথা হলো সমাজ জগৎ প্রাকৃতিক জগতের মতোই বস্তুগত। তাই বস্তুজগতের মতো সমাজ জগৎও বস্তুগত নিয়মে পরিবর্তনশীল। প্রাকৃতিক জগতের ঘটনাবলী যেমন কার্যকারণ নিয়মের অধীন, সমাজও তদ্রূপ। কাজেই সকল সামাজিক ঘটনাবলীও কার্যকারণ নিয়মের অধীন। সঙ্গত কারণে সামাজিক সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায় হল সমস্যার বাস্তব কারণ উদ্ঘাটন করে তা নির্মূল করা।
এর বিপরীতে জড়বাদসহ সকল রকমের ভাববাদী তাত্ত্বিকেরা মনে করেন সামাজিক ঘটনাবলীর ক্ষেত্রে কার্যকারণ নিয়ম কার্যকরী নয়। কাজেই সামাজিক ঘটনাবলীর কারণ নির্ণয়ের পথ বেয়ে সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা বৃথা; বরং এর বিপরীতে যা প্রয়োজন তা হলো একটি আদর্শ নির্ধারণ করে সেই আদর্শের পথে এগিয়ে যাওয়া। বিশেষত কতক আচার-অনুষ্ঠান অনুশীলন, তথাকথিত চরিত্র সংশোধন, ত্যাগ, সংযম, দয়াদাক্ষিণ্য প্রদর্শন ইত্যাদিকে উপায় হিসেবে গ্রহণ করে।
মার্কসের সকল বিচার-বিশ্লেষণ আধুনিক বস্তুবাদ (বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদ) এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদের উপর নির্ভরশীল। এটা খুব সহজেই অনুমেয় যে, মার্কস-এর বিপক্ষদল আধুনিক বস্তুবাদ এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদী সকল বিচার-বিশ্লেষণকে এক কথায় চিহ্নিত করার জন্য এর নাম দিয়েছিলেন মার্কসবাদ। মার্কস-এঙ্গেলস এ নাম দেননি। বরং মার্কস এর বিপরীতে যা বলেছিলেন তা হল—“আমি যতদূর জানি আমি মার্কসবাদী নই,' যা হোক পরবর্তীকালে আধুনিক বস্তুবাদ এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে চিহ্নিত করার জন্য বিপক্ষ দলের দেয়া মার্কসবাদ নামটি স্বপক্ষ দলেও প্রচলিত হয়। এরূপ নাম দেয়ার পিছনে বিপক্ষ দলের মধ্যে যে মনোভাব কাজ করেছিল তা হলো আধুনিক বস্তুবাদ এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে তারা সমাজ-পরিবর্তনের বিজ্ঞান হিসেবে গ্রহণ না করে মার্কস-এর ব্যক্তিগত মত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন আর স্বপক্ষ দল না বুঝেই ঐ নাম গ্রহণ করে অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিয়েছিলেন।
আমরা জানি আধুনিক বস্তুবাদ এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদ হলো সমাজ পরিবর্তন তথা সামাজিক সমস্যা সমাধানের বিজ্ঞান। আমরা এও জানি যে, আজ পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞান ব্যক্তিগত নামে গড়ে ওঠেনি। যেমন: পদার্থ বিজ্ঞান, জীব বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, আকাশ বিজ্ঞান ইত্যাদি বিজ্ঞান কোনো ব্যক্তির নামে গড়ে ওঠেনি; এমনকি এসব বিজ্ঞানের জনকের নামেও না, কিন্তু সামাজিক বস্তুবাদ-এর ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেছে, মার্কসবাদ নাম ধারণ করে।
কেউ বলতে পারেন মার্কসবাদ নামে এমনকি অশুদ্ধি? প্রথম অশুদ্ধি হলো মার্কসবাদ শব্দটি যে অর্থ বহন করে তা হলো এটি মার্কস-এর ব্যক্তিগত মত। ব্যক্তিগত অভিমত কখনো বিজ্ঞান হবার দাবী রাখতে পারে না। কাজেই মার্কসবাদ শব্দটি গ্রহণ করায় এটি মততন্ত্রের তলায় তলিয়ে গেছে; হারিয়ে গছে এর বৈজ্ঞানিক স্পিরিট এবং ক্রমান্বয়ে বিজ্ঞানের বিপরীত আদর্শে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন আসে যে, বিজ্ঞান এবং আদর্শের মধ্যে পার্থক্য কি?
বিজ্ঞান কার্যকারণ নিয়মভিত্তিক। তাই বিজ্ঞান সমস্যার কারণ নির্ণয় করে, সেই কারণ নির্মূলের মাধ্যমে সমাধানের পথে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করে। কিন্তু আদর্শগত ভাবনা অনুসারে সমাজ ও মনোজগতে কার্যকারণ নিয়ম অচল হওয়ায় এখানে বিজ্ঞানও অচল। তাই এখানে একটি অদর্শ স্থির করে, সেই আদর্শের পথে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments