কাঠুরের মেয়ে
একসময় এক বুড়ো কাঠুরে তার ন’বছরের মেয়েকে নিয়ে থাকত এক ভাঙা কুঁড়েঘরে।
থাকার মধ্যে ছিল কেবল তার একটা ভাঙা কুড়ুল, একটা খোঁড়া ঘোড়া আর বুড়ো একটা গাধা। কিন্তু কথায় বলে ‘ধনীর সুখ তার ঘোড়াগরুর পালের দিকে তাকিয়ে আর দরিদ্রের সুখ তার সন্তানদের দিকে তাকিয়ে।’ সত্যিই, নিজের ছোট্ট মেয়ের দিকে তাকিয়ে কাঠুরে সব দুঃখকষ্ট ভুলে যেত।
মেয়ের নাম আয়না-কিজ। সুন্দরী বুদ্ধিমতী আর হাসিখুশী স্বভাব তার, একবার তাকে দেখলেই ভালবেসে ফেলে তাকে সবাই। দূরের দূরের ইয়ুরতা থেকে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা আসে তার সঙ্গে খেলা করার জন্য, দূর দূর গ্রাম থেকে বৃদ্ধেরা আসে তার সঙ্গে কথা বলার জন্য। একদিন বুড়ো কাঠুরে খোঁড়া ঘোড়ার পিঠে কাঠের বোঝা চাপিয়ে মেয়েকে বলল: ‘আয়না-কিজ, বাছা আমার, আমি বাজারে যাচ্ছি, ফিরতে সন্ধ্যা হবে। মন খারাপ করিস না। যদি কাঠ বিক্রী করতে পারি ভাল দামে তো তোর জন্য কিছু, কিনে আনব।’
‘যাও, কিন্তু সাবধান থেকো বাবা, ভালয় ভালয় ফিরে এস। কথায় বলে, বাজার অতি খারাপ জায়গা সেখানে একজনের থলি ভরে, অন্যজন নিঃস্ব হয়। তাড়াতাড়ি ফিরে এস, রান্না করে বসে থাকব আমি।’
খোঁড়া ঘোড়াটাকে চাবুক মেরে রওনা দিল কাঠুরে।
বাজারে পৌঁছে একপাশে দাঁড়িয়ে সে খরিদ্দারের অপেক্ষায় রইল। কিন্তু সময় যায় কেউ এগিয়ে আসে না বুড়োর দিকে।
ঐ সময় এক যুবক বাই[১]বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছিল সবার সামনে তার কালো দাড়ি আর রেশমী আলখাল্লাটা নাড়িয়ে নাড়িয়ে। গরীব বুড়ো কাঠুরেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাকে নিয়ে মজা করার ইচ্ছা হল বাইয়ের।
‘কি গো বুড়ো, কাঠ বেচবে?’ জিজ্ঞাসা করল বাই।
‘বেচব,’ বলল কাঠুরে।
'কি দাম চাস ঐ কাঠের বোঝার জন্য?’
‘এক তাঙ্গা।’[২]
‘ঐ একই দামে কি তুই যা যেমন আছে বেচবি?’
খরিদারের কথা ঠিক বুঝতে পারল না কাঠুরে, কিন্তু তাতে ক্ষতি কিছু নেই দেখে আবার উত্তর দিল, ‘বেচব’।
‘ঠিক আছে,’ বলল বাই, ‘এই নে পয়সা, চল আমার সঙ্গে।’
বাইয়ের বাড়ীর উঠোনে যখন তারা পৌঁছল, কাঠের বোঝা ঘোড়ার পিঠ থেকে নামাতে গেল বুড়ো কাঠুরে কিন্তু বাই তার বুকে একটা জোর ধাক্কা দিয়ে পাড়া কাঁপিয়ে চীৎকার করে উঠল: “কি করছিস তুই, বোকা বুড়ো? ঘোড়াটা নিয়ে যেতে চাস নাকি? আমি তো তোর কাছে কাঠ কিনেছি ‘যা যেমন আছে’ এই ভাবে, তার মানে ঘোড়াটাও এখন আমার। দাম পেয়ে গিয়েছিস, ভেগে পড় শীগগির।…”
কাঠুরে প্রতিবাদ জানাতে লাগল কিন্তু বাই শোনে না কিছুই। হাত নাড়িয়ে চীৎকার করে আরো জোরে, শেষে বুড়োর জামা ধরে টেনে নিয়ে চলল তাকে কাজীর কাছে।
কাজী তাদের কথা শুনে দাড়িতে হাত বুলিয়ে তাকাল বাইয়ের রেশমী আলখাল্লার দিকে, ভাল পারিশ্রমিক পাবার আশায় ঘোষণা করল কাঠুরে দাম পেয়েছে পুরোপুরি, যে ক্ষতি তার হয়েছে সে জন্য নিজেই দায়ী সে, খরিদ্দারের শর্তে রাজী হয়েছিল সে।
কাজীর বিচারের পরে বাই হা হা করে হাসতে লাগল অনেকক্ষণ ধরে এমন তামাসায় খুশী হয়ে আর বুড়ো কাঠুরে মনের দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে গুটি গুটি ফিরে চলল গ্রামের দিকে।
ওদিকে আয়না-কিজ বাবার অপেক্ষায় বারেবারে চুলায় কাঠ গুঁজছে। তারপর যখন বুড়ো এসে ঘরে পা দিল, তার চোখে জল দেখে মেয়ের বুকটা কেঁপে উঠল উদ্বেগে। ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে সে জিজ্ঞাসা করতে লাগল কি হয়েছে।
কাঠুরে সব কথা বলল মেয়েকে, মেয়ে বুড়ো বাবাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। কিন্তু বুড়োর চোখের জল থামে না কিছুতেই।
পরের দিন বুড়ো শোকে একেবারে বিছানা নিল। আয়না-কিজ বাবার গায়ে পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, ‘বাবা, আজ তোমার শরীরটা খারাপ, আজ বিছানা থেকে উঠো না
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments