ঢাকায় রবীন্দ্রনাথ
...বঙ্গীয়-সাহিত্য-সম্মিলনের এক অধিবেশন ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় আহূত হয়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তখন ঢাকা-সাহিত্য-পরিষদের সভাপতি ও পৃষ্ঠপোষক। বঙ্গীয় সাহিত্য- সম্মিলনের ঢাকা- অধিবেশনের অভ্যর্থনা-সমিতির সভাপতি নির্বাচন লইয়া সাহিত্য-সমাজে ও সাহিত্য-পরিষদে তুমুল দ্বন্দ্ব উপস্থিত হইল। পরিষৎ দাশ সাহেবকে অভ্যর্থনা-সমিতির সভাপতি করিতে চাহে, সমাজ চাহে ঢাকার বিখ্যাত উকিল আনন্দ রায়কে। এই দ্বন্দ্বের ফলে অভ্যর্থনা-সমিতির সভ্য-সংখ্যা হু করিয়া বাড়িয়া চলিল। অর্থাভাবে এই সম্মিলনকে আর কোন অসুবিধা ভোগ করিতে হয় নাই। যাহা হউক, বিষম ভোটযুদ্ধে দাশ সাহেবই জয়লাভ করিলেন। আমি অভ্যর্থনা-সমিতির অন্যতম সহকারী সম্পাদক নির্বাচিত হইয়াছিলাম। সম্মিলনের সভাপতিরূপে রবীন্দ্রনাথকে পাইতে আমরা আগ্রহবান হইলাম এবং কলিকাতায় গিয়া রবীন্দ্রনাথকে সম্মত করাইবার ভার আমার উপর প্রদত্ত হইল।
এই আনন্দময় ভার গ্রহণ করিয়া কলিকাতা যাত্রা করিলাম। কলিকাতা পৌঁছিয়া বিকালবেলার দিকে 'প্রবাসী' অফিসে গিয়া বন্ধুবর চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের শরণাপন্ন হইলাম। চারুবাবু আমাকে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে লইয়া গেলেন। সেই সন্ধ্যায় “বিচিত্রা” নাম্নী সাহিত্য সভার এক অধিবেশন ছিল। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং বাংলা ছন্দ সম্বন্ধে এক প্রবন্ধ পাঠ করিবেন। আমি আর চারুবাবু সভাকক্ষের বারান্দায় অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। কতক্ষণ পরে ছন্নছাড়া উদ্ভ্রান্ত চেহারা ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র মোটা চরুট ফুঁকিতে ফুঁকিতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন, চারুবাবু আমার সহিত পরিচয় করাইয়া দিলেন। অল্প পরে আরও কয়েকজন সাহিত্যিক আগমন করিলেন, বিস্তর মহিলা আসিয়া সভার একার্ধ ভরিয়া ফেলিলেন। ফরাশ পাতা, সকলে তাহার উপরই বসিতেছিলেন। মেয়েরা এক ধারে, পুরুষেরা অপর ধারে। এইবার রবীন্দ্রনাথ সভাস্থলে আগমন করিলেন, তাঁহার সেই দীর্ঘ কালো পোশাক পরিয়া । শরৎবাবু তাঁহার কাছ ঘেঁষিয়া বসিলেন। রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে শরৎবাবু পরবর্তী অধিবেশনে স্বরচিত নূতন গল্প পড়িয়া শুনাইতে প্রতিশ্রুত হইলেন। তাহার পরে রবীন্দ্রনাথ তাঁহার প্রবন্ধ পড়িতে আরম্ভ করিলেন। আমরা বারান্দায় বসিয়াই প্রবন্ধ শুনিতে লাগিলাম।
সে তো প্রবন্ধ নয়, যেন বিশ্বামিত্রের নূতন সৃষ্টি! এই ছন্দসম্রাটের লেখনীমুখে বাণী যেন নূতন নূতন ছন্দ সৃষ্টি করিয়া নৃপুরশিঞ্জিত পদে কক্ষময় চপল চরণে নৃত্য করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। চৌদ্দ অক্ষরে যে কত রকম ছন্দ হইতে পারে, তাহার দৃষ্টান্তে কবি যে উদাহরণগুলি দিয়াছিলেন, তাহার একটি চমৎকার নমুনা অদ্যাপি মান আছে—
নয়নের সলিলে যে কথাটি বলিলে,রবে তাহা স্মরণে জীবনে ও মরণে।
সভা ভঙ্গ হইলে এবং সভাস্থল জনবিরল হইলে পর চারুবাবু আমাকে কবির নিকট লইয়া গেলেন এবং পরিচয় করাইয়া আমার উদ্দেশ্য নিবেদন করিলেন। কবির অপরিচিতের নিকট সঙ্কোচ দেখিয়া বিস্মিত হইলাম। তিনি যেন চোখ ভুলিয়া আমার দিকে চাহিয়া কথা কহিতে পারিতেছিলেন না। এই দিনের কিছুকাল আগে তিনি বড়লাটকে সেই বিখ্যাত পত্র লিখিয়া জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করিয়া নাইটত্ব পরিত্যাগ করিয়াছেন। চারুবাবু নানারূপ জনরব কবিকে শুনাইয়া আশঙ্কা প্রকাশ করিতে লাগিলেন, ভারত সরকার কবিবে নির্বাসিত করিতে পারেন। কবি মৃদু হাসিয়া উত্তর করিলেন, “সর্বদা ভৈয়ের হয়েই আছি। ক্লান্ত কবিকে আর অধিক বিরক্ত করা সঙ্গত হইবে না বিবেচনা করিয়া আমি সানুনয়ে তাঁহাকে ঢাকাবাসীর আগ্রহ ও অনুরোধ জানাইলাম। কিছুতেই তাহাকে রাজি করাইতে না পারিয়া ক্ষুণ্ণ মনে ফিরিয়া আসিলাম ।
ইহার পর আরও আট বছর চলিয়া গেল। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দ। একদিন খবর পাইলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি বক্তৃতা দিতে রবীন্দ্রনাথ ঢাকার আসিতেছেন। বর্তমান ভাইসচ্যান্সেলর পূর্বতন ইতিহাসের অধ্যাপক ডক্টর শ্রীযুক্ত রমেশচন্দ্র মজুমদার, তদানীন্তন ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের অধ্যক্ষ শ্রীযুক্ত অপূর্বকুমার চন্দ প্রভৃতি মহোদয়গণ এই ব্যাপারে অগ্রণী। রবিবার, ৩১ জানুয়ারি ১৯২৬, ১৭ মাঘ ১৩৩২, মঘানক্ষত্রে জগন্নাথ কলেজ-গৃহে রবীন্দ্রনাথের অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করিতে এক সভা আহুত হইল। অপূর্ব চন্দ প্রমুখ দলের অভিলাষ, রবীন্দ্রনাথ আগে শহরে উঠিবেন, তথায় তাহার অভ্যর্থনাদি হইবে। পরে তিনি রমনায় বিশ্ববিদ্যালয় অঞ্চলে যাইবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা প্রদান করিবেন। ডক্টর মজুমদার তাহাতে রাজি নহেন। সন্ধ্যা সাড়ে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments