খুকীর কাণ্ড
হরি মুখুয্যের মেয়ে উমা কিছু খায় না। না-খাইয়া রোগা হইয়া পড়িয়াছে বড়।
উমার বয়স এই মোটে চার। কিন্তু অমন দুষ্টু মেয়ে পাড়া খুঁজিয়া আর একটি বাহির করো তো দেখি!… তাহার মা সকালে দুধ খাওয়াতে বসিয়া কত ভুলায়, কত গল্প করে, সব মিথ্যা হয়। দুধের বাটিকে সে বাঘের মতো ভয় করে—মায়ের হাতে দুধের বাটি দেখিলেই সোজা একদিকে টান দিয়া দৌড়।
মা বলে—রও দুষ্টু মেয়ে, তোমার দুষ্টুমি আমি…দুধ খাবেন না, সুজি খাবেন না, খাবেন যে কী দুনিয়ায় তাও তো জানিনে—চলে আয় ইদিকে…
খুকী নিরুপায় দেখিয়া কান্না শুরু করে। তাহার মা ধরিয়া ফেলিয়া জোর করিয়া কোলে শোয়াইয়া ঝিনুক মুখে পুরিয়া দুধ খাওয়ায়। কিন্তু জোরজবরদস্তিতে অর্ধেকের উপর ছড়াইয়া–গড়াইয়া অপচয় হয়, বাকি অর্ধেকটুকু কায়ক্লেশে খুকির পেটে যায় কী না যায়।
সময়ে সময়ে সে আবার মায়ের সঙ্গে লড়াই করে। চার বছর বয়স বটে, না খাইয়া খাইয়া কাটি কাটি হাত-পাও বটে, কিন্তু তাহাকে কায়দায় ফেলিতে তাহার মায়ের এক-একদিন গলদঘর্ম। রাগ করিয়া মা বলে—থাক আপদ বালাই কোথাকার, না-খাস তো বয়ে গেল আমার সারাদিন খেটে খেটে মুখে রক্ত উঠবে, আবার ওই দস্যি মেয়ের সঙ্গে দিনে পাঁচবার কুস্তি করে দুধ খাওয়াবার শক্তি আমার নেই—মর শুকিয়ে।
খুকী বাঁচিয়া যায়, ছুটিয়া এক দৌড়ে বাড়ির সামনের আমতলায় দাঁড়াইয়া চেঁচাইয়া সমবয়েসি সঙ্গিনীকে ডাকে—ও নেনু-উ-উ–
তাহার বাবা একদিন বাড়িতে বলিল—দেখো, খুকীটাকে আজ দিন পনেরো ভালো ক’রে দেখিনি—আসবার সময় দেখি পথের ওপর খেলা কচ্ছে, এমনি রোগা হয়ে গিয়েছে যেন চেনা যায় না, পিঠটা সরু, কণ্ঠার হাড় বেরিয়েছে, অসুখ-বিসুখ নেই, দিন দিন ওরকম রোগা হয়ে পড়ছে কেন বলো তো?
খুকীর মা বলে—পড়বে না আর রোগা হয়ে? সারা দিনরাতে ক-ঝিনুক দুধ পেটে যায়? মরে মরুক, আমি আর পারিনে লড়াই করতে…কে এখন ওই দস্যি মেয়েকে রোজ রোজ যায় দুধ খাওয়াতে? যাই ওর কপালে থাকে তাই হোক গে…
তাই হয়! দস্যি মেয়ে শুকাইতে থাকে!
ভাদ্র মাস, হঠাৎ বর্ষা বন্ধ হইয়া রৌদ্র বড়ো চড়িয়া উঠিয়াছে, গ্রামের ডোবা পুকুরে সারা গাঁয়ের পাটখেতের পাটের আঁটি ভিজানো। নদীর ধারে কাশের ফুল ফুটিয়াছে।
গ্রামের হীরু চক্রবর্তীর অড়াতে এই সময় কাজকর্মের বড়ো ভিড়। নানা দেশের ধানের ও পাটের নৌকো সব গঙ্গার ঘাটে জড়ো হইয়াছে। হরিশ যুগী অড়াতের কয়ালকাঁটার ফেৰ্তায় এক মণ ধানে, আরও সের দশেক ঢুকাইয়া লওয়া— তাহার কাছে ছেলেখেলামাত্র। হাঙরের মুখখখাদাই বড়ো একখানা মহাজনি নৌকো হইতে ধানের বস্তা নামিতেছে, পটপটি গাছের ছায়ায় উঁচু-করা ধানের স্থূপ হইতে হরিশ সুরসংযোগে কাঁটায় করিয়া ধান মাপিতেছে—রাম—রাম—রাম হে রাম— রাম হে দুই—দুই-দুই—দুই হে তিন—তিন তিনি…
গফুর মাঝি ডাবা হুকায় তামাক টানিতে টানিতে বলিতেছে—তা নেন গো কয়াল মশাই, একটু হাত চালিয়ে নেন দিকি, মোরা একবার দেখি? ইদিকি নোনা গাঙের গোন নামলি কী আর নৌকো বাইতি দেবানে?
হরি মুখুয্যে মহাশয়কে একটু ব্যস্তসমস্তভাবে আসিতে দেখিয়া হীরু চক্রবর্তী বলিলেন—আরে এসো হরি, কী মনে করে?…এসো তামাক খাও…
—না থাক—তামাক—ইয়ে আমার মেয়েটাকে ইদিকে দেখেছ হীরু? …বড়ো মুশকিলে ফেলেছে বাঁদর মেয়ে…বারোটা বাজে, সেই বাড়ি থেকে নাকি বেরিয়েছে সকাল ন-টার সময়…একটু দেখি ভাই খুঁজে, এত জ্বালাতনও করে তুলেছে মেয়েটা, সে আর তোমাকে কী বলব…
অনেক খোঁজাখুঁজির পরে রায়বাড়ির পথে উমাকে ধুলার উপর পা ছড়াইয়া বসিয়া কী একটা হাতে লইয়া চুষিতে ও আপন মনে বকিতে দেখা গেল।
ওরে দুষ্টু মেয়ে…
হরি মুখুয্যে গিয়া মেয়েকে কোলে তুলিয়া লইলেন। বাবার কোলে উঠিতে পাইয়া উমা খুব খুশি হইল, হাত-পা নাড়িয়া বলিতে লাগিল—বাবা, ও বাবা…ওই ওদের নাদু ভারি দুত্ত…এই, এই দুধ এই খায়
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments