সত্যেন সেনের বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা প্রসঙ্গে (প্রথম পর্ব)
সত্যেন সেন (১৯০৭-১৯৮১) লেখক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, সংগঠক, গায়ক এই সব মিলিয়ে এক পরিপূর্ণ সংগ্রামী মানুষ। আমাদের জাতীয়মুক্তি এবং সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠায় নিরন্তর আন্দোলনে যাঁরা অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করেছেন সত্যেন সেন তাঁদেরই একজন। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় সংগ্রামের পথে, আন্দোলনের পথে, দেশ গড়ার পথে যে পথচলা শুরু তা অব্যাহত ছিল আমৃত্যু, বাহাত্তর বছর সাত মাস সাত দিন বয়স অবধি।
এমন একজন সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক নেতা-কর্মীর হাত দিয়ে যখন একের পর এক বের হতে থাকে নতুন নতুন গ্রন্থ, আর তা সমৃদ্ধ হয় বিচিত্র সব বিষয়ে, তখন স্বাভাবিকভাবে পাঠকমাত্রকেই বিস্মিত হতে হয়। সত্যেন সেন উপন্যাস লিখেছেন ১৬টি। সে হিসেবে তিনি ঔপন্যাসিক বা কথা সাহিত্যিক হিসেবেই পরিচিত। উপন্যাস ছাড়া তিনি লিখেছেন স্মৃতিকথা, জীবনী, প্রবন্ধ-নিবন্ধ। লিখেছেন বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ।
সত্যেন সেনের বিজ্ঞান বিষয়ক রচনাসমূহ মূলত কিশোরদের জন্য লেখা। এই পর্যায়ে তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ছয়টি। সত্যেন সেন বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত। সেই প্রাথমিক পাঠ ও বিজ্ঞানের প্রতি আকর্ষণ এবং পরবর্তীকালে আরও বিজ্ঞান পাঠ সত্যেন সেনকে বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ রচনার পথকে প্রশস্ত করে দিয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিজ্ঞানমনস্ক করার উদ্দেশ্য নিয়েই সত্যেন সেন বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ রচনায় হাত দিয়েছেন।
তাঁর বিজ্ঞান বিষয়ক প্রথম গ্রন্থ 'আমাদের এই পৃথিবী' প্রকাশিত হয় ১৯৬৭খ্রিস্টাব্দে। প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি, ঢাকা। পৃথিবীর জন্মকথা, মাটির পৃথিবী, মাধ্যাকর্ষণ, সমুদ্র, মরুভূমি ইত্যাদি বিষয়ে প্রাঞ্জল ভাষায় সরস উপস্থাপন 'আমাদের এই পৃথিবী'।
দ্বিতীয় গ্রন্থ 'এটমের কথা' প্রকাশ হয় ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে। প্রকাশক ওই বাংলা একাডেমি। পরমাণু বিজ্ঞান সম্পর্কিত একটি পরিপূর্ণ গ্রন্থ 'এটমের কথা'। এটমের পরিচয়, পদার্থের গঠন-বৈচিত্র্য, এটমের ওজন, এটমের চেহারা, তেজস্ক্রিয়তা, পরমাণু বিভাজক, এটম বোমা ইত্যাদি সতেরো অধ্যায়ে রচিত 'এটমের কথা একটি সুপাঠ্য বিজ্ঞান বিষয় গ্রন্থ। সত্যেন সেনের নিজস্ব ভাষাভঙ্গিই জটিল বিজ্ঞানের বিষয়গুলো সুখপাঠ্য করেছে।
'জীববিজ্ঞানের নানা কথা' প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে। গ্রন্থনামই গ্রন্থের বিষয়বৈচিত্র্যের পরিচয়বাহী। জীব-বিজ্ঞানের আদিকথা, জৈব আর অজৈব, জড় থেকে জীবে, চিনির বলদ চিনির খবর কি রাখে, রূপান্তরের পথে জিন, জীব থেকে জীবে, জননী জঠরের অন্তরালে ইত্যাদি ষোলোটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত 'জীববিজ্ঞানের নানা কথা'। সরল প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা এ গ্রন্থে রচয়িতা সত্যেন সেন কিশোর উপযোগী সাহিত্য রচনায় মুন্সিয়ানার ছাপ রেখেছেন।
'ইতিহাস ও বিজ্ঞান' সত্যেন সেনের উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ। 'ইতিহাস ও বিজ্ঞান' তিনটি খণ্ড প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ১৯৭৭, ১৯৭৯ এবং ১৯৮৯ সালে। কোনো কোনো আলোচক এই গ্রন্থের চতুর্থ খণ্ডের উল্লেখ করলেও এর প্রকাশ সম্বন্ধে কোনো তথ্য জানা যায়নি। মূলত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জে ডি বার্নালের 'সায়েন্স ইন হিস্ট্রি' গ্রন্থের ছায়া অবলম্বনে সত্যেন সেন রচনা করেন 'ইতিহাস ও বিজ্ঞান' তিন খণ্ড।
প্রায় জীবন সায়াহ্নে (২১ জানু ১৯৪১) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে আক্ষেপ:
বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।
দেশে দেশে কত না নগর রাজধানী—
মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু,
কত-না অজানা জীব, কত-না অপরিচিত তরু
রয়ে গেল অগোচরে।
সেই অজানার অতৃপ্তির সন্ধান মানসই প্রতিফলিত যেন হয় সত্যেন সেনের 'আমাদের এই পৃথিবী' গ্রন্থে। যে বিপুল পৃথিবীতে বাস আমাদের, তার খোঁজ-খবর নিতেই 'আমাদের এই পৃথিবীর' উপস্থাপন। সত্যেন সেনের ভাষায়:
'আমাদের এই পৃথিবীর কথা বলছি। যে পৃথিবীতে আমরা বাস করি, সে পৃথিবীর কথা। কিন্তু তার কতটুকু কথাইবা আমরা জানতে পেরেছি। আমরা ৩০০ কোটি মানুষ যেখানে ঘর বেঁধে বাস করছি, সেখানকার অনেক খবরই তো আমাদের জানা নেই।'
এই 'জানা নেই'-কে জানাতে সত্যেন সেন রচনা করেছেন এই গ্রন্থ। মোট দশটি অধ্যায়ে পৃথিবীর জন্ম কথা থেকে শুরু করে নানা বিষয়
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments