ঢাকায় টুপির কাহিনী
এটা বাস্তব যে মুসলমানদের আগমনের পূর্বে এখানকার বাসিন্দারা আজকের মতোই খালি মাথায় থাকত। মুসলমানগণ যখন এখানে আগমন করেন তখন তারা পাগড়ি বেঁধে আসেন এবং আজও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। কেননা এখানে যারা পশ্চিম থেকে আসেন, তারা পাগড়ি পরিধান করেই আসেন। অর্থ এই যে, ইরান, ইরাক, আফগানিস্তান সবই পাগড়ি পরিহিত দেশ এবং আগমনকারীরা ঐ দিক থেকেই এসে থাকেন। অতঃপর ইসলাম ধর্মে পাগড়ির সম্মান রক্ষিত হয়েছে এবং ইমামতির জন্য পাগড়ি আবশ্যক করা হয়েছে।' এখানে (ঢাকাতে) দরবেশদের বংশ ছিল এবং তাঁরাও সর্বদা পাগড়ি ব্যবহার করতেন। সুতরাং ঢাকার বিখ্যাত খানকাসমূহ, মগবাজার এবং আজিমপুরের বুজর্গদের যে সব ছবি দেখা গেছে সবাইকেই এক বিশেষ ধরনের পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় দেখা গেছে, যাকে 'শরয়ী পাগড়ি' বলা হয়। ড. ওয়াইজ লিখেছেন যে, মাদারীয়া ফকিররা পর্যন্ত কালো পাগড়ি পরিধান করে বের হতো। যাহোক, এ তো গেল সংক্ষিপ্ত ভূমিকার কথা। আমার বলার কথা এই যে, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পূর্বে হিন্দু এবং মুসলমানদের মস্তক আবরণ কি ছিল?
সেই সব হিন্দু মহোদয় যাদের বাপ-দাদা উত্তর ভারত (আপার ইন্ডিয়া) থেকে এসেছিলেন তারা সাধারণভাবে টুপি ব্যবহার করতেন। কিন্তু গ্রীষ্মকালে দোপাল্লা টুপি এবং শীতকালে শালের এক ধরনের কিস্তি জাতীয় টুপি (কাপড়ের) জমিনের সম রঙের 'কীত' এর কাজ করা, ব্যবহার করতেন এবং বাঙালি হিন্দুরাও তাদের অনুসরণ করত অথবা ইংরেজি নাইট ক্যাপ সকালে ব্যবহার করত। কিন্তু সব সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, কী হিন্দু কী মুসলমান যখন দরবার বা অনুষ্ঠানে যেতেন তখন 'বাঁধা পাগড়ি' মাথায় পরিধান করে যেতেন অথবা 'শামলা" পরিধান করে যেতেন। কিন্তু মুসলমানেরা সাধারণভাবে পাগড়ি নিজেরাই বাঁধতেন। আমি দেখেছি যে, হিন্দু অভিজাতগণ নিজেদের বাড়ির সাধারণ অনুষ্ঠানেও কালো মখমলের গোল টুপি ব্যবহার করতেন এবং খালি মস্তকে থাকা অশোভনীয় মনে করতেন। শামলা পরিধানের প্রচলন উকিলদের মধ্যেও বর্তমানে কম হতে যাচ্ছে কিন্তু আজ থেকে তিরিশ বছর পূর্ব পর্যন্ত শামলাহীন কোনো উকিল দেখা যেত না। এখন শামলার স্থানটি ইংরেজি টুপি (হ্যাট) দখল করে নিয়েছে। যদিও গাউন পূর্বের মতো রয়েছে। আর যে সমস্ত পেশাজীবী হিন্দুরা বাইরে থেকে এসে এখানে বসবাস করছে যেমন কুমোর, ধোপা, গোয়ালা; তারাও কখনও সম্মানী ব্যক্তিদের সামনে টুপি না পরে যেত না। তাঁরা শুধুমাত্র সাদা (অলঙ্করণহীন) দোপাল্লা অথবা লক্ষ্মৌই টুপি অথবা জামদানির কাজযুক্ত টুপিই ব্যবহার করতো।
এখানকার মুসলমানদের মধ্যে কয়েক ধরনের পাগড়ির প্রচল ছিল। এক শরয়ী পাগড়ি, (এটি এখনো লাখনুর মুজতাহিদীনদের [ইসলামী জ্ঞানে সুপণ্ডিত] মধ্যে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়) যা সাধারণত কালো, সবুজ অথবা কাশীদার (এক ধরনের সূচীকর্মের) হতো। এক ধরনের পাগড়ি ছিল, 'বাঁকী পাগড়ি', যার ডান দিকে বিশেষ ভাবে বাঁক হতো, সাধারণভাবে রঙিন মসলিনের অথবা বানারসী এক ধরনের কাপড়ের হতো, এগুলি টুপি ছাড়াই খালি মাথায় বাঁধা হতো। আমাদের বাল্যকালে শহরে শাহজাদা মিয়া মরহুমের বাঁকী পাগড়ির খুবই প্রসিদ্ধি ছিল। 'মিন্ডাসা', যদিও সব পাগড়িকেই বলা চলে কিন্তু লাঠিয়াল এবং পাহলোয়ান ও ফাকিতরা (তরবারী খেলোয়াড়দের ফাকিত বলে) এই পাগড়ি ব্যবহার করত, যা কম চওড়ার, বার চৌদ্দ হাত লম্বা পরিমাপের হতো, এবং এতে সৌন্দর্য বা হৃদয়গ্রাহীতা ইত্যাদির কোন লক্ষ্য রাখা হতো না। এটি মাথার চতুর্দিকে এমন ভাবে পেঁচিয়ে নেওয়া হতো যেন আঘাত থেকে মাথা বেঁচে যায়, একে মিন্ডাসা বলা হয়। এটিও সাধারণভাবে মসলিনের হতো কিন্তু রঙ করা এবং অধিকাংশ লাল অথবা হলুদ রঙের হতো। এটি অধিকাংশ দশহরার দিন শহরের মুসলমান এবং হিন্দু আখড়াসমূহের সকল 'খলিফা' ব্যবহার করত। পাগড়ি এখনও মুসলমানদের মধ্যে বিবাহ-শাদি, খাতনা এবং বিসমিল্লাহ পড়ানোর জন্য অপরিহার্য এবং একটি ধর্মীয় বিধির মতোই
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments