যাত্রাবদল
ভাটপাড়াতে পিসিমার বাড়ি গিয়েছিলুম বড়োদিনের ছুটিতে। সারাদিন বাড়িতে বসে থেকে ভালো লাগল না। বিকেলের দিকে নৈহাটি স্টেশনে বেড়াতে গেলুম। তখন দেশেই থাকি, বিদেশে বেরুনো অভ্যেস নেই, এত বড়ো স্টেশন ঘনিষ্টভাবে দেখবার সুযোগ বড়ো একটা হয়নি। ডাউন প্ল্যাটফর্মের ওধারে প্রকাণ্ড ইয়ার্ডটা মালের ওয়াগনে ভরতি, ওভারব্রিজের ওপর দিয়ে যাত্রীরা পোঁটলাপুঁটলি নিয়ে যাতায়াত করছে, নানাধরনের লোকের ভিড়, নানারকমের শব্দ—দুখানা পাইলট এঞ্জিন ইয়ার্ডের মধ্যে ওয়াগনের সারি টানাটানিতে ব্যস্ত…ওপারের গাড়ি একখানা ছেড়ে গেল, আর একখানা এখুনি আসবে…বাজারের দিকে সাইডিং লাইনে দু খানা কেরোসিন তেলের ট্যাঙ্ক বসানো গাড়ি থেকে তেল নামাচ্চে।…এত মাছি প্ল্যাটফর্মে, কোথাও স্থির হয়ে দাঁড়াবার জো নেই, বসবার জো নেই, যেখানে যাই সেখানেই মাছি ভন ভন করে; চা খাওয়ার ইচ্ছে ছিল কিন্তু স্টলের অবস্থা দেখে সেখানে বসে কিছু খেতে প্রবৃত্তি হল না। প্ল্যাটফর্মের ওধারে একটা ছোটো ঘর, দোর বন্ধ, ঘরটার আশেপাশে পুরোনো স্লিপার ও ফিশ-প্লেট পড়ে আছে রাশীকৃত, একটি ক্ষুদ্র কুলিপরিবার সেখানে তেরপলের তাঁবু খাটিয়ে তোলা-উনুনে আঁচ দিয়েছে।
হঠাৎ প্ল্যাটফর্মের সবাই একটু সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। সবাই যেন প্ল্যাটফর্মের ধারে ঝুঁকে কলকাতার দিকে চেয়ে কী দেখবার চেষ্টা করতে লাগল—একজন হিন্দুস্থানী যাত্রী প্ল্যাটফর্মের নিতান্ত ধারে দাঁড়িয়ে চোখ মুছতে ব্যস্ত—ওপার থেকে একজন কুলি তাকে হেঁকে বললে—এ আঁখ পুছনেওয়ালা, হঠ যাইয়ে, ডাকগাড়ি আতা হ্যায়—
কাছের একটি ভদ্রলোক যাত্রীকে জিজ্ঞেস করলুম—কোন ডাকগাড়ি মশাই?
তিনি বলেন, দার্জিলিং মেলের সময় হয়েছে—
একটু পরেই ধুলো-কুটো উড়িয়ে একটা ছোটোখাটো ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি করে স্টেশন কাঁপিয়ে দার্জিলিং মেল বেরিয়ে গেল এবং সে শব্দ থামতে-না-থামতে ডাউন প্ল্যাটফর্মে একখানা প্যাসেঞ্জার ট্রেন সশব্দে এসে দাঁড়াল।
একটু পরে দেখি যে প্ল্যাটফর্মে একটা গোলযোগ উঠেছে। অনেক লোক ওভারব্রিজের ওপর দিয়ে ডাউন প্ল্যাটফর্মের দিকে ছুটে যাচ্ছে—সবাই যেন কী বলচে-ট্রেনটা ছাড়তেও খানিকটা দেরি হল। তারপরে ট্রেনখানা ছেড়ে গেলে দেখলাম প্ল্যাটফর্মের এক জায়গায় অনেক লোকের ভিড়, গোল হয়ে ঘিরে দাঁড়িয়ে। সবাই কী যেন দেখছে।
ভিড় ঠেলে ঢুকতে না-পেরে একজনকে জিজ্ঞেস করতে সে যা বললে তার মর্ম এই যে মুর্শিদাবাদের ওদিক থেকে একটি ভদ্রলোক সপরিবারে এইখানে গাড়ি বদলাবার জন্যে নেমেছিলেন পশ্চিমের লাইনে যাবার জন্যে, তাঁর স্ত্রী প্ল্যাটফর্মে নেমেই হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যান, সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে অজ্ঞান নয়, তিনি মারাই গেছেন।
লোকের ভিড় পুলিশ এসে সরিয়ে দিল। তারপর একটা অতিকরুণ দৃশ্য চোখে পড়ল। গোটাদুই স্টিলের তোরঙ্গ, একটা ঝুড়ি, গোটাচারেক ছোটো-বড়ো পুঁটুলি— একটা মানকচু ও এক নাগরি খেজুরের গুড় এদিক-ওদিকে আগোছালো ভাবে ছড়ানো—গৃহস্থালীর এই দ্রব্যাদির মধ্যে একটি পাড়াগাঁয়ের বউয়ের মৃতদেহ, রং ফর্সা, বয়স কুড়ি-বাইশের বেশি নয়। বউটির মাথার কাছে একটি মধ্যবয়সি ভদ্রলোক, গায়ে কালো বুকখোলা কোট—কাঁধে একখানা জমকালোপাড় ও কল্কাদার সস্তা আলোয়ান, পায়ে ডার্বি জুতো, পাড়াগাঁয়ের অর্ধশিক্ষিত ভদ্রলোকের পোশাক। তাঁর কোলে একটি বছর আড়াই বয়সের ছোটো ছেলে—মায়ের মতো ফর্সা, চুলগুলি কোঁকড়া কোঁকড়া, হাতে কী একটা নাড়াচাড়া করচে ও এক একবার বিস্ময়ের দৃষ্টিতে সমাগত লোকের ভিড়ের দিকে চাইচে। মায়ের মৃতদেহের চেয়েও তার কাছে বেশি কৌতূহলের বিষয় হয়েছে চারিধারে এই গোলমাল ও অদৃষ্টপূর্ব লোকের ভিড়।
একটু পরে সাহেব স্টেশনমাস্টার ও তাঁর সঙ্গে একজন ভদ্রলোক এলেন। বুঝতে দেরি হল না যে ভদ্রলোকটি ডাক্তার, তিনি বউটির নাড়ি দেখলেন, চোখ দেখলেন, স্টেশনমাস্টারের সঙ্গে কী কথা হল তাঁর, স্বামীটির সঙ্গেও কী যেন বললেন, তারপর তাঁরা চলে গেলেন।
মৃত্যুই তা হলে ঠিক!…
কৌতূহলী জনতা আরও খানিকক্ষণ তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল—মৃত পল্লি বধূ, তার শোকস্তবু স্বামী, অবোধ ক্ষুদ্র পুত্র ও তাদের ঘর-গৃহস্থালীর সাধের দ্রব্যাদি। তারপর একে একে যে যার কাজে চলে গেল—আরও নতুন দল
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments