মুক্তিযুদ্ধে উর্দু কবি
লেখক: সৈয়দ আবুল মকসুদ
বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকেরা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। একাত্তরের মার্চে বঙ্গবন্ধুর ডাকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে তাঁদের ভূমিকা ছিল অগ্রসৈনিকের। শুধু লেখালেখি নয়, তাঁরা রাজপথে মিটিং-মিছিল করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দেশের ভেতরে থেকে কবি-সাহিত্যিকদের অনেকেই সশস্ত্র প্রতিরোধে অংশ নিয়েছেন। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যাঁদের পক্ষে ভারতে যাওয়া সম্ভব হয়, তাঁরাও সেখানে গিয়ে বিভিন্নভাবে সাধ্যমতো ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের কবি-লেখক-শিল্পীদের সঙ্গে তখন যোগ দেন ভারতের বাঙালি কবি-সাহিত্যিকেরা। তাঁরা বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এবং পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বর্বরতার বিরুদ্ধে জনমত গঠনে অসামান্য ভূমিকা রাখেন।
কলকাতার উর্দুভাষী কবি-সাহিত্যিকেরা অনেকেই বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামীদের সঙ্গে সংহতি জানাতে এগিয়ে আসেননি। তবে কেউই আসেননি তা নয়। কেউ কেউ শুরু থেকেই বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হলেন কবি ও সাংবাদিক সালিক লখনৌভি।
এপ্রিলে প্রবাসী সরকার গঠিত হওয়ার কয়েকদিন পরে কলকাতার কবি-লেখক-শিল্পীরা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এক শোভাযাত্রা বের করেন। মিছিলটি ছিল খুবই বড়। বাংলাদেশেরও অনেকে তাতে ছিলেন। সালিক লখনৌভি জানান, সুচিত্রা মিত্র সেখানে গেয়েছিলেন: 'বুক বেঁধে তুই দাঁড়া দেখি, বারে বারে হেলিসনে ভাই'। এবং আর এক শিল্পী গেয়েছিলেন: 'নাই নাই ভয় হবে হবে জয়, খুলে যাবে এই দ্বার-।' নজরুলের উত্তেজক গান তো ছিলই।
তিনি বলেন, কিন্তু মিছিলটি উত্তাল হয়ে ওঠে যখন নজরুল-পুত্র কাজী সব্যসাচী সামনে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করতে শুরু করেন: 'বল বীর, বল উন্নত মম শির।'
ওই শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী একমাত্র উর্দু কবি ছিলেন সালিক লখনৌভি। তিনি তাঁর একটি স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন। কবিতাটির শিরোনাম: 'জাগ উঠা বাংলাদেশ' ('বাংলাদেশ জেগে উঠেছে')।
উর্দুতে কবিতার শুরুটা ছিল এ রকম:
জুলুম কে হাত মে আজ হ্যায় রাইফেল,
আজ মজলুম সিনে সিপার বান্ গায়ে।
হর্ সুহাগান কি আঁখো সে সোলে রাওয়া,
আজ বইনু কে আঁচল সে পরসম বানে
জুলুম সে জঙ্গি করলে বহে নওজোয়ান।
বাংলায় কবিতাটির অনুবাদ এ রকম:
অত্যাচারীর হাতে আজ আছে রাইফেল,
আজ নিপীড়িতের বক্ষ হয়ে গেছে ঢাল।
আজ প্রেয়সীদের চোখে ঝরছে আগুন শিখা।
আজ বোনদের শাড়ির আঁচল হয়ে গেছে পতাকা।
অত্যাচারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেছে যুবকেরা।
জেগে উঠেছে বাংলাদেশ।
আজ পদ্মা ও মেঘনায় উঠেছে ঝড়
যুবকদের জোশ দেখে ঝড়ও লজ্জিত।
আজ পানির বদলে বইছে নদীতে রক্ত;
মাস্তুলে পাল নেই তবু চলছে নৌকো।
সেখানে মৃত্যু আছে সেখানে জীবন ছাড়া
অন্য কোনো গন্তব্য নেই
(যে মরতে যায় [স্বাধীনতার জন্য] তার সেটা মৃত্যু নয়—
মৃত্যুর ভেতরে অন্য জীবন)
আকাশ রক্তলাল, মুক্তি মিছিলের যুবকদের দেহ
তাদের রক্তের চেয়েও লাল
জেগে উঠেছে বাংলাদেশ।
আজ বাংলার বাতাসে যুদ্ধ;
আজ নজরুলের গানে উত্তেজনার ঝংকার;
আজ মাঝিদের গান থেকে আসছে আহ্বান
আজ নৌকার দাড়গুলো হয়ে গেছে তলোয়ার,
আজ রাখালের বাঁশিগুলো হয়ে গেছে হাতিয়ার।
জেগে উঠেছে বাংলাদেশ।
মহাত্মা গান্ধী ও নজরুল সম্পর্কে গবেষণা করতে গিয়ে আমি ভারতের বাঙালি-অবাঙালি বহু নেতা ও কবি-সাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার নেই। কয়েকবার কথা হয় সালিক লখনৌভির সঙ্গে। তিনি রবীন্দ্রনাথকে কাছে থেকে দেখেছেন। তাঁর লেখাও উর্দুতে অনুবাদ করেছেন।
নজরুলকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে জানতেন। সাংবাদিক হিসেবে গান্ধীজির সভা-সমাবেশের রিপোর্ট করেছেন। তিনি দুঃখ করে বলেন, ওই মিছিলে এই কবিতা পড়ার পর চার-পাঁচ মাস কলকাতার অবাঙালি মুসলমানরা আমাকে বয়কট করে। ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো উর্দু পত্রিকা আমার লেখা ছাপেনি। '৭২ থেকে আবার আমার লেখা নেয়।
সালিক লখনৌভি ছিলেন বাম-প্রগতিশীল শিবিরের মানুষ। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে আমাকে পাঠিয়েছিলেন। পিপিআই নেতা ও লেখক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। সালিক লখনৌভি তাঁর কলমি নাম, প্রকৃত নাম শওকত রিয়াজ কাপুর। তাঁরা আদিতে ছিলেন লখনৌয়ের বাসিন্দ।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments