কবিরাজের বিপদ

চন্দ্রনাথবাবু কবিরাজ এবং শিশির সেন তরুণ ডাক্তার। রামদাসের ছোট্ট বাজার পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদবাস্তু ডাক্তার, কবিরাজ, হোমিয়োপ্যাথে ভরতি হয়ে গিয়েছে। রোগীর চেয়ে ডাক্তারের সংখ্যা বেশি। তবে দেশটায় রোগ-বালাই নিতান্ত কমও নয়, তাই সবাই দু-মুঠো ভাতের জোগাড় করতে পারত কোনোরকমে। চন্দ্রনাথবাবুর বয়েস পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্ন, শিশির সেনের বয়েস ছাব্বিশ-সাতাশ। ওঁদের ডাক্তারখানা রাস্তার এপার-ওপার। রোগীপত্তর প্রায়ই থাকে না, দু-জনে বসে গল্পস্বল্প করেন। বয়সের তারতম্য যতই থাকুক, দু-জনের খুব বন্ধুত্ব। চন্দ্রনাথবাবু এসেছেন খুলনা জেলার হলদিবুনিয়া থেকে আর শিশিরবাবু যশোর শহর থেকে।

কাজকর্ম না থাকলে যা হয়ে থাকে, দু-জনে বসলেই তর্ক আর দ্বন্দ্ব। তর্কের বিষয়বস্তু প্রধানত মানুষের মৃত্যুর পর কী হয়, এই নিয়ে।

চন্দ্রনাথবাবু বললেন— তাঁদের গ্রামে একজন সাধু ছিলেন, তিনি ভূত নামাতে পারতেন। অনেকবার তিনি ভূত-নামানো চক্রে উপস্থিত ছিলেন, নিজের চোখে ভূতের আবির্ভাব দেখেছেন, ভূতের কথা শুনেছেন নিজের কানে। সাধুটি একজন বড়ো মিডিয়াম, তাঁর মধ্যে দিয়ে নাকি ভূতের দল পৃথিবীতে নিজেদের প্রকাশ করে।

শিশির সেন বললেন— রাবিশ!

চন্দ্রনাথবাবু বলেন— তোমার বলবার কোনো অধিকার নেই এখানে। তুমি ছেলেমানুষ, কতটুকু তোমার অভিজ্ঞতা?

—অভিজ্ঞতার কোনো দরকার হয় না, কমনসেন্সের প্রশ্ন এটা।

—কাকে বলছ কমনসেন্স?

—মানুষ মারা গেলে আর বেঁচে থাকে না, কমনসেন্স। মরা মানেই না-বাঁচা।

—মরা মানে বৃহত্তর জীবনের মধ্যে প্রবেশ করা।

—মরা মানেই না-বাঁচা।

—মরা মানে জীবনটা বড়ো করে পাওয়া।

—একদম বাজে!

—দু-পাতা সায়েন্স পড়ে ভাবছ খুব সায়েন্স শিখে ফেলেছ। আসল সায়েন্সের কিছুই জানো না, শেখোনি।

বৈশাখ মাসের শেষ সপ্তাহ। এ বছরের মতো এমন গরম এখানকার বৃদ্ধ লোকেরাও সেখানে কোনোদিন দেখেনি।

শিশির সেন বেলা সাড়ে পাঁচটার সময় এসে ডাক্তারখানা খুললেন। নাঃ, টিনের বারান্দা তেতে আগুন হয়েছে, এখনও ঘরের ভেতর বসা সম্ভব নয়।

সামনের পানের দোকানিকে বললেন— রাস্তাটাতে একটু জল ছিটিয়ে দিও অভয়, এখুনি লরি গেলে ধুলোয় চারিদিক অন্ধকার করে দেবে।

—ও কোবরেজমশায়!

—কী?

—বাইরে আসুন না!

—যাই।

—কতক্ষণ এলেন?

—আমি আজ বাসায় যাইনি— দুপুরে এখানেই শুয়ে ছিলাম।

—খেলেন কোথায়?

—রামজীবন তরফদারের স্ত্রীর শ্রাদ্ধ গেল আজ কিনা! নেমন্তন্ন ছিল।

—হুঁ! আসুন আমার বারান্দায়, চা খাবেন?

—না মশায়! এই গরমে চা? দুপুরে লুচি ঠেসে?

—দালদা ঘি-এর তো?

—নইলে আর কোথায় পাচ্ছে গাওয়া ঘি?

—না মশায়, ও নেমন্তন্ন না-খেয়ে ভালোই করেছি, খেলে অম্বল, না-হয় পেটের অসুখ। আর এই গরমে!

চন্দ্রনাথবাবু ডাক্তার সেনের বারান্দায় এসে বসলেন এবং চাও খেলেন। পরে যথারীতি ভূতের গল্প শুরু হয়ে গেল।

চন্দ্রনাথবাবুর মধ্যে একটি সমরপটু আশা বাস করে, অবিশ্বাসীর সঙ্গে যুদ্ধ করেই তাঁর তৃপ্তি। শিশির সেন ভূতে বিশ্বাস করুক না-করুক, তাতে চন্দ্রনাথ কবিরাজের কী? জিনিসটা যদি সত্যি হয়, তবে শিশির সেনের অবিশ্বাস সেটার কী হানি করতে পারে?

চন্দ্রনাথবাবু সেটা বোঝেন না যে এমন নয়— বোঝেন সবই; তবু যদি একজন অবিশ্বাসীকেও একদিন আলোতে এনে হাজির করা যায়! ইসলাম ও খ্রিস্ট ধর্মের দিগ্ব্জয়ী প্রচারকদের আত্মা যেন তাঁর মধ্যে এসে বাসা বেঁধেছে। সত্যের আলোতে এসব অসৎ মূর্খ ছেলে-ছোকরাদের আনতেই হবে, তবেই প্রকৃত শাস্তি দেওয়া হবে এই দাম্ভিকদের। স্বার্থবাদী ছোকরা দাম্ভিকদের দল! দু-পাতা সায়েন্স পড়ে সব শিখে ফেলেছে!

চন্দ্রনাথবাবু জানতেন না শিশির সেনের মতো ছোকরারা তাঁর সম্বন্ধে কী মনে করে। ওরা আড়ালে মুখ টিপে হেসে বলে— বুড়ো একদম সেকেলে। কুসংস্কারে ভরা। ইংরেজি তো তেমন জানে না! কবরেজি করত, সংস্কৃত জানে একটু-আধটু। দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে ঊনবিংশ শতাব্দীর। কী করি, মেশবার কোনো লোক নেই এসব জায়গায়। কার সঙ্গে দুটো কথা বলি; নইলে এই বুড়ো হাড়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব আমার? রামঃ!

একটু পরে হঠাৎ পশ্চিম

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice