একটি গানের জন্ম

গ্রীষ্মের একটা দিনে গির্জার ঘণ্টাগুলোর শোকার্ত ধ্বনির সহযোগে দুটি রমণী এইভাবে একটি গান রচনা করেছিল। আরজামাস-এর নির্জন এক রাস্তায়, সূর্যাস্তের পূর্ব মুহূর্তে, আমি যে বাড়িতে বাস করতাম তারই সামনের এক বেঞ্চিতে বসে। জুন মাসের একটা দিনের গুমোট নিস্তব্ধতার মধ্যে সারা শহর যেন ঝিমোচ্ছিল। জানলার ধারে একটা বই নিয়ে বসে আমি আমার প্রতিবেশী, গ্রামের প্রধানের পরিচারিকার সঙ্গে মোটাসোটা গোলগাল, মুখে বসন্তের দাগওয়ালা আমার রাঁধুনী উস্তিনাইয়ার মৃদু কন্ঠের কথপোকথন শুনছিলাম।

“আর কি লেখে তারা?” পুরুষালি কিন্তু অত্যন্ত নমনীয় কন্ঠে প্রশ্ন করলো সে। “নাঃ, আর কিছু নয়,” পরিচারিকাটি মৃদুকণ্ঠে, চিন্তান্বিত বিষণ্ণতার সঙ্গে টেনে টেনে উত্তর দিলো। মেয়েটির গায়ের রঙ অতটা উজ্জ্বল নয়, কৃশতনু, ছোট ছোট, স্থির সন্ত্রস্ত চোখদুটি।

“আর অতএব...আমাদের শুভেচ্ছা জেনো আর আমাদের টাকা পাঠিও—তাই নয় কি?”

“হ্যা তাই...।”

“আর তুমি কি ভাবে আছো—তাই নিয়ে কে আর মাথা ঘামায়? এ্যাঁ?” আমাদের রাস্তার পিছনের বাগানগুলোর পুকুরে ব্যাঙ ডাকছিল কাঁচের মতো অদ্ভুত একটা ঝনঝন শব্দ করে। গির্জার ঘন্টাগুলোর ধ্বনি বিরক্তিকর অবিচলতার সঙ্গে ভেসে আসছিল, গুমোট নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে। কোথায় কার পিছনের উঠোনে একটা করাত খ্যাঁস খাস শব্দ করছিল, মনে হচ্ছিল আমার প্রতিবেশীর পুরোনো বাড়িটা যেন ঘুমিয়ে পড়েছে, আর গরমে হাঁস ফাঁস করতে করতে নাসিকা ধ্বনি করছে।

“আত্মীয়স্বজন,” ক্রোধ মিশ্রিত বিষণ্ণ সুরে বললো উস্তিনাইয়া। “কিন্তু তাদের থেকে তিন ভেরসট (রুশীয় দৈর্ঘ্যের মাপ বিশেষ) দূরে গিয়েছো কি মনে হবে তুমি যেন একটা গাছ থেকে ভাঙা ছোট একটা ডাল। শহরে এসে প্রথম বছর আমারও তাই হয়েছিল। বাড়ির জন্য ভীষণ মন কেমন করছিল। মনে হচ্ছিল আমি যেন পুরোপুরি বেঁচে নেই; যেন আমার আধখানা রয়েছে এখানে আর আধখানা পড়ে রয়েছে গ্রামে। দিনরাত আমি ভাবতাম আর দুশ্চিন্তা করতাম: কেমন করে চলছে তাদের?”

গির্জার ঘণ্টাগুলো যেন তার কথাগুলোর সঙ্গে সঙ্গত করছিল, মনে হলো সে যেন ইচ্ছা করেই ঘন্টাগুলো যে স্বরগ্রামে বাজছে, তারই সঙ্গে সুর মিলিয়ে কথা বলছে। পরিচারিকাটি দুই হাত দিয়ে তার হাড় বার করা হাঁটু দুটো জড়িয়ে ধরে, তার সাদা রুমাল বাঁধা মাথাটা এপাশ থেকে ওপাশে নাড়ছিল আর ঠোঁট কামড়াচ্ছিল, মনে হচ্ছিল সে যেন একমনে অনেক দূরের কোনো কিছু শুনছে। উস্তিনাইযার ভবাট কণ্ঠ কখনো সম্পূর্ণ আর ক্রদ্ধ আবার কখনো কোমল আর বিষণ্ণ শোনাচ্ছিল।

“কখনো কখনো আমার গ্রামের জন্য এমন সাংঘাতিক মন কেমন করে যে আমার চারপাশে কি হচ্ছে তা দেখতেও পাইনা, শুনতেও পাইনা। অথচ সেখানে আমার কেউ নেই। বাড়িতে আগুন লাগলে বাবা পুড়ে মারা যায়। মদ খেয়ে মাতাল হয়ে ছিল তখন। আমার কাকা মারা গেছে কলেরায়। আমার দুই ভাই, একজন কিন্তু সৈন্যবাহিনীতেই রয়ে গেছে—কর্পোরাল হয়ে গেছে সে ; আর একজন রাজমিস্ত্রি, সে থাকে বয়গরোভত্র। মনে হয় তারা যেন সব বন্যায় ভেসে গেছে...।”

ভয়ঙ্কর রঙের সূর্য, পশ্চিমে অস্ত যেতে যেতে কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশের গায়ে সোনালি কিরণরেখাগুলোর থেকে ঝুলে রয়েছে। রমণীটির মৃদু কণ্ঠস্বর, ঘন্টাগুলোর ঢং ঢং শব্দ আর ব্যাঙগুলোর কাঁচের মত ঝনঝনে ডাকই শুধু সেই বিশেষ মুহূর্তটিতে শহরের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করছিল। আসন্ন বর্ষণের আগে স্যোয়ালো পাখিরা যেমন নিচু হয়ে মাটির ওপর দিয়ে হালকাভাবে উড়ে যায় ঠিক তেমনি করে তারা ভেসে চলছিল; তাদের ঊর্ধ্বে আর চতুর্দিকে মৃত্যুর মতো সর্বগ্রাসী নীরবতা বিরাজ করছিল।

একটা অদ্ভুত ধারণা আমার মাথায় ঢুকলো। মনে হলো শহরটাকে যেন কাত করে শোয়ানো বড় একটা বোতলের মধ্যে পুরে দিয়ে জলন্ত একটা ছিপি দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে আর কে যেন বাইরে থেকে তপ্ত কাঁচের ওপর অলসভাবে আস্তে আস্তে বাড়ি মারছে।

উস্তিনাইয়া

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice