উদ্বৃত্তমূল্য সৃষ্টির বিভিন্ন উপায়
পুঁজির একটু সূক্ষ্ম বিচার প্রয়োজন। পুঁজিপতি যে শ্রমিককে শোষণ করিতে পারে উহার একমাত্র কারণ পুঁজিতন্ত্রের অধীনে সমাজের সমন্ত সম্পত্তি কতিপয়ের হস্তগত। উৎপাদনের এবং জীবন ধারণের সমস্ত উপকরণ বুর্জোয়ার দখলে, শ্রমিকের হাতে কিছুই নাই। সমাজের সম্পত্তির উপর বুর্জোয়ার এই একচেটিয়া দখলের দরুন নিঃস্ব শ্রমিক তাহার শ্রমশক্তি বিক্রয় করিতে বাধ্য হয়।
উৎপাদনের উপকরণ বলিতে আমরা কি বুঝি? এক কথায়, যাহা দ্বারা আমরা কাজ করি তাহাই উৎপাদনের উপকরণ। এই উপকরণগুলির আবার বিভিন্ন অংশ। প্রথমত, শ্রম করার যন্ত্র—ইহা তাঁতীর সামান্য তাঁত হইতে পারে, আবার ফ্যাক্টরীর জটিল কলকব্জাও হইতে পারে। তারপর কাঁচামাল; জুতার কাঁচামাল চামড়া, কাপড়ের কাঁচামাল সূতা আবার সূতার কাঁচামাল তুলা। কাজের জন্য আরো অনেক রকম সহকারী দ্রব্যের প্রয়োজন হয়, যথা তৈল, বালি ইত্যাদি। একটা জিনিস লক্ষ্য করা প্রয়োজন,—একবারের উৎপাদন কার্য্যেই কতকগুলি উপকরণ নিঃশেষ হইয়া যায়; কিন্তু কারখানাবাড়ী, কলকব্জা প্রভৃতি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
উৎপাদন কার্য্যে উৎপাদনের উপকরণগুলির যথার্থ স্থান কি তাহা আমরা বুঝিলাম। এগুলি হাতে আছে বলিয়াই বুর্জোয়া শক্তিমান, এগুলি হইতে বঞ্চিত বলিয়াই শ্রমিক দুর্বল। একজন মুচির হাতে তাহার হাতিয়ার হাতিয়ারই, উৎপাদনের যন্ত্র। কিন্তু বুর্জোয়ার হাতে উৎপাদনের উপকরণ শোষণের যন্ত্র।
সাধারণত পুঁজি বলিতে আমরা বুঝি বস্তু। কিন্তু মার্কস্ বলেন, পুঁজি একটী নির্দ্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্ক। একটী নির্দ্দিষ্ট সমাজ-ব্যবস্থা উৎপাদনের উপকরণগুলিকে শোষণের যন্ত্রে পরিণত করে। উৎপাদনের উপকরণগুলি যে-শ্রেণীর হস্তগত, আর উৎপাদনের উপকরণগুলি হইতে যে-শ্রেণী বঞ্চিত—পুঁজি সেই দুই শ্রেণীর মধ্যে সামাজিক সম্বন্ধ। পুঁজিতন্ত্রী সমাজে উৎপাদনের উপকরণ ক্রয়-বিক্রয় হয়; অতএব ইহারা পণ্য, ইহাদের মূল্য আছে। অন্য রকমে বলিতে গেলে, পুঁজি এমন একটী মূল্য যাহা শ্রমিককে শোষণ করিয়া উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি করে। মূল্য অর্থ মানুষের শ্রম। উৎপাদনের উপকরণ অর্থাৎ পুঁজি শ্রমিকের শ্রমেরই অবয়ব। পুঁজিতন্ত্রে আমরা দেখিতে পাই, উৎপাদনের উপকরণগুলি দ্বারা মজুরকে শোষণ করা হইতেছে, অর্থাৎ অতীত-শ্রম (dead labour) জীবন্ত শ্রমকে (living labour) শুষিতেছে। পুঁজিতন্ত্রের শোষণ ভাল করিয়া বুঝিতে হইলে, পুঁজির দুইটী অংশ সম্পর্কে জানিতে হইবে: অপরিবর্ত্তমান পুঁজি (constant-capital) ও পরিবর্ত্তমান পুঁজি (variable capital)।
আমরা পূর্বেই দেখিয়াছি একটী পণ্যের পুরা মূল্যের মধ্যে থাকে কাঁচামাল ও জ্বালানির মূল্য এবং কলকজ্বার একটী অংশের মূল্য। নূতন পণ্যে এগুলির মূল্য সংরক্ষিত রহিয়াছে; যে-মূল্যে ইহাদের ক্রয় করা হইয়াছিল নূতন পণ্যে তাহাই রক্ষিত হইয়াছে। এই স্থলে মূল্যের কিছুই অদল বদল হয় নাই। এই কারণেই পুঁজির যে-অংশটুকু কাঁচামাল, কলকব্জা ইত্যাদি—তাহাকে বলা হয় অপরিবর্ত্তমান পুঁজি।
কিন্তু আমরা জানি নূতন পণ্যে আরো একটি মূল্য প্রবেশ করিয়াছে, এই মূল্য শ্রমিক কারখানায় সৃষ্টি করে। ধরা যাউক, কোন একটি কারখানায় ১০০ শ্রমিক প্রত্যহ ১০ ঘণ্টা কাজ করিয়া ১০০ পাউণ্ডের সমান মূল্য সৃষ্টি করে; এই ১০০ পাউণ্ডই নূতন মূল্য। কিন্তু শ্রমিক সবটুকু মজুরী স্বরূপ পায় না। শ্রমিকের ভরণ-পোষণের জন্য যে-সব দ্রব্যের প্রয়োজন হয়, মজুরী সেই সব দ্রব্যের মূল্যের সমান। ইহা উৎপাদনের জন্য শ্রমিক ধরা যাউক—৫ ঘণ্টা খাটে; ইহাই শ্রমিকের পুরা শ্রমদিবসের আবশ্যক শ্রমসময়। অতএব পুঁজির যে অংশটা দ্বারা পুঁজিপতি শ্রমশক্তি ক্রয় করিয়াছিল তাহা কারখানায় যে-নূতন মূল্য সৃষ্ট হইল তাহার অর্দ্ধেক। অর্থাৎ মজুরীর পরিমাণ ৫০ পাউণ্ড, অথচ গোটা মূল্য যাহা সৃষ্ট হইয়াছে তাহা ১০০ পাউণ্ড। অতএব কারখানায় পুঁজির এই অংশটীর পরিবর্তন হইয়াছে, এইজন্যই ইহাকে বলা হয় পরিবর্ত্তমান পুঁজি।
পুঁজিপতির দিক হইতে পুঁজির আরো এক রকমের বিভাগ করা হয়। পুঁজির একটা অংশ ধীরে ধীরে শেষ হয়, আরেকটা অংশ শীঘ্র শেষ হইয়া যায়। কারখানাবাড়ী, কলকব্জা এগুলি বহুকালস্থায়ী। পুঁজিপতি ইহাদের বলে স্থিত-পুঁজি (fixed capital), কিন্তু যে-অংশ শীঘ্র শেষ হইয়া যায় তাহাকে সে বলে কার্য্যকরী পুঁজি (working
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments