নিবেদন
এই বইখানির নাম যদি দেওয়া হত 'রবীন্দ্রনাথের ভারতচিন্তা', তা হলেও অসংগত হত না। কারণ এই গ্রন্থে যে প্রবন্ধগুলি সংকলিত হল তার প্রায় সবগুলিই রবীন্দ্রনাথের ভারতচিন্তা-বিষয়ক। কিন্তু তাঁর ভারতচিন্তা চিন্তামাত্রই নয়। তাতে প্রেরণা আছে, পথের নির্দেশও আছে। যে পথের নির্দেশ পাওয়া যায় তাঁর ভারতচিন্তায়, তাকে তিনি নিজেই বলেছেন 'ভারতপথ'। তিনি নিজেও ছিলেন সে পথের পথিক, আর তাঁর স্বজাতিকেও সে পথে প্রেরণা দেবার সাধনাই করে গিয়েছেন সারাজীবন। তাই বইটির নাম দেওয়া গেল 'ভারতপথিক রবীন্দ্রনাথ'। দৃশ্যতঃ প্রথম প্রবন্ধের নাম-অনুসারেই গ্রন্থের নামকরণ হয়েছে। কিন্তু ভেবে দেখলে বোঝা যাবে, সর-প্রবন্ধেরই মূলে রয়েছে ওই একই কথা।
রবীন্দ্রনাথের ভারতচিন্তার দুটি প্রধান দিক্। এক দিকে ভারতসত্তার মহাভাষ্য, অপর দিকে সেই ভাষ্যের আলোকে যুগোচিত কর্মপথের নির্দেশ। এ দিকে দৃষ্টি রেখে এই গ্রন্থের প্রবন্ধগুলিকে দুটি প্রধান বিভাগে বিভক্ত করেছি-'ভারতপথিক' এবং 'যুগনায়ক'। তা ছাড়া, আরও কয়েকটি প্রবন্ধকে স্থান দিয়েছি 'বিচিত্র' নামে একটি তৃতীয় বিভাগে। এই বিভাগের প্রবন্ধগুলি প্রথম দুটি বিভাগ থেকে একান্তভাবেই স্বতন্ত্র নয়। এর কয়েকটি প্রবন্ধ, বিশেষতঃ প্রথম দুটি, পরোক্ষভাবে পূর্ববর্তী ভাগছটির সঙ্গে যুক্ত। অথচ এগুলির রচনাকালীন উদ্দেশ্য ছিল স্বতন্ত্র। তাই এই প্রবন্ধকয়টিকে এই গ্রন্থে গ্রহণ করেও একটি পৃথক্ বিভাগে স্থাপন করা গেল।
এই গ্রন্থের কোনো কোনো প্রবন্ধ নবরচিত হলেও অধিকাংশই পূর্বরচিত এবং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত। দীর্ঘকাল ধরে রচিত ও প্রকাশিত হলেও প্রথমাবধি লেখকের মনে বিশেষ একটি ভাবাদর্শের পরিকল্পনা ছিল। তা ছাড়া, গ্রন্থে সংকলনকালেও ওই দিকে দৃষ্টি রেখে প্রবন্ধগুলিকে যথোচিতভাবে পরিমার্জনা ও সম্পাদনা করে দেওয়া গেল। আশা করি পাঠকের দৃষ্টিতেও গ্রন্থখানিতে একটি ভাবগত সমগ্রতা লক্ষিত হবে।
এ স্থলে বলা প্রয়োজন যে, প্রবন্ধগুলি বিভিন্ন বিষয়বস্তু নিয়ে রচিত হলেও একই পরিকল্পনার অন্তর্গত বলে একটি মূল ভাবসূত্রে গ্রথিত, অথচ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রে প্রকাশিত। এইজন্য প্রত্যেকটি প্রবন্ধকেই স্বয়ংসম্পূর্ণ করার প্রয়োজন ছিল। ফলে এগুলির মধ্যে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুনরুক্তি বর্জন করা সম্ভব ছিল না। গ্রন্থে সংকলনকালেও প্রত্যেকটি প্রবন্ধের স্বাতন্ত্র্য ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা বজায় রাখাই সমীচীন মনে হয়েছে। আমার বিশ্বাস পাঠকের মনও প্রত্যেকটি প্রবন্ধের স্বাতন্ত্র্যের দ্বারাই অধিকতর পরিতৃপ্ত হবে, ফলে পুনরুক্তিগুলিও পীড়াদায়কভাবে অনুভবগোচর হবে না। প্রবন্ধগুলিকে গ্রন্থে বিন্যস্ত করার সময়ে রচনা বা প্রকাশ-কালের ক্রম অনুসৃত হয় নি, অনুসৃত হয়েছে ভাবানুষদের ক্রম। প্রবন্ধগুলির রচনা, প্রকাশ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়ের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া গেল গ্রন্থশেষে 'প্রবন্ধপরিচয়' বিভাগে। আর, যে চারটি চিত্র এই গ্রন্থে প্রকাশিত হল তার বিবরণ পাওয়া যাবে 'চিত্রপরিচয়' অংশে।
রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিক উৎসব উপলক্ষে প্রকাশিত গ্রন্থকারের দুখানি পুস্তকের মধ্যে এটি দ্বিতীয়। প্রথমখানির বিষয়বস্তু রবীন্দ্র-নাথের শিক্ষাচিন্তা, আর এখানির বিষয়বস্তু রবীন্দ্রনাথের ভারত-চিন্তা। বস্তুতঃ প্রথমখানি এই দ্বিতীয়খানির, বিশেষতঃ এর 'যুগনায়ক' বিভাগের, পরিপূরক বলে গণ্য হতে পারে। কেননা, শিক্ষাসমস্যা আধুনিক ভারতের অন্যতম প্রধান যুগসমস্যা। রবীন্দ্রনাথ এই সমস্যার সমাধানেও অবতীর্ণ হয়েছিলেন ভারতপথের লক্ষ্য সম্মুখে রেখেই। 'রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তা'-র ন্যায় এই গ্রন্থখানিকেও যদি পাঠকসমাজ রবীন্দ্রনাথের শততম জন্মোৎসবের অন্যতম শ্রদ্ধার্ঘ্যরূপে গ্রহণ করেন, তা হলেই লেখকের অভিপ্রায় সিদ্ধ হবে।
সর্বজনশ্রদ্ধেয় আচার্য শ্রীসুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মহাশয় আমার এই সামান্য গ্রন্থোৎসর্গ-গ্রহণে সম্মতি দিয়ে আমাকে কৃতার্থ করেছেন। আমার সাহিত্যজীবনের প্রথম পর্যায় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে যে প্রেরণা ও উৎসাহ পেয়েছি তা আমার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। ভারতপথিক রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অনুবর্তী তিনি। সারাজীবন ধরে তিনি তাঁর স্বকীয় পন্থায় ভারতপথেরই সন্ধান দিচ্ছেন তাঁর স্বদেশবাসীকে। তাই এই গ্রন্থখানি তাঁকে উৎসর্গ করলাম শ্রদ্ধার নিদর্শনরূপে।
এই গ্রন্থপ্রকাশের প্রথম উদ্যমেই আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাবিভাগের প্রধান অধ্যাপক সুহৃদ্বর শ্রীশশিভূষণ দাশগুপ্ত মহাশয়ের সহায়তা লাভ করি। বন্ধুবর শ্রীপুলিনবিহারী সেনের কাছেও কোনো
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments