ইংরাজি গীতাঞ্জলির কাহিনী
হীরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
রবীন্দ্রনাথের ইংরাজি গীতাঞ্জলির রচনা ও প্রকাশন কাহিনী একদিকে যেমন রোমাঞ্চকর অন্য দিকে তেমন গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। ঠিক বলতে কি, তা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে তাঁকে একটি নূতন ভূমিকা গ্রহণে বাধ্য করেছিল। যিনি ছিলেন বাঙালীর কবি, তিনি পরিণত হয়েছিলেন বিশ্বের কবিতে। যিনি ছিলেন ঘরের মানুষ, তিনি হলেন বিশ্বের মানুষ। তাই হল বর্তমান প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়।
রবীন্দ্রনাথের প্রথম তাৎপর্যপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ ‘সন্ধ্যাসংগীত’ প্রকাশিত হয় ১৮৮১ খৃষ্টাব্দে। বঙ্কিমচন্দ্র তার মধ্যে ভাবী সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেখে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। তার পর যে কাব্যশক্তি মুকুল আকারে এই গ্রন্থে দেখা দিয়েছিল তা পরবর্তী কুড়ি বছরের মধ্যে পরিণতরূপে প্রকট হয়ে কাব্যে ও কথাসাহিত্যে তাঁর অনন্যসাধারণ প্রতিষ্ঠা এনে দিয়েছিল। এই সময়ের মধ্যে ‘রাজর্ষি’ প্রকাশ হয়েছে, ‘চিত্রা’ ও ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাব্য রচিত হয়ে গেছে, ‘চোখের বালি’ও প্রকাশ উন্মুখ। অজস্রধারে ছোট গল্প প্রকাশ হয়ে গেছে। তবু তখনও তিনি বাঙালীর কবিই রয়ে গিয়েছেন। ভারতের পূর্বাংশের এক স্থানীয় ভাষায় তাঁর সাহিত্য তখন পর্যন্ত রচিত হয়ে তার গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বিশ্বের মানুষের কাছে তাঁর মনীষা তখনও অপরিচিত রয়ে গিয়েছিল।
এই পরিবেশে মাঝখানে কতকগুলি অসংলগ্ন ঘটনার সমাবেশে হঠাৎ এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হল য৷ তাঁকে আকস্মিকভাবে বিশ্বের মানুষের সহিত পরিচিত করিয়ে দিল। সেই ঘটনাগুলি এই। ১৯০২ খ্রীষ্টাব্দে তাঁর পত্নী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যু তাঁর জীবনে এক বিষাদের অধ্যায় প্রবর্তিত করে। প্রথমত তাঁর সংসার গৃহিণীর কল্যাণ হস্তের স্পর্শ হতে বঞ্চিত হল। দ্বিতীয়া কন্যা রেণুকা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পীড়িত হয়ে পড়লেন। কন্যার পরিচর্যায় তাঁর দিন কাটতে লাগল; কিন্তু তাঁর চেষ্টা সার্থক হল না, মৃত্যুর হাত হতে তাঁকে রক্ষা করতে পারলেন না। তিন বৎসরের মধ্যে তিনি পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথকে হারালেন। আরও দুঃখ ভাগ্যে লেখা ছিল; কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথকেও অকালে হারালেন। এইভাবে অল্প কয়েক বৎসরের মধ্যে অনেক ঝড়-ঝাপ্টা তাঁর জীবনের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হল। পারিবারিক জীবনের সেবা-যত্ন হতে তিনি এক রকম বঞ্চিত হলেন। ফলে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ল। ১৯১২ খৃষ্টাব্দের গোড়ায় ডাক্তার তাঁকে উপদেশ দিলেন বিলাত গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে।
ঠিক তার আগে প্রথম পুত্র রথীন্দ্রনাথ আমেরিকা হতে কৃষিবিজ্ঞান শিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরে এসেছেন। প্রতিমা দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পাদিত হয়ে কবির নূতন করে সংসার গড়ে উঠেছে। সুতরাং ঠিক হল কলিকাতা হতে জাহাজে করে তিনি সপরিবারে চিকিৎসার জন্য লণ্ডনে যাবেন। জাহাজ চাঁদপাল ঘাট হতে ছাড়বে। আগের দিন রাত্রে মালপত্র জাহাজে পাঠানো হয়ে গেল।
এদিকে পরিবারের বিশিষ্ট জামাতা আশুতোষ চৌধুরী তাঁর বালিগঞ্জের বাড়ীতে কবির জন্য একটি বিদায় ভোজের আয়োজন করেছিলেন। রাত্রে ফিরে আসবার পর কিন্তু তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ফলে বাধ্য হয়ে পরের দিন জাহাজে রওনা হবাব সংকল্প তার ত্যাগ করতে হল। মালপত্র জাহাজ হতে ফিরিয়ে আনা হল।
তিনি রোগমুক্ত হবার পর আবার নূতন করে বিলাত যাবার ব্যবস্থা চলতে লাগল। কিন্তু ইতিমধ্যে যে কয়েক সপ্তাহ সময় কাটাতে হবে তার ব্যবস্থা কি হবে? ডাক্তার তাঁকে কোন রকম পরিশ্রম করতে নিষেধ করেছেন, এমন কি মৌলিক রচনা করাও নিষিদ্ধ। একই কারণে শান্তিনিকেতনে যাওয়া নিষিদ্ধ। এদিকে এত দীর্ঘকাল কলিকাতায় বসে কাটাতে তাঁর মন চায় না। অবশেষে ঠিক হল তাঁর যৌবনের সাধনক্ষেত্র শিলাইদহে গিয়ে তিনি এই সময়টা অতিবাহিত করবেন। সেখানে তিনি পাবেন মনের মত পরিবেশ; অপরপক্ষে কলিকাতা হতে তা এত দূরে যে তিনি অগণিত ভক্তদের নাগালের বাহিরে থাকবেন।
শিলাইদহে গিয়ে আর এক সমস্যার উদ্ভব হল ৷ এখন সময় কাটে কি করে? সকল রকম পরিশ্রম নিষিদ্ধ, এমন কি মৌলিক রচনাও নিষিদ্ধ। সুতরাং এ সমস্যার সমাধান
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments