বাংলা সাহিত্যে আত্মজীবনী

সৃষ্টির মধ্য দিয়ে স্রষ্টা নিজেকে প্রকাশ করেন। বিশ্বলোকের কত বিচিত্র ঘটনা, কত অজস্র অনুভূতি স্রষ্টার মনে নানা ধরণের প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। সেই সব প্রতিক্রিয়ার তাড়াতেই শিল্পী তাঁর শিল্প সাধনায় নিত্যনূতন প্রকাশভঙ্গীর সন্ধান শুরু করে দেন। মনের ভিতরে যত কথা ভীড় করে আসে তাদের বিশ্বমানবের মনের দরবারে হাজির করে দেওয়ার জন্য শিল্পীব ভাবনার অন্ত নেই। তারই জন্য যুগে যুগে মানুষ নানা ধরণের সাহিত্যভঙ্গীর আবিষ্কার করেছে। কখনো যুগবেদনাকে প্রকাশ করেছে মহাকাব্যের বিরাট দেহের গজমন্থর গতিতে, কখনো নাটকীয় সংঘাতে, কখনো গ্রাম্য গাথায়। নিজের মনের গোপন কথাটিকে মানুষ গীতিকবিতার মাধ্যমে সময়ে সময়ে রূপ দিয়েছে।

জীবনী লেখার অনেকটা নির্ভর করে ঘটনা সংগ্রহের উপর, কিন্তু আত্মজীবনীর চমৎকারিত্ব নির্ভর করে ঘটনা সংগ্রহের উপর নয়, আত্ম-উপলব্ধির উপর। তাই ঘটনাযোজনা করে জীবনী লেখা যায়, কিন্তু আত্মজাবনী ঘটনা-সংযোজন মাত্রই নয়। জীবনে যার কোন বোধকে আচ্ছন্ন করে গভীর দৃষ্টি নেই, গতানুগতিক দৈনন্দিন জীবন যার আছে, তার আত্মকথা কখনো ঐ ঘটনা যোজনার বাইরে যায় না। সুতরাং প্রতিদিনকার তুচ্ছতাকে যে ছাপিয়ে উঠতে পারেনি, তার পক্ষে সম্ভব নয় আত্মকথার মাধ্যমে জীবনের ব্যাখ্যা করা।

দূরে দাঁড়িয়ে সংসারকে দেখা যায়, মানুষকে দেখা যায়; চেষ্টা করলে অনেকটা অপক্ষপাত বিচারও করা যায়। কোন কর্মবীর, কোন কবি, কোন সমাজসংস্কারক কেমন করে শিশু অবস্থা থেকে জীবনের শেষ সাফল্য বা ব্যর্থতা অর্জন করলেন, বাইরে দাঁড়িয়ে জীবনের নানা ঘটনার সূত্র জুড়ে জুড়ে, জীবনীকার তা সাধারণের কাছে তুলে ধরতে পারেন। তাঁর রোজনামচা, তাঁর পত্রাবলী, তাঁর কথাবার্তা থেকে অনেক অকাট্য প্রমাণ আহরণ করে জীবনীকার তাঁর জীবনের বৃত্তের পরিধি মেপে দেবেন। সেখানে দেখা যাবে কেমন করে সেই একটি মানুষ আপনার চতুর্দিকে আত্মীয়তার বা শত্রুতার জাল বিস্তার করে সংসারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। ব্যক্তির যেটা প্রকাশ, সমাজের পটভূমিকায় তার যে বিস্তার তাকেই তুলে ধরেন জীবনীকার। এমন ঘটনা নিত্যই ঘটে যে ঐ বিরাট ব্যক্তিত্বের কীর্তির হিসাব সঠিকভাবে রেখেও তাঁর ব্যক্তিত্ব কোন উৎস থেকে উৎসারিত হলো তার কোন সুনির্দিষ্ট ধারণা জীবনীকার দিতে পারেন নি। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই তা দেওয়া সম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথ যদি জীবনস্মৃতি বা আত্মপরিচয় না লিখে যেতেন তবে প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রজীবনী কবিচিত্তের বিবর্তনের ধারাটিকে অত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতো কিনা সে সম্বন্ধে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে। সুতরাং জীবনীরচনায় জীবনবৃত্তান্তের ব্যাখ্যা আছে কিন্তু জীবনব্যাখ্যার অবকাশ কম।

আত্মজীবনীর মূল কথা হলো সেই জীবনব্যাখ্যা। যে জীবনটি নানা বর্ণে, নানা রসে ফলবান হয়ে ফুটে ওঠে, কোথা থেকে সে রসসংগ্রহ করে, কেমন করে সে নূতন নূতন অনুভূতির আনন্দে দুলে ওঠে, কেমন করে বিশ্বলোকের সঙ্গে তার অন্তরের যোগ তৈরী হয়, এই কথাগুলিই আত্মজীবনীতে স্রষ্টারা লিখে থাকেন। সুতরাং আত্মজীবনীর সবটা বুদ্ধি দিয়ে বোঝা যায়না যেমন বোঝা যায় জীবনীর। বৃত্তান্তের ভার কমিয়ে অন্তর্লোকের যে রহস্যের ব্যাখ্যা স্রষ্টারা করে থাকেন তাকে অনেকটা বুঝে নিতে হয় নিজের বোধ দিয়ে, নিজের অনুভূতি দিয়ে। তাই আত্মজীবনী শুধু ইতিহাস নয়, আত্মজীবনী ঘটনা-পারম্পর্যরক্ষিত ধারাবাহিক জীবনকথা নয়, আত্মজীবনী মানুষের হয়ে ওঠার কাহিনী। প্রথম সূর্যোদয় মানুষ কবে দেখে তাকি কারুর মনে থাকে; রবীন্দ্রজীবনী লিখতে বসে কারুরই সে কথা মনে আসার কথা নয়। নিজের জীবনে কবি একদিন সূর্যোদয় দেখেছিলেন, সেই সূর্যোদয় শুধু নীল আকাশেই হয়নি, হয়েছিল কবির চেতনার জগতে। ভবিষ্যৎ জীবনে সূর্যকে কেন্দ্র করে যত বিচিত্র কল্পনার ঘাত প্রতিঘাত কবির মনে তরঙ্গিত হয়ে উঠেছিল তার প্রথম সূত্র যে ঐখানে তা কবি যদি নিজে বলে না যেতেন তাহলে চিরকাল অজানা থেকে যেতো। তাই চেতনার জাগরণ আর বিকাশই হলো আত্মজীবনীর বলবার কথা।

ঘটনার বৈচিত্র্য সব জীবনেই

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice