ভিনদেশি এক মুক্তিযোদ্ধার কথা
লেখক: ফাদার রিগন
'১৯৭১-এর ১ মার্চ আমি ছিলাম ঢাকায়। ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলেন। পূর্ব বাংলায় সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ঘৃণা আর প্রতিবাদের উত্তাল তরঙ্গ। এই তরঙ্গের আছাড়েই আমি আমার কর্মক্ষেত্র বানিয়ারচরে ফিরে এলাম। এরপর আরও অস্থিরতা! অপেক্ষা একটি স্বাধীনতা যুদ্ধ!'
এভাবে ধীরে ধীরে ব্যাপক পরিসরে ফাদার মারিনো রিগনের ডায়েরিতে উঠে এসেছে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধের চিত্র। তাঁর দিনলিপির পাতায় পাতায় ১৯৭১ সালে তিনি ইতালীয় ভাষায় লিখে রাখেন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির ওপর পাকসেনাদের আর তাদের এই দেশীয় দোসর রাজাকারদের অত্যাচারের কথা।
ক্যাথলিক এই ধর্মযাজকের বয়স হয়েছে ৮২ বছর। জীবনের বড় অংশটি তিনি কাটিয়েছেন বাংলাদেশের বুকে। ইতালীয় এই মানুষটি ১৯৫৩ সাল থেকে এ দেশের আলো-বাতাস-মাটিতে লালিত হয়েছেন। ১৯৭১ সালে এই ভূখণ্ডের স্বাধীনতাকামী মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবার দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
যুদ্ধের নয় মাস ফাদার রিগন নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। ১৯৭১ সালে লেখা তার সেই রোজনামচা গত ডিসেম্বরে স্বাধীনতার ৩৬ বছর পর তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সমর্পণ করেছেন।
১৯৭১ সালে মারিনো রিগন ছিলেন তৎকালীন ফরিদপুর, আজকের গোপালগঞ্জ জেলার মোকসেদপুর উপজেলায় বানিয়াচর গ্রামের ক্যাথলিক গির্জার প্রধান যাজক। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য সহকর্মী ডাক্তার লক্ষীবাবু এবং সিস্টার ইমেলদাকে নিয়ে বানিয়ারচর গির্জায় তিনি একটি হাসপাতাল গড়ে তোলেন। কাজটি করতে হয়েছিল গোপনে, অনেক ঝুঁকি মাথায় নিয়ে।
গির্জার এই চিকিৎসাকেন্দ্রে দিনে আশপাশের সাধারণ রোগীদের সেবা দেওয়া হতো। রাতে বদলে যেত চেহারা। ফাদার নিজে উপস্থিত থেকে চিকিৎসা করতেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের। আবার যোদ্ধাদের ঘাটিতে গোপনে পৌছে দিতেন চাল-ডাল-টাকা।
যুদ্ধের পর ফাদার রিগন অনেক বিধবা নারীকে পুনর্সাসিত হতে সহায়তা করেন। মুক্তিযুদ্ধে ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও বরিশালের একটি অংশে তৎপর হেমায়েত বাহিনীর প্রধান মো. হেমায়েত উদ্দীন বীর বিক্রমের ভাষায়, 'তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি বন্ধু।'
রিগনের ১৯৭১: প্রথম আলোকে ফাদার রিগন বলেন, 'যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তারাই জয়ী। আমরা যারা বেঁচে আছি তারা স্বাধীনতার সুখ বা সুবিধাভোগী। আবার শহীদ হলেও অনেকের নাম হয়তো ইতহাসে নেই। এতে শহীদদের কিছুই যায়-আসে না। কারণ বিজয়ের প্রকৃত স্বাদ তারাই পেয়েছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেয়ে বড় কোনো সত্য নেই-ফাদার রিগনের উপলব্ধি এবং প্রত্যক্ষ জ্ঞান। দীর্ঘ আলাপে ৩৬ বছর বয়সী স্বাধীনতার অনেক প্রসঙ্গই তিনি ছুয়ে যান। আবার 'প্রকাশ না করলেই ভালো' এমন কথাও তিনি বলেছেন।
নিজের অনেক বেদনার কথাও বলেন ফাদার রিগন। তিনি বলেন, 'বঙ্গবন্ধু আমার বন্ধু ছিল। আমাকে সে খুব ভালোবাসত ১৫ আগস্টের ঘটনা শুনে আমি অবাক হয়ে যাই। কী যে কষ্ট পেয়েছি তা বলে বোঝাতে পারব না।'
১৯৭১ সালে রামশীল গ্রামে পাক হানাদারদের সঙ্গে হেমায়েত বাহিনীর তুমুল যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধে হেমায়েতের ঘনিষ্ঠ সহচর মকবুল মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তাঁর লাশটি সরাতে গিয়ে হেমায়েতের মুখে গুলি লাগে। গুলি তার মুখের বাঁ-পাশ দিয়ে ঢুকে ডান চোয়ালের ১১টি দাসসহ বেরিয়ে যায়। জিহ্বার একটা টুকরোও পড়ে যায়। ওই যুদ্ধে পাক বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা ছিল ১৫৮।
প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে হেমায়েত ফিরে যান সেই সময়ে। রামশীল গ্রামে গুলিতে আহত হয়ে তিনি তাঁর বাহিনীতে থাকা চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। কিন্তু কয়েক দিনেও তার মুখের ঘা শুকাচ্ছিল না।
হেমায়েত বলেন, ১৯৭১-এর ১৪ জুলাই গুলি খেয়েছি। এর পাঁচ-সাত দিন পরে ফাদারের গোপন চিকিৎসাকেন্দ্রে যাই। তাঁর সহযোগিতায় আমি নতুন জীবন পেয়েছি। গুলিটি বের করা না হলে আমার মাথা-মুখে পচন ধরত। গুলি খাওয়ার পর মুখ এত বিকৃত অবস্থায় ছিল যে আমার বাহিনী আমার অবস্থা দেখে শঙ্কিত হয়ে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments