তন্ত্র-প্রসঙ্গে
তন্ত্র-প্রসঙ্গে একটি চিত্তাকর্ষক তথ্য চোখে পড়ল ৷ যতদূর জানি, আধুনিক বিদ্বৎসমাজ তথ্যটির সম্যক বিশ্লেষণ করেন নি। বর্তমান প্ৰবন্ধ উপলক্ষে সেটির প্রতি বিদ্বানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।
এ-কথা অবশ্যই সুবিদিত যে মনুস্মৃতির টীকা করে কুল্লুকভট্ট বলেছেন, শ্রুতি দু-ধরনের বা দ্বিবিধ: বৈদিকী এবং তান্ত্রিকী। বৈদিক ঐতিহ্যের সঙ্গে তান্ত্রিক ঐতিহ্যের পার্থক্য এখানে স্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এ-নির্দেশ কতদিনকার পুরনো?
কুল্লুকভট্ট খুব পুরনো কালের লেখক ছিলেন না। মহামহোপাধ্যায় কাণের মতে, মনুস্মৃতির তারিখ খ্রীষ্টপূর্ব ২০০ থেকে ২০০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে এবং কুল্লুকরচিত টীকার তারিখ ১১৫০–১৩০০ খ্রীষ্টাব্দ ৷
কিন্তু কুল্লুক এই যে-কথাটি বলছেন, এর পিছনে প্রাচীনতর ঐতিহ্যের কোনো সাক্ষ্য আছে কি? আছে। কথাটি বলবা’র সময় কুল্লুক বৃদ্ধসম্মতি হিসেবে হারীতের নাম করেছেন ৷
এই হারীত কে ছিলেন? কতদিন আগেকার ধর্মশাস্ত্রকার?
মহামহোপাধ্যায় কাণে-র বইতে দেখলাম, হারীত ছিলেন একজন ধর্মসূত্রকার এবং খুবই প্রাচীনকালের লোক। তাঁর ধর্মসূত্র মনুস্মৃতির চেয়ে ঢের পুরনো ৷ প্ৰমাণ: বৌধায়ন, বশিষ্ঠ এবং বিশেষ করে আপস্তম্ব-র মতো প্রাচীন ধর্মসূত্রকারেরাও বারবার হারীতের নজির দিয়েছেন। মহা- মহোপাধ্যায় কাণে বৌধায়ন, আপস্তম্ব প্রভৃতিব ধর্মসূত্রগুলির তারিখ দিয়েছেন, খ্রীষ্টপূর্ব ৬০০–৩০০। অর্থাৎ, ওই সুপ্রাচীন কালেই হারীতের সূত্র প্রামান্য-পদে প্রতিষ্ঠিত হযেছে ৷
তাহলে, হারীত নিশ্চয়ই গৌতম বুদ্ধের চেয়েও অনেক পুরনো আমলের ধর্মসূত্রকার ছিলেন। যদি তাই হয়, এবং আমবা যদি বেদ-ব্রাহ্মণের রচনাকাল-সংক্রান্ত প্রচলিত সন-তারিখের হিসেব স্বীকার করতে রাজি হই—তাহলে হয়তো এমন কথা মনে করাও অসঙ্গত হবে না যে হারীতের ধর্মসূত্রটি ব্রাহ্মণগুলির সমসাময়িক হোক আর নাই হোক অন্তত কাছাকাছি সময়ের হওয়াই সম্ভব। এদিকে, আধুনিক বিদ্বানেরা অনুমান করেন, রচনাকালের দিক থেকে ঋগ্বেদ-সংহিতায় সংকলিত অর্বাচীনতম অংশ ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলির সমসাময়িক হতে পারে। অতএব, হারীতের ধর্মসূত্র এবং ঋগ্বেদেব অর্বাচীনতম অংশর মধ্যে সময়ের ব্যবধান খুব বেশি না হওয়াই সম্ভব ৷
সন-তাবিখের এ-সব হিসেব ঠিক হলে মনে করা যায়, ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসে বৈদিক যুগের অবসান হবার আগেই—এমনকি ঋগ্বেদ-বচন সম্পূর্ণভাবে শেষ হবার আগেই—বৈদিক ও তান্ত্রিক এই দুটি ঐতিহ্য সম্পূর্ণ পৃথক বলে নির্দিষ্ট হয়েছে ৷ এই সম্ভাবনার কথা মনে হবার পর স্বভাবতই মনে হল, ঋগ্বেদেই এ-ধরনের কোনো ইঙ্গিত খুঁজে পাওয়া যায় কিনা তা অন্বেষণ করা দরকার ৷
ঋগ্বেদ-সংহিতার একটি মাত্র শাখা আজকের দিন পর্যন্ত টিকে থেকেছে। তার নাম সাকল-শাখা। এই শাখাটিতে সংকলিত সাহিত্য আকারে সুবিশাল—সহস্রাধিক সুক্ত, দশ সহস্রাধিক ঋক্। আধুনিক বিদ্বানেরা নিঃসন্দেহে বলছেন, এই সুবিশাল সাহিত্য রচিত হতে অবশ্যই বহু শতাব্দী, সময় লেগেছিল। কত শতাব্দী? নির্ভুল হিসেব করা নিশ্চয়ই অসম্ভব; কিন্তু ঋগ্বেদ-সংহিতায় সংকলিত প্রাচীনতম ও অর্বাচীনতম সাহিত্য-নিদর্শনের মধ্যে রচনাকালের ব্যবধান সহস্রাধিক–বা এমনকি দ্বিসহস্রাধিক—বছর হওয়া অসম্ভব নয়। এবং যেহেতু একথা মনে করবার কোনো কারণ নেই যে এই সুদীর্ঘ যুগ ধরে বৈদিক কবিদের চিন্তাচেতনা বা ধ্যানধারণা সম্পূর্ণভাবে অপরিবর্তিত থেকেছে, সেইহেতু ঋগ্বেদ-সংহিতায় আগাগোড়া হুবহু এক চিন্তাধারার অন্বেষণ করা অন্তত ঐতিহাসিকভাবে অসিদ্ধ ৷
এ-হেন সুবিশাল ও সুদীর্ঘকাল ধরে রচিত সাহিত্য-সংকলনটির মধ্যে মাত্র একবার ‘তন্ত্র’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়: ঋগ্বেদ ১০.৭১.৯। কিন্তু ওই একমাত্র উল্লেখের একাধিক চিত্তাকর্ষক দিক রয়েছে।
প্রথমত, যে-সুক্তে ‘তন্ত্র’ শব্দটি পাওয়া যাচ্ছে তা অত্যন্ত অর্বাচীন, এমনকি, এ-কথা মনে হওয়াও অসঙ্গত নয়, সুক্তটি ঋগ্বেদ-সংহিতায় অর্বাচীনতম অংশর পরিচায়ক ৷ তার প্রমাণ শুধু এই নয় যে সূক্তটি ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের অন্তর্গত। আরো বড়ো প্রমাণ হল সূক্তটির সঙ্গে সংযুক্ত দেব-নাম।
ঋগ্বেদেব প্রতিটি সূক্ত-র সঙ্গে একটি করে দেব-নাম সংযুক্ত। বনিয়াদী বৈদিক দেবতা বলতে বরুণ, মিত্র, ইন্দ্ৰ ইত্যাদি। কিন্তু আলোচ্য সূক্তটির দেব-নাম ভারি অদ্ভুত-ঋগ্বেদ-সংহিতার কোনো বনিয়াদী দেবতাই নয়, তার বদলে এ-সুক্তেব দেবতা হল “জ্ঞান”—সমগ্র ঋগ্বেদ-সাহিত্যে এই হল একটিমাত্র সূক্ত যার দেবতা “জ্ঞান”। স্বভাবতই,
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments