-
তোরা: চুগতাই বা তুর্কী শব্দ। কার্যপ্রণালী, আইন এবং পদ্ধতি অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু ঢাকায় তোরাবন্দীর ভোজ বলতে সেই খাদ্য পরিবেশনকে বুঝাত যা সম্ভ্রান্ত বা অভিজাতদের বাড়িতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে প্রচলিত ছিল। এই তোরাবন্দীতে বিশেষ শৃঙ্খলা এবং বিশেষ নিয়মে খাঞ্চা বণ্টন করা হতো। আমি যে সময়ে বুঝতে শিখেছি তখন তোরাবন্দীর আহার্য পরিবেশন শেষ হয়ে গিয়েছিল। তোরাবন্দীর গঠন-আকৃতি এই শুনেছি যে, একটি বড় খাঞ্চায় (কান্তি) অথবা কয়েকটি খাঞ্চার মধ্যে মাটির পেয়ালায় এবং পেয়ালা-পাত্রসমূহে খাবার লাল বানাতে (মোটা পশমী কাপড়ের খানপোষে) ঢেকে অতিথিদের বাড়িতে পাঠানো হ'তো। ঐ সকল খাঞ্চায় চার ধরনের রুটি, চার ধরনের চাউল (ভাত), চার ধরনের রুটি-খাদ্য, চার প্রকারের কাবাব, চার
-
সকালে একটি নিগ্রো খচ্চরটাকে খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিল বড় কুঠিতে। যাওয়ার পথে কর্নেল হেনরি ম্যাকস্ওয়েলকে ব্যাপারটা জানিয়ে এল। তারপর কর্নেল হেনরি ফোন করলেন শেরিফকে। শেরিফ ঝটপট জিমকে শহরে পাকড়াও করে আনলেন। তারপর তাকে গারদে আটকে বাড়ী চলে গেলেন শেরিফ এবং গিয়ে সকালের খানা খেতে বসলেন।
শার্টের বোতাম আঁটতে আঁটতে জিম শূন্য গারদখানার চারদিকে ঘুরে বেড়ালো কিছুক্ষণ। তারপর এসে বসল বিছানায়। জুতোর ফিতে বাঁধল বসে বসে। সবটা এমন তাড়াতাড়ি ঘটে গেল সেদিন সকালে যে এক গ্লাস জল খাওয়ারও সময় পায় নি জিম। উঠে সে দরোজার কাছে রাখা জলের বালতীটার কাছে গেল। কিন্তু শেরিফ ভুলে গেছে বালতীতে জল রাখতে।
ইতিমধ্যে জেলের প্রাঙ্গনে এসে
-
এটা বাস্তব যে মুসলমানদের আগমনের পূর্বে এখানকার বাসিন্দারা আজকের মতোই খালি মাথায় থাকত। মুসলমানগণ যখন এখানে আগমন করেন তখন তারা পাগড়ি বেঁধে আসেন এবং আজও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। কেননা এখানে যারা পশ্চিম থেকে আসেন, তারা পাগড়ি পরিধান করেই আসেন। অর্থ এই যে, ইরান, ইরাক, আফগানিস্তান সবই পাগড়ি পরিহিত দেশ এবং আগমনকারীরা ঐ দিক থেকেই এসে থাকেন। অতঃপর ইসলাম ধর্মে পাগড়ির সম্মান রক্ষিত হয়েছে এবং ইমামতির জন্য পাগড়ি আবশ্যক করা হয়েছে।' এখানে (ঢাকাতে) দরবেশদের বংশ ছিল এবং তাঁরাও সর্বদা পাগড়ি ব্যবহার করতেন। সুতরাং ঢাকার বিখ্যাত খানকাসমূহ, মগবাজার এবং আজিমপুরের বুজর্গদের যে সব ছবি দেখা গেছে সবাইকেই এক বিশেষ ধরনের পাগড়ি
-
বাংলা তার মিষ্টির জন্য সব সময়ই প্রসিদ্ধ। কিন্তু ঢাকার এই বিশিষ্টতা রয়েছে যে, এখানে বাঙালি এবং অবাঙালি উভয় প্রকারের মিষ্টি উত্তম তৈরি হয়। আমাদের বাল্যকালে আমরা দেখেছি যে, এখানে স্থানীয় হিন্দু মিষ্টি-তৈরিকারকরাই শুধু মিষ্টি বিক্রি করত এবং এক দুই ঘর মুসলিম মিঠাই প্রস্তুতকারকও ছিল। কিন্তু এদের মিষ্টি প্রস্তুতকারক কমই বলা হতো, বেশিরভাগ এদের মোরব্বাওলা বলা হতো। এরা মোগল যুগের স্মৃতিচিহ্ন এবং দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও এদের শিরায় উত্তর ভারতের রক্তের সুস্পষ্টতা আজও দেখা যায়। এসব মুসলিম মিষ্টান্ন বিক্রেতা, মিষ্টির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের লাড্ডু এবং বাদামের বিভিন্ন মিষ্টি তৈরি করে থাকে এবং ফেরি করে বিক্রি করে, খাঞ্চা সাজায় এবং একই সঙ্গে
-
শুভ স্মরণ। ঢাকা আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পূর্বে কেমন ছিল? এখানকার জনসাধারণের সমাজ কি ছিল, সভ্যতা সংস্কৃতির অবস্থা কী রূপ ছিল, শিক্ষা-দীক্ষার স্বরূপই বা কেমন ছিল? কোন্ কোন্ বিদ্যা ও শিল্পকলার অনুশীলন হতো? কী ধরনের বসবাস ছিল? সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লোকেরা কি করত? বিয়ে-শাদীতে কী কী আনুষ্ঠানিকতার প্রচলন ছিল? দুঃখ-শোক কিভাবে পালন করা হতো? মেলা-পার্বণে কি হতো? নিমন্ত্রণে কী ধরনের বাড়াবাড়ি ছিল? এখানকার প্রতিভাবান এবং শৌখিন অধিবাসীরা পোশাক পরিচ্ছদে কী কী কাটছাট সৃষ্টি করেছিল? ঢাকা নিজস্ব কোন্ শিল্পজাত দ্রব্যের জন্য সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত ছিল? অর্থাৎ সেই ঢাকা যা হিন্দুস্থানে প্রাচ্য তাহজীব তমদ্দুনের সর্বশেষ লালন ক্ষেত্র ছিল এবং এক পর্যায়
-
ঢাকার খেলাধুলা
আজ থেকে পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে ঢাকাবাসীরা যে সকল খেলাধূলা', আমোদ-প্রোমদে লিপ্ত ছিল বর্তমানে তাতে বিরাট পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। কিছু বিলুপ্ত হয়েছে এবং কিছু বিলুপ্তির পথে। এদের সংখ্যা অনেক। সময়ে যতটা কুলাবে বর্ণনা করব।
এখানে 'মোরগ লড়াই' এর শখ খুবই জনপ্রিয় ছিল। শহরের আরমেনীয় এবং মুসলমান ধনাঢ্য ব্যক্তিরা এর পৃষ্ঠপোষকতা করতেন এবং এটিকে 'শাহী' শখ বলা হতো। শুধু শুনেছি তাই নয় ছবিতেও দেখেছি, কোম্পানি আমলের ফিরিংগি শাসকরাও জমায়েতের মধ্যে উপস্থিত থেকেছেন এবং মোরগ লড়াই করেছেন। আমাদের বাল্যকালে এই শখ পূর্ণতার পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং এর যৌবন গত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তবুও মোরগ লড়াইএর জমায়েত অব্যাহত ছিল এবং মুন্সী গোলাম মাওলা
-
প্রাচীনকাল থেকেই পান হিন্দুস্থানের শোভা এবং নামসমূহের মধ্যে 'বাংলা পান', বাংলার বিশিষ্টতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলা পান যদিও বড় হয় এবং একটা পানেই গাল ভরে যায় কিন্তু তাতে কোনো সৌন্দর্য নেই এবং এই পানের ঝাঁঝ কোনো কোনো ঋতুতে অসহনীয় হয়ে যায়। পানের একটি প্রকার যাকে সাঁচি পান বলা হয় এটি অবশ্য নরম, ঝাঁঝ কম এবং স্বাদের দিক থেকেও ভাল, কিছুটা হলেও সুগন্ধি আছে। বাংলায় সর্বত্রই কম বেশি সাঁচি পান পাওয়া যায় এবং বিশিষ্ট লোকেরা এটিকে ব্যবহার করেন। এ কারণেই এখানকার একটি বাজারের নাম 'সাঁচি পান দরীবা", যা এখন বাজার নেই বরং মহল্লা হয়ে গেছে। এই পানের প্রকৃতি ঠাণ্ডা, এজন্য
-
বাংলায় সাধারণভাবে এবং ঢাকাতে বিশেষভাবে তবলার পৃষ্ঠপোষকতার শখ সার্বজনীন। এর বড় কারণ এই যে, এখানে হিন্দুস্থানের প্রসিদ্ধ তবলাবাদকরা সব সময়েই আসা-যাওয়া করতেন এবং এখানকার বিত্তবান সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ তবলা বাজানোতে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। ওয়াজেদ আলী শাহ্' বিশেষ তবলাবাদক হোসাইন বখশের পুত্র আতা হোসাইনও বাবার মতো তবলাবাদনে বিখ্যাত ছিলেন এবং বলা হয়ে থাকে তার বাজানোতে এতই নৈপুণ্য ছিল যে লোকেরা শুধুমাত্র তবলা শ্রবণ করেই মুগ্ধ হয়ে যেত। আতা হোসেইন দীর্ঘদিন ঢাকায় থেকেছেন এবং এখানকার শাসক শ্রেণির লোকেরা (আমিরগণ) তাঁর সম্মান করতেন। স্থানীয় তবলা বাদক ছিলেন খয়রাতী জমাদার, ইনি প্রকৃতপক্ষে মাহুতদের জমাদার ছিলেন কিন্তু এই বিদ্যায় তার পূর্ণতা ছিল। দুনী খান যিনি
-
বাংলার প্রথম মোগল গভর্নর ইসলাম খান', যাঁকে ঢাকার পুনরুজ্জীবিত আবাদীর প্রতিষ্ঠাতা মনে করা হয়, তিনি এখানে মাত্র ৫ বৎসর ৩ সপ্তাহ ১৯ দিন বসবাস করেন এবং তাঁর পুরা শাসনকাল অধিকাংশই যুদ্ধ বিগ্রহের ব্যবস্থাপনায় অতিবাহিত হয়েছে। মিস্টার শার্লীমেন তাঁর বাংলার ইতিহাস গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, ইসলাম খানের দরবারে বার শত 'কাঞ্চনী", নর্তকী চাকরিরত ছিল, যাদের পেশা ছিল নাচ-গান। এর থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম খানের ঢাকায় আগমনের পূর্বেই ঢাকা যথেষ্টভাবে জন অধ্যুষিত ছিল এবং এখানে গান বাজনার প্রচুর চর্চা ছিল, অন্যথায় হঠাৎ করেই অথবা এত কম সময়ের মধ্যে বার শত কাঞ্চনী কোথা থেকে আগমন করবে? ইবনে বতুতার কাছ থেকেও এর সত্যতা
-
বাংলার প্রাচীন রাজধানী যদিও মুনিম খান খান খানানের সময়ে এমনভাবে বিরান হয় যে হুমায়ুনের শখের এই জান্নাতাবাদ' একেবারেই ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয় এবং পরে আর কখনই এ স্থান জনবসতির মুখ দেখে নাই। সোনারগাঁ' কিছু দিনের জন্য পূর্ব বাংলার রাজধানী ছিল কিন্তু আজ সেটিও একটি গ্রাম বা মামুলি ছোট শহরের (কসবা) বেশি নয়। পাঠান শাসনামলে তাণ্ডা, ফতেহাবাদ, সাতগাঁ ইত্যাদি স্থানে রাজধানী, টাকশাল স্থাপিত হতে থাকে কিন্তু আজ এগুলির নাম নিশানা নেই বরং কিছু কিছু স্থানের অবস্থান নির্ধারণ করাও যায় না। কিন্তু ঢাকার এই আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য যে প্রত্যেক আমলে ও যুগে ঢাকা জাঁকজমক ও আড়ম্বরপূর্ণ এবং স্বপরিচয়ে টিকে ছিল। অবশেষে মুর্শিদকুলী খান
-
সুবহে কাযেবের' আভাস দৃশ্যমান হওয়া শুরু হয়েছে আর দেখুন রুটি বিক্রেতারা তন্দুরে আগুন জ্বেলে দিয়েছে এবং অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত হওয়া শুরু করেছে। ঢাকায় পূর্বে ঘরে ঘরে ঘড়ি ছিল না। এজন্য চক থেকে দুধ এবং দুধের সর বিক্রেতাদের দোকান উঠে যাওয়া রাত বারোটা বাজার সুনির্দিষ্ট চিহ্ন মনে করা হতো এবং ভোর হবার নিশ্চিত পরিচয় ছিল তন্দুরের অগ্নি প্রজ্বলন। শীত হোক অথবা বর্ষা, এই দুই পেশার লোকেরা নিজেদের অভ্যাসে এত দৃঢ় এবং মজবুত ছিল যে তাদের কার্যকলাপ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতো। সমগ্র বাংলার মধ্যে ঢাকার এই আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং যদিও বাংলার সাধারণ খাদ্য চাউল অর্থাৎ ভাত, কিন্তু ঢাকায় সাধারণভাবে বাজারসমূহে এত ধরনের
-
প্রথম আলোচনাতেই যেমন আমি বলেছি যে, ঢাকার বর্তমান মুসলিম বাসিন্দাদের সংস্কৃতিবান অংশ মোগল যুগের স্মৃতিবাহী। আজ তার উপর এতটুকু সংযোজন করছি যে, এখানে মোগল যুগেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আর্মেনীয়দের বসবাস ছিল এবং সকলেই ধনী সওদাগর ছিলেন। শেষের দিকে তারা বড় বড় জমিদারী কিনে নিয়েছিলেন। এজন্য ঢাকার খাবার দাবারে আরমেনীয় খাবারের অন্তর্ভুক্ত হওয়াটা প্রকৃতি বিরুদ্ধ নয়। অর্থাৎ এখানে কিছু প্রাচীনতম খাবার রয়েছে, কিছু ইরানি খাবার, কিছু আরমেনীয় খাবার আছে এবং কিছু ঢাকার সুন্দর রুচির উদ্ভাবন।
মিস্টার পিটার-এর ভাষায় পৃথিবীর প্রত্যেক অঞ্চলের মুসলমানদের রুচি হচ্ছে মিশ্রিত কাবাব এবং পোলাও। পোলাও দু'ভাবে রান্না হয়। সহজ পদ্ধতি হচ্ছে 'পাশানো', প্রথম চাউল সিদ্ধ করে নেয়া হয়,
ক্যাটাগরি
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.