-
মানুষের আচরণে অসংগতি-অশোভনতার অন্ত নেই, এই বিচিত্র অসংগতির প্রতিক্রিয়ায় আমাদের মনে যে বিরক্তি ক্রোধ প্রভৃতি আবেগের উদয় হয় তারও অন্ত নেই। এই আবেগগুলি নির্ভর করে দ্রষ্টার মানসিক অবস্থা কিংবা মননভঙ্গির উপরে। এসব আবেগের মধ্যে একমাত্র কৌতুকানুভূতিই আমাদের পক্ষে বিশেষভাবে প্রীতিকর। তাই স্বভাবতই এই কৌতুকবোধকে সাহিত্যের উপজীব্য বলে স্বীকার করা হয়েছে। এই কৌতুককে আশ্রয় করে যে সাহিত্যরসের উদ্ভব হয় তারই নাম হাস্যরস। ভারতীয় আলংকারিকদের মতে হাস্যরসসৃষ্টি সাহিত্যরচনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এবং সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাসের আদিপর্ব থেকেই হাস্যরস সৃষ্টির প্রয়াস দেখা যায়। সংস্কৃত সাহিত্যে যে হাস্যরসের সাক্ষাৎ পাই এবং অলংকারশাস্ত্রে যার বর্ণনা দেখা যায়, মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্যে তারই অনুবর্তন চলে। উনবিংশ শতকের মধ্যভাগ
-
বৈশাখ মাস এলেই অনিবার্যভাবে রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ বৈশাখের রুদ্র রূপ দেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এক রুদ্র রূপের মধ্য দিয়ে বৈশাখকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বৈশাখ আসে মানুষের জীবনের সমস্ত জীর্ণতাকে উড়িয়ে নিতে। জীর্ণতা, অসদ্ভাব, অকল্যাণ এবং যে নির্যাতন মানুষের জীবনের মধ্যে প্রত্যহ গড়ে উঠেছে, সে নির্যাতন এবং অসদ্ভাবের বিরুদ্ধেই বৈশাখ তার কল্লোলিত রূপ নিয়ে আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়। সে কারণেই তিনি বলেছেন, যে রুদ্র বৈশাখ এখন এলো তার সঙ্গে আমি যদি সামঞ্জস্য বিধান নাও করতে পারি তাহলে আমাকে পথের এক প্রান্তে রেখে দাও, দাঁড়িয়ে আমি সমস্ত পৃথিবীর মানুষের চলাচল দেখবো, সমস্ত মানুষ যে পথে অনবরত অগ্রসর হচ্ছে, দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে
-
বাংলাদেশ ছিল নদীমাতৃক। নদী ছিল বাংলার জীবনযাত্রার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু আজ যে-টুকু বাংলা আমাদের, সে বাংলা তেমন নদীবহুল নয়। যে-অংশ নদীবহুল এবং নদীর খেয়ালখুশীর সঙ্গে যে অংশের মানুষের জীবনযাত্রা একসূত্রে বাঁধা সে অংশ আজ আমাদের কাছে বিদেশ। অদৃষ্টের এ পরিহাস রবীন্দ্রনাথের কাছে ভয়ানক দুঃখের কারণ হত।
প্রকৃতি রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্ট করেছিল। সেদিক থেকে তিনি ওয়ার্ডসওয়ার্থের সগোত্র ছিলেন। কিন্তু প্রকৃতির বিভিন্ন প্রকাশের মধ্যে নদী কবিকে বোধহয় সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ ক’রেছিল। তাই কবি নদীর কাছে সময়ে অসময়ে ছুটে গেছেন। তাই তিনি নদীর বুকে নৌকাতে ভাসতে এত ভালবাসতেন। নদীর তরুণীসুলভ চাপল্য এবং গতি কবির চিরতরুণমনে গভীর দাগ কেটেছিল। তাছাড়া সংসারের কোলাহল থেকে মুক্তি
-
এই বইখানির নাম যদি দেওয়া হত 'রবীন্দ্রনাথের ভারতচিন্তা', তা হলেও অসংগত হত না। কারণ এই গ্রন্থে যে প্রবন্ধগুলি সংকলিত হল তার প্রায় সবগুলিই রবীন্দ্রনাথের ভারতচিন্তা-বিষয়ক। কিন্তু তাঁর ভারতচিন্তা চিন্তামাত্রই নয়। তাতে প্রেরণা আছে, পথের নির্দেশও আছে। যে পথের নির্দেশ পাওয়া যায় তাঁর ভারতচিন্তায়, তাকে তিনি নিজেই বলেছেন 'ভারতপথ'। তিনি নিজেও ছিলেন সে পথের পথিক, আর তাঁর স্বজাতিকেও সে পথে প্রেরণা দেবার সাধনাই করে গিয়েছেন সারাজীবন। তাই বইটির নাম দেওয়া গেল 'ভারতপথিক রবীন্দ্রনাথ'। দৃশ্যতঃ প্রথম প্রবন্ধের নাম-অনুসারেই গ্রন্থের নামকরণ হয়েছে। কিন্তু ভেবে দেখলে বোঝা যাবে, সর-প্রবন্ধেরই মূলে রয়েছে ওই একই কথা।
রবীন্দ্রনাথের ভারতচিন্তার দুটি প্রধান দিক্। এক দিকে ভারতসত্তার মহাভাষ্য, অপর
-
রবীন্দ্রসাহিত্য বিরাট মহাসাগরের মতো। তার কোথায় কি আছে, কোথায় কত গভীরতা এসব নির্ণয় করা যেমন-তেমন কথা নয়। রবীন্দ্রনাথের কোনো এক কবিতায় তিনি তাঁর অনবদ্য ভঙ্গিতে অজানা বন্ধুকে যা বলেছিলেন, তার মর্মার্থ অনেকটা এই : হে বন্ধু, লোকে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, তোমাকে চিনি কিনা? আমি গর্ব করে বলি ‘হ্যাঁ চিনি।’ কিন্তু তারা যখন জিজ্ঞাসা করে তুমি কেমন? তখন কি যে বলবো, বুঝতে পারিনে ; কেবল বলি কি জানি? তারা তখন বিদ্রূপের হাসি হেসে চলে যায়। দেখ, আমি যে তোমাকে একেবারে চিনিনে তাই বা কেমন করে বলি? কত সকাল-সন্ধ্যা-দুপুরে আভাসে-ইঙ্গিতে হৃদয়ে তোমার স্পর্শ পেয়েছি, অভিভূত হয়েছি, কিন্তু নিশ্চয় করে ত কিছুই বলতে
-
সতেরো বছর বয়সে প্রথম ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের “য়ূরোপ-প্রবাসীর পত্র” প্রকাশিত হয় ১৮৮১ সালে—বলা হয় সেই থেকে তাঁর ভ্রমণ সাহিত্যের শুরু। লক্ষণীয় কোনো উপন্যাস রচনার আগেই রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা এক নাতিদীর্ঘ গ্রন্থে প্রকাশিত হয়—আরো দুবছর পর অর্থাৎ ১৮৮৩ সালে বেরোয় ‘বৌঠাকুরাণীর হাট’। কিন্তু যে সরল ও প্রাঞ্জল গদ্য ঐ সতেরো বছরের রবীন্দ্রনাথের হাত থেকে বেরিয়েছিল, তৎকালীন প্রচলিত গদ্যের মাপে শুধু হয়, আধুনিকতার যে কোনো মাপকাঠিতেই তা উৎকর্ষের একটি অনতিক্রম্য স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের ও গদ্য ভাষার যে ফর্মটি দেখা যায় তা “য়ূরোপ প্রবাসীর” গদ্যে প্রচ্ছন্ন, এবং বোধ করি তা থেকে উদ্ভূত। বস্তুত গদ্যশিল্পী রবীন্দ্রনাথকে সম্যকরূপে উপলব্ধি করতে হলে
-
নদী কিংবা প্রবহমান জলধারাকে নানারূপে ও প্রতীকে তুলে ধরার চেষ্টা বাংলাসাহিত্যে এক ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্য। কবিতা, গান, ছোটগল্প ও উপন্যাসে একাধিক লেখকের হাতে নদী নানা ভূমিকায় উপস্থিত। রবীন্দ্রনাথসহ পরবর্তী যুগের আধুনিক কবিদের অনেকে এই বিশেষ দিকে তাঁদের মেধা ও সময় ব্যয় করেছেন। আধুনিকদের মধ্যে এ বিষয়ে কবি বিষ্ণু দে বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে।
নাম উল্লেখ না করে বলা যায় এদের মধ্যে কেউ চঞ্চলা জলস্রোতে গতির সৌন্দর্য বা বেগের আবেগ লক্ষ করে অভিভূত, কেউ উদাসী জলধারায় মল্লার বা টোড়ির বিষণ্ণতা অনুভব করেন। আবার কেউ নদীস্রোতের উজান-ভাটিতে জীবনের তাৎপর্যময় রূপ খুঁজে পান এবং সে ধারায় ভেসে সচ্ছল জীবনের উন্মুক্ত পত্তনে পৌঁছাতে চান। অন্য
-
মহাকালের প্রবাহে ভাসমান জীবনের ধারাবাহিক যাত্রা বহুকাল ধরে চলে আসছে। এক মুহূর্তও না থেমে এই অবিরাম চলা এরই মধ্যে জীবন কোথাও কোথাও হয়ে উঠছে মহাজীবন, রেখে যাচ্ছে স্থায়ী চিহ্ন। অস্তিত্বের প্রখর বৈশিষ্ট্যে কোনো কোনো বিরল ব্যক্তিত্ব কালের বুকে খোদিত করে যাচ্ছেন নিজ নাম, নিজের কীর্তি। প্রত্যয়-শীলিত বক্তব্যের ও কর্মের অভিজ্ঞান ঐতিহ্য-মন্দ্রিত অতীতকে বহন করে, সমকালীন যুগ চেতনা ধারণ করে বর্তমানের সীমা অতিক্রম করে ভাবীকালের জন্য রেখে যাচ্ছে পাথেয়, পথের সন্ধান দিয়ে আহ্বান করছে প্রার্থিত গন্তব্যে পৌঁছাতে।
তেমনি একজন সত্যান্বেষী জ্ঞানসাধক, ভাবসম্পদ সমৃদ্ধ আদর্শবাদী, সৃষ্টিশীল স্বপ্নদ্রষ্টা এবং বিশ্বের বিপুল কর্মযজ্ঞের অক্লান্ত ও শ্রমনিষ্ঠ মহান পুরুষ কবি রবীন্দ্রনাথ। তাঁর জন্মের আগে থেকেই
-
সুদীর্ঘ ষাটবছর ধরে বাংলাসাহিত্যকে নানা আশীর্বাদে ধন্য করেছেন রবীন্দ্রনাথ। সে দানের কোন হিসেব নেই। জীবনের নানা দিকে তাঁর দান অজস্র ধারায় বর্ষিত হয়েছে। শুধু যে নূতনতর প্রকাশ-ভঙ্গীর সৃষ্টি তাই নয়, মানব চিত্তকেও নূতনতর সমৃদ্ধির দানে পুষ্ট করেছেন তিনি। যে বিরাট মন সমগ্র ভারতবর্ষকে সুদীর্ঘকালের সাধনায় নানা বৈভব বিলিয়ে গেল, তার পরিণতির যে ইতিহাস লোকচক্ষুর অগোচরে তাকে জানবার বাসনা সকলেরই আছে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের বহির্জীবনে যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছিল তার সম্বন্ধে দেশের লোকের ঔৎসুক্য খুব বেশি নয়। তাঁর যে সাধনা তাঁকে মহর্ষি করে তুলেছিল সেই সাধনার কথা দেশ আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। রবীন্দ্রনাথের জীবন দেবেন্দ্রনাথের মত নয়। লোকচক্ষুর অন্তরালে নিজেকে তিনি
-
রবীন্দ্রনাথ তাঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মের দীর্ঘ পথ-পরিক্রমার পর জীবন সায়াহ্নে এসে ‘বিশ্বপরিচয়’ (১৯৩৭) বইতে বিজ্ঞানের নানা জটিল তত্ত্বে অবগাহন করেছিলেন। তাঁর এই দুঃসাহস আপাতদৃষ্টিতে অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হতে পারে। আর এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেও যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। তাই বইটির একটি দীর্ঘ ভূমিকায় দেশের কল্যাণের লক্ষ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানের জ্ঞানকে সহজলভ্য করার অতি জরুরি প্রয়োজনের প্রতি তিনি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন; আর জানিয়েছেন, এ পথে কেউ তেমন এগিয়ে আসছেন না বলেই এক প্রবল দায়িত্ববোধ থেকে তাঁকে এ-কাজে হাত দিতে হয়েছে। তাঁর ভাষায় “আমার দুঃসাহসের দৃষ্টান্তে যদি কোন মনীষী, যিনি একাধারে সাহিত্যরসিক ও বিজ্ঞানী, এই অত্যাবশ্যক কর্তব্যকর্মে নামেন, তাহলে এই চেষ্টা
-
বৈশাখে আমি বাংলাদেশে আসি এবং বাংলা একাডেমীর একটি সভা দিয়ে আমার এখানকার কার্যক্রম শুরু হয়। আবার বাংলা একাডেমীর সভা দিয়েই দেখছি আমার এখানকার কার্যক্রম শেষ হতে চলেছে। কাল সকালে আমার কলকাতায় ফিরে যাওয়ার কথা। বাংলা একাডেমীকে, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালককে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাবার এটাই উপযুক্ত মুহূর্ত। আপনারা যাঁরা আজকের এই সভায় উপস্থিত আছেন—তাঁদের সবাইকেও এই সঙ্গে আমার ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আজকের সভার বিষয় বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক মহাশয় এইমাত্র আপনাদের জানিয়েছেন।
এমন একটি ব্যক্তি অথবা সত্তাকে যদি কল্পনা করা যায় তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্বনির্ভর তবে তাঁর শিক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই। শিক্ষার তাঁদের প্রয়োজন যারা সম্পূর্ণ নন। জন্মসূত্রেই সম্পূর্ণ এবং স্বনির্ভর কোনো সত্তার শিক্ষার
-
রবীন্দ্র-সাহিত্য মূলত বিশ্বের জিনিস, সে ভাবের জিনিস, কোনো ভাষার গণ্ডি, কোনো দেশের গণ্ডি তাকে সম্পূর্ণ বেঁধে ফেলতে পারে না—তার ভাব হতে রূপে আবার রূপ হতে ভাবে অবিরাম যাওয়া আসা। এ প্রসঙ্গেগীতাঞ্জলি’র ভূমিকায় কবি ইয়েটসের উক্তি স্মরণীয় : “রবীন্দ্রনাথ ঠকুরের কবিতাবলীর গদ্যানুবাদ আমার রক্তে এমন দোলা দিয়েছে যা বহুকাল অনুভব করিনি। দিনের পর দিন এই বইয়ের পাণ্ডুলিপি আমি সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছি—রেঁস্তোরা, বাস ও ট্রেনের কামরায় কবিতাগুলো পড়তে পড়তে আমি অনেক সময় পড়া বন্ধ করেছি, যাতে আমার ভাবাবেগ সহযাত্রীদের চোখে না পড়ে।... সমস্ত জীবনব্যাপী যে জগতের স্বপ্ন আমি দেখেছি কবিতাগুলো আমাকে সে রাজ্যে পৌঁছে দিয়েছে। এ কাব্য মহত্তর ঐতিহ্যের সৃষ্টি;
ক্যাটাগরি
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
- অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন (১)
- অম্লান দত্ত (১)
- আনিসুজ্জামান (২)
- আনোয়ারা বেগম (১)
- আবদুল মান্নান সৈয়দ (১)
- আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন (১)
- আবু মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক (১)
- আহমদ রফিক (১)
- উজ্জ্বলকুমার মজুমদার (১)
- এম এ আজিজ মিয়া (২)
- কাজী মোতাহার হোসেন (১)
- নরেন বিশ্বাস (১)
- নলিনীকান্ত ভট্টাশালী (১)
- নিবারণ পণ্ডিত (১)
- নৃপেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় (১)
- প্রক্রিয়াধীন (২)
- প্রবোধচন্দ্র সেন (২)
- মনসুর মুসা (১)
- মযহারুল ইসলাম (১)
- লক্ষ্মীনারায়ণ রায় (১)
- সন্জীদা খাতুন (১)
- সৈয়দ আকরম হোসেন (১)
- সৈয়দ আলী আহসান (১)
- সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম (১)
- সোমেন বসু (১)
- হায়াৎ মামুদ (১)
- হাসান মুরশিদ (৩)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.