ঢাকার বিশেষ খাবার
প্রথম আলোচনাতেই যেমন আমি বলেছি যে, ঢাকার বর্তমান মুসলিম বাসিন্দাদের সংস্কৃতিবান অংশ মোগল যুগের স্মৃতিবাহী। আজ তার উপর এতটুকু সংযোজন করছি যে, এখানে মোগল যুগেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আর্মেনীয়দের বসবাস ছিল এবং সকলেই ধনী সওদাগর ছিলেন। শেষের দিকে তারা বড় বড় জমিদারী কিনে নিয়েছিলেন। এজন্য ঢাকার খাবার দাবারে আরমেনীয় খাবারের অন্তর্ভুক্ত হওয়াটা প্রকৃতি বিরুদ্ধ নয়। অর্থাৎ এখানে কিছু প্রাচীনতম খাবার রয়েছে, কিছু ইরানি খাবার, কিছু আরমেনীয় খাবার আছে এবং কিছু ঢাকার সুন্দর রুচির উদ্ভাবন।
মিস্টার পিটার-এর ভাষায় পৃথিবীর প্রত্যেক অঞ্চলের মুসলমানদের রুচি হচ্ছে মিশ্রিত কাবাব এবং পোলাও। পোলাও দু'ভাবে রান্না হয়। সহজ পদ্ধতি হচ্ছে 'পাশানো', প্রথম চাউল সিদ্ধ করে নেয়া হয়, যখন সামান্য সিদ্ধ বাকি থাকে তখন দরকারি মশলা-পাতি দিয়ে দমে বসান হয়। এই নিয়ম সমস্ত ভূভারতে কম বেশি প্রচলিত আছে। অন্য পদ্ধতি যেখানে বিদ্যা এবং কৌশলের প্রয়োজন পড়ে, যাকে এখানে "লেপিটা” বলে অর্থাৎ পোলাও তার প্রকৃতরূপেই পোলাও হয়ে থাকে। ঢাকাবাসী চাল সিদ্ধ করে নিয়ে পোলাও তৈরি পদ্ধতি পছন্দ করে না। আগে এটি খুবই ত্রুটিপূর্ণ মনে করা হতো কিন্তু আজও ঢাকার বিশিষ্ট পোলাও চাল সিদ্ধ করা পদ্ধতির নয়, আর যে বাবুর্চি এটা করতে চায় তাকে বাবুর্চি হিসাবেই গণ্য করা হয় না। যাহোক ঢাকার বিশিষ্ট পোলাও হচ্ছে 'খাচ্ছা' পোলাও, যাতে মুরগির গোস্ত দেয়া হয় এবং মুরগির গোস্তের টুকরা আস্ত রাখা হয় না। এর পরিচয় এই যে, গোন্ত মিশ্রিত থাকা সত্ত্বেও পৃথক দেখা যাবে। ঘি এত হবে না যে, চাউল ঘি শুষে নিয়ে আবার বের করে দেয় এবং প্রত্যেক চালের পেট ঘিতে পূর্ণ থাকবে। এরূপ মোরগ পোলাও ঢাকা ছাড়া কোথাও রান্না হয় না এবং ঢাকাবাসী ছাড়া এটা কেউ রান্নাও করে না। অন্যান্য শহরে যাকে মোরগ পোলাও বলে তার সঙ্গে এর কোনো তুলনাই চলে না। অন্যান্য শহরে যে সকল পোলাও রান্না হয় সে সবই এখানে তৈরি হয়, কিন্তু 'খাচ্ছা' যাকে এখন মোরগ পোলাও বলে, এখানকার বিশিষ্ট জিনিস। কিন্তু এটা ছাড়া ঢাকাবাসীরা নিজেদের বাড়িতে এবং ছোট এবং মাঝারি দাওয়াতে সাধারণত বুন্দিয়া পোলাও, মাছ পোলাও, ডিম পোলাও অবশ্যই রান্না করে থাকেন। কেননা সেগুলিও ঢাকাবাসীর আন্তরিক পছন্দের পোলাও। বুন্দিয়া পোলাও এ এই আধিক্য হতো যে, গোস্তের মটরদানা পরিমাণের কোফতা কিছু নোন্তা এবং কিছু টক-মিষ্টিযুক্ত দমে দেয়ার সময় এমন পরিমাণে প্রয়োগ করা হতো যেন প্রত্যেক গ্রাসে কয়েকটি কোস্তা এসে যায়। কিন্তু অধিকাংশ নোন্তা হতো। বর্তমানে এতে এই বৃদ্ধি ঘটেছে যে, কাঁচা সবুজ মটরদানা দেয়া হয়, এটি দেখতেও খুব সুন্দর লাগে। এই পোলাও এর পরিচয় এই যে, কোস্তা শক্ত হবে না এবং ভঙ্গুর ও মোলায়েম হবে। মাছ পোলাও এর মধ্যে রুই এবং ইলিশ মাছের পোলাও রান্না হতো। রুই মাছের পোলাও খুবই সুস্বাদু হয় এবং রান্না করার জন্য অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। কিন্তু ইলিশ পোলাও যেভাবে রান্না হয় তাতে কোনো অভিজ্ঞতা বা বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের প্রয়োজন নেই। একজন রুচিশীল ব্যক্তি ইলিশ পোলাও বুন্দিয়া পোলাওয়ের পদ্ধতিতে তৈরি করেছিলেন, এতে করে প্রকৃতই শুধুমাত্র নতুনত্ব এবং অসাধারণই হয়নি বরং মাছ পোলাওয়ের একটি উত্তম ধরনও উদ্ভাবিত হয়ে গেছে এবং স্বাদও দ্বিগুণ হয়ে গেছে কিন্তু খরচ এবং কষ্ট অনেক বেড়ে গেছে।
তেহারি প্রাচীন পোলাও, মশলাদার গোস্ত এবং চাউল একই সঙ্গে দমে দেয়া হয়। লোকেরা এটিকে একেবারে ভুলে গিয়েছিল কিন্তু এখন পুনরায় এটি নবজীবন লাভ করেছে এবং খুব ব্যাপকভাবে চলছে এবং এখন সকাল সকাল প্রত্যেক গলিতে ফেরিওলা গরম গরম তেহারি বিক্রি করে ঢাকাবাসীদের পোলাও খাবার স্বাদ আস্বাদনের সান্ত্বনা যোগাচ্ছে।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments