তারানাথ তান্ত্রিকের দ্বিতীয় গল্প
তারানাথ তান্ত্রিকের প্রথম গল্প আপনারা শুনিয়াছেন কিছুদিন আগে, হয়তো অনেকেই বিশ্বাস করেন নাই। সুতরাং তাহার দ্বিতীয় গল্পটি যে বিশ্বাস করিবেন এমন আশা করিতে পারি না। কিন্তু এই দ্বিতীয় গল্পটি এমন অদ্ভুত যে, সেটি আপনাদের শুনাইবার লোভ সংবরণ করা আমার পক্ষে দুঃসাধ্য।
জগতে কি ঘটে না-ঘটে তাহার কতটুকুই বা আমরা খবর রাখি? দেয়ার আর মোর থিংস ইন হেভেন আর্থ, হেরোশিয়ো— ইত্যাদি-ইত্যাদি। অতএব এই গল্পটি শুনিয়া যান এবং সম্পূর্ণ সত্য বলিয়া, ডিসমিস করিবার পূর্বে মহাকবির ওই বহুবার উদ্ধৃত, সর্বজন পরিচিত অথচ গভীর উক্তিটি স্মরণ করিবেন— এই আমার অনুরোধ।
তবে যিনি প্রত্যক্ষদৃষ্ট, এই স্থূল জগতের বাহিরে অন্য কোনো সূক্ষ্ম জগৎ, কিংবা ভূতপ্রেত কিংবা অন্য কোনো অশরীরী জীব কিংবা অপদেবতা-উপদেবতার অস্তিত্বে আদৌ বিশ্বাসবান নহেন, তিনি এ-গল্প না-হয় না-ই পড়িলেন।
ভূমিকা রাখিয়া এখানে গল্পটা বলি—
সেদিন হাতে কোনো কাজকর্ম ছিল না, সন্ধ্যার পূর্বে মাঠ হইতে ফুটবল খেলা দেখিয়া ধর্মতলা দিয়া ফিরিতেছিলাম। মোহনবাগান হারিয়া যাওয়াতে মনও প্রফুল্ল ছিল না; কী আর করি, ধর্মতলার মোড়ের কাছেই মটস লেনে (নম্বরটা মনে নাই, তবে বাড়িটা চিনি) তারানাথ জ্যোতিষীর বাড়ি গেলাম।
তারানাথ একাই ছিল। আমায় বলিল— এসো, এসো হে, দেখা নেই বহুকাল, কী ব্যাপার?
কিছুক্ষণ গল্পগুজবের পরে উঠিতে যাইতেছি, এমন সময়ে ঘোর বৃষ্টি নামিল। তারানাথ আমায় এ-অবস্থায় উঠিতে দিল না। আমি দেখিলাম বৃষ্টি হঠাৎ থামিবে না, তারানাথের বৈঠকখানায় বসিয়া আমরা দু-জনে। বৃষ্টির সময় মনে কেমন এক ধরনের নির্জনতার ভাব আসে— বৃষ্টি না থাকিলে মনে হয় শহরসুদ্ধ লোক বুঝি আমার ঘরে আসিয়া ভিড় করিবে, কেহ না আসিলেও মনের ভাব এইরূপ থাকে, কিন্তু বৃষ্টি নামিলে মনে হয় এ-বৃষ্টি মাথায় কেহ-ই আসিবে না। সুতরাং আমার ঘরে আমি একা। তারানাথের ঘরে বসিয়াও সেদিন মনে হইল আমরা দু-জন ছাড়া সারাকলিকাতা শহরে যেন কোথাও কোনো লোক নাই।
সুতরাং মনের ভাব বদলাইয়া গেল। এদিকে সন্ধ্যাও নামিল। জীবনের অদ্ভুত ধরনের অভিজ্ঞতার কাহিনি বলিবার ও শুনিবার প্রবৃত্তি উভয়েরই জাগিল। ঘোর বৃষ্টিমুখর আষাঢ়-সন্ধ্যায় আমরা মোহনবাগানের শোচনীয় পরাজয়, ল্যাংড়া আম অতিরিক্ত সস্তা হওয়ার ব্যাপার, চৌরঙ্গির মোড়ে ও-বেলাকার বাস-দুর্ঘটনা প্রভৃতি নানারূপ কথা বলিতে বলিতে হঠাৎ কোনো একসময় নারীপ্রেমের প্রসঙ্গে আসিয়া পড়িলাম।
তারানাথ বেশ বড়ো জ্যোতিষী ও তান্ত্রিক হইলেও শুকদেব যে নয় বা কোনো কালে ছিল না, এ-কথা পূর্বের গল্পটিতে বলিয়াছি। আশা করি তাহা আপনারা ভোলেন নাই। নারীর সঙ্গে সে যে বহু মেলামেশা করিয়াছে, এ-কথা বলাই বাহুল্য। সুতরাং তাহার মুখ হইতেই এ বিষয়ে কিছু রসাল অভিজ্ঞতার কথা শুনিব, এরূপ আশা করা আমার পক্ষে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল; কিন্তু তাহার পরিবর্তে সে এ-সম্বন্ধে যে অসাধারণ রকমের অভিজ্ঞতার কাহিনিটি বর্ণনা করিল, তাহার জন্য, সত্যই বলিতেছি, আদৌ প্রস্তুত ছিলাম না।
আর একটা কথা, তারানাথকে দেখিয়া বা তাহার মুখের কথা শুনিয়া আমার মনে হইয়াছিল একটা কী ঘোর দুঃখ মনে সে চাপিয়া রাখিয়াছে, অনেকবার তন্ত্রশাস্ত্রের কথাবার্তা বলিতে গিয়া কী যেন একটা বলি বলি করিয়াও বলে নাই; বুঝিলাম তারানাথের তান্ত্রিক জীবনের অনেক কাহিনিই সে আমার কাছে কেন, কাহারও কাছে বলে নাই, হয়তো সেগুলি ঠিক বলিবার কথাও নহে; কারণ সে-কথা বলা তাহার পক্ষে কষ্টকর স্মৃতির পুনরুদ্ধোধন করা মাত্র। তা ছাড়া আমার মনে হয়, লোককে সেসব গল্প বিশ্বাস করানোও শক্ত।
বলিলাম— জ্যোতিষী মহাশয়ের এ সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই অনেক আছে— কী বলেন—
তারানাথ বলিল— অভিজ্ঞতা একটাই আছে এবং সেটা বড়ো মারাত্মক রকমের অদ্ভুত। প্রেম কাকে বলে বুঝেছিলাম সেবার। এখন কিন্তু, সেটা স্বপ্ন বলে মনে হয়। শোনো তবে—
আমি বাধা দিয়া বলিলাম— কোনো ট্র্যাজিক
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments