চিত্রনাট্য সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
[ঋত্বিক ঘটক বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য নাম—যিনি শুধু পরিচালক নন, বরং চিন্তাশীল শিল্পী ও দার্শনিকও বটে। তাঁর প্রতিটি বক্তব্যে ফুটে ওঠে শিল্পের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা, সমাজের প্রতি তীব্র সংবেদনশীলতা এবং মাধ্যমের সীমা ও সম্ভাবনা নিয়ে নিরন্তর অনুসন্ধান। এই সাক্ষাৎকারে তিনি চিত্রনাট্য ও নাটকের মৌলিক পার্থক্য, সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরের জটিলতা, এবং শিল্পীর স্বাধীন সৃষ্টিশীলতার প্রশ্ন নিয়ে অকপটভাবে মত প্রকাশ করেছেন। পাঠকের কাছে এটি শুধু একটি সাক্ষাৎকার নয়, বরং চলচ্চিত্র ও শিল্পচর্চার অন্তর্নিহিত দর্শনকে নতুনভাবে ভাবার আহ্বান।—বাংলাপুরাণ]
প্রশ্ন: আপনার মতে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য ও নাটকের মধ্যে প্রকৃতিগত ও শৈলীগত পার্থক্য কতটুকু এবং কোথায়?
উত্তর: পার্থক্য অনেক। মূলত মাধ্যমের বি-সমতাই এই পার্থক্যগুলির জন্ম দিয়েছে। মঞ্চকে কোনো সময়েই তার মঞ্চত্ব অর্থাৎ staginess ঢাকার চেষ্টা করতে হয় না—চেষ্টা করেও খুব ফল হয় না। কিন্তু একটা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবের অনুভূতি (feeling of spontaneity) ছায়াছবি গোড়া থেকেই দর্শকের মনে এনে দেয়।
এই মূলগত পার্থক্য থেকে জন্ম নিয়েছে কী হয় কী হয় ভাব কাটানোর চেষ্টা অর্থাৎ avoidance of intrigue, তথাকথিত de-dramatization এবং গল্পাশ্রয়ী নয় এমন ছবির অতি আধুনিক অনুশীলন। এ-সমস্তই ছবি করিয়েদের মাথায় আসছে গোড়ার ঐ মাধ্যমগত সুযোগ এবং বাধা থেকে। বাধাটা হচ্ছে এই যে, এই স্বতঃস্ফূর্ততার কারণে নাটুকে ছবি ভেজাল বলে মনে হয়, অর্থাৎ stage-managed.
প্রকৃতি এবং শৈলী—ঐ দুটোই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আর বিভিন্ন দিকের মধ্যে না গিয়ে আমার যেটা মনে হয়েছে একেবারে গোড়ার কথা সেটাই ছোট্ট করে বলার চেষ্টা করব।
অবশ্য নাটকও আজকে ব্রেশট-এর হাতে পড়ে একটা মহাকাব্যিক পথ ধরেছে যার মধ্যে পশ্চিমী ঐতিহ্যের সঙ্গে অপূর্ব সমন্বয়ে এসে মিলেছে চীনে, জাপানি আর ভারতীয় জীবন্ত শিল্পগুলির তীব্র প্রভাব। তাই ব্রেশট অনেক এগিয়ে এসে ছায়াছবির বহু সুবিধেকে অঙ্গীভূত করে নিতে পেরেছেন। অথচ ছায়াছবির যেটা প্রধান দোষ—পল ভালেরির ভাষায় ছায়াছবি শুধু বাস্তবের ওপরের আস্তরণটাকেই আঁচড়াতে পারে—সেটা ব্রেশট সম্পূর্ণ বর্জন করতে পেরেছেন। ভালেরির সমালোচনার মধ্যে অনেকখানি সত্য আছে। ছায়াছবি সত্যই গভীর দার্শনিক উপলব্ধির প্রকাশকে কতখানি ধরতে পারে সে বিষয়ে চিন্তার অবকাশ আছে। একটা জায়গায় গিয়ে খেলো হয়ে যাবার একটা ব্যাপার ঘটে, এটা আমার মনে হয়েছে। শ্রেষ্ঠ সংগীতে তা ঘটে না ; শ্রেষ্ঠ আঁকা ছবিতে তা ঘটে না; শ্রেষ্ঠ নাটকেও তা ঘটে না।
কথাটাকে ভুল বোঝার সম্ভাবনা আছে, জানি। সমস্ত ব্যাপারটিকে গুছিয়ে বলতে গেলে অনেক লম্বা হয়ে পড়ার ভয় আছে। আমি মোটেই ইঙ্গিত করার চেষ্টা করছি না এমন ধরনের কোনো কথা যে পিরানদেল্লোর কর্মকাণ্ডের পর ‘রসোমন্’ কোনো নতুন খবর নিয়ে আসে নি। আমার বক্তব্য, যে-কোনো শিল্পকর্ম, যেটিকে বহুর সঙ্গে বহুর মধ্যে বসে উপভোগ করতে হয়, তার মধ্যে ব্রহ্মাণ্ডভাবনার কিছু কিছু দ্যোতনা সঞ্চারিত করে দেওয়া বড়োই কঠিন। নাটকও বহু লোক একসঙ্গে বসে উপভোগ করে বটে কিন্তু নাট্যকার জানেন মঞ্চের বাইরেও তাঁর লেখার একটা মূল্য আছে। এবং সব শ্রেষ্ঠ নাটকের সম্পূর্ণ রসাস্বাদনে একা বসে পড়াও একটা বিরাট অংশ গ্রহণ করে। কাজেই নাট্যকার তাঁর চিন্তায় এ-সম্ভাবনাকে ধরে নিয়ে এগোন। চিত্রনাট্যকার এরকম কোনো সম্ভাবনাই কল্পনা করার অবকাশ পান না।
আর-একটা কথাও আমি ভেবে দেখতে বলি। নাটক সম্পূর্ণ জাতীয়। দেশজ ভাষাই তারা বাহন। কিন্তু চিত্রনাট্য একটা উৎকট দ্বন্দ্বে সবসময় ভোগে। দেশজ পটভূমি ও ভাষা তার উপজীব্য হলেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সে ছড়িয়ে আছে। ফলে গভীরতম কথা বলতে হলে একটি ধারাবাহিক কালচার-কমপ্লেক্সের ওপর দাঁড়িয়ে আপনাকে বলতে হবে। সেই কনটেক্সটটা যাঁদের কাছে নেই তাঁরা কতদূর উপভোগ করবেন এই আশঙ্কায় অনেক সময় চিত্রনাট্যকারকে সস্তায় কিস্তিমাৎ-এর দিকে এগোতে হয়। সারা ভারতবর্ষের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments