আচার্য কৃপালিনী কলোনি
আমার স্ত্রী আমাকে কেবলই খোঁচাইতেছিলেন।
পূর্ববঙ্গে বাড়ি। এই সময় জমি না-কিনিলে পশ্চিমবঙ্গে ইহার পরে আর জমি পাওয়া যাইবে কি? কলিকাতায় জমি ও বাড়ি করিবার পয়সা আমাদের হাতে নাই, কিন্তু পনেরোই আগস্টের পরে কলিকাতার কাছেই বা কোথায় জমি মিলিবে? যা করিবার এইবেলা করিতে হয়।
সুতরাং চারিদিকে জমি দেখিয়া বেড়াই। দমদম, ইছাপুর, কাশীপুর, খড়দহ, ঢাকুরিয়া ইত্যাদি স্থানে। রোজ কাগজে দেখিতেছিলাম জমি ক্রয়-বিক্রয়ের বিজ্ঞাপন। পূর্ববঙ্গ হইতে যেসব হিন্দুরা আতঙ্কগ্রস্ত হইয়া চলিয়া আসিতেছেন, তাঁহাদের অসহায় ও উদভ্রান্ত অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করিতে বাড়ি ও জমির মালিকেরা একটুও বিলম্ব করেন নাই। এক বৎসর আগে যে জমি পঞ্চাশ টাকা বিঘা দরেও বিক্রয় হইত না, সেইসব পাড়াগাঁয়ের জমির বর্তমান মূল্য সাত আটশো টাকা কাঠা।
বহুস্থানে খুঁজিয়া খুঁজিয়া হয়রান হইলাম।
কলিকাতার খুব কাছাকাছি জমির দর অসম্ভবরূপে চড়িয়াছে, আমাদের সাধ্য নাই ওসব স্থলে জমি কিনিবার। তা ছাড়া জমি পছন্দই বা হয় কই?
এমন সময়ে আমার স্ত্রী একখানা কাগজ আনিয়া হাতে দিলেন। বলিলেন— তোমার তো জমি পছন্দই হয় না। ঠগ বাছতে গাঁ উজোড় করে ফেললে। সিনারি নেই তো কী হয়েছে? এটা পছন্দ হয় না, ওটা পছন্দ হয় না। এবার কী আর কিনতে পারবে কোথাও? যাও এটা দেখে এসো। খুব ভালো মনে হচ্ছে। তোমার মনের মতো। পড়ে দ্যাখো—
আমাকে আমার স্ত্রী যাহাই ভাবুন, হিম হইয়া বসিয়া আমি নাই। সত্যিই খুঁজিতেছি, মন-প্রাণ দিয়াই খুঁজিতেছি। ভালো জিনিস পাইলে আমার মতো খুশি কেহই হইবে না।
বলিলাম—এ কাগজ কোথায় পেলে?
—বীণাদের বাড়ি গিয়েছিলাম। ওরাও জমি খুঁজচে, ওদের দেশ থেকে সব উঠে আসচে ইদিকে, কলকাতার আশেপাশে। ওরা এটা কোথা থেকে আনিয়েছে।
পড়িয়া দেখিলাম—লেখা আছে—
‘আচার্য কৃপালনী কলোনি।’
আজই আসুন! দেখুন! নাম রেজেস্ট্রি করুন!!!
‘কলিকাতার মাত্র কয়েক মাইল দূরে অমুক স্টেশনের সংলগ্ন সুবিস্তৃত ভূখণ্ডে এই বিরাট নগরটি গড়িয়া উঠিতেছে। সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য। কলোনির পাদদেশ ধৌত করিয়া স্বচ্ছসলিলা পুণ্যতোয়া জাহ্নবী বহিয়া যাইতেছেন। পঞ্চাশ ফুট চওড়া রাস্তা, ইলেকট্রিক আলো, জলের কল, স্কুল, গ্রন্থাগার, নাগরিক জীবনের সমস্ত সুখ-সুবিধাই এখানে পাওয়া যাইবে। আপাতত পঞ্চাশটি টাকা পাঠাইলেই নাম রেজেস্ট্রি করিয়া রাখা হইবে।
স্টেশনের নাম পড়িয়া মনে হইল, কলিকাতার কাছেই বটে।
আমার স্ত্রী বলিলেন—দেখলে? ভালো না?
—খুব ভালো। বীণার কাকা জমি নিয়েচেন এখানে?
—না, নেবেন। নাম রেজেস্ট্রি করেছেন। তুমি ওঁর সঙ্গে দেখা করে পঞ্চাশটি টাকা পাঠিয়ে দাও। কাঠা-পিছু পঞ্চাশ টাকা পাঠিয়ে দিতে হবে, জমি পরে দেখো। উনিও তো দেখেননি এখনও।
—জমি দেখব না? আচ্ছা, বীণার কাকাকে জিগ্যেস করি। বীণার কাকার নাম চিন্তাহরণ চক্রবর্তী। চিরকাল বিদেশে চাকুরি করিয়াছেন, কোথাও বাড়িঘর করেন নাই, জমি-বাড়ি সম্বন্ধে খুব উৎসাহ। আগে-আগে ভাবিয়া আসিয়াছেন কলিকাতায় বাড়ি করিবেন, সম্প্রতি সে আশা ত্যাগ করিয়াছেন।
চিন্তাহরণবাবু বলিলেন—আসুন। ও কাগজটা আপনি দেখেছেন? ভালো জায়গাই বলে মনে হচ্ছে।
—একটু দূরে হয়ে যাচ্ছে না কী?
—ওর চেয়ে কাছে আর কোথায় পাবেন মশাই?
—তা বটে। স্টেশনের কাছেই, গঙ্গার পারে।
—এখনও সস্তা আছে। এর পরে আর থাকবে না। ইলেকট্রিক আলো, জলের কল, পঞ্চাশ ফুট চওড়া রাস্তা
—আপনি টাকা পাঠিয়েছেন?
—নিশ্চয়। রসিদ এসে গিয়েছে। আপনি যদি নেবার মত করেন তবে টাকা পাঠিয়ে দিন।
—জমি না-দেখেই?
—ও মশাই, এইবেলা নাম রেজেস্ট্রি করে রাখুন। এর পরে আর পাবেন না। ঠিকানাটা হচ্ছে—দি নিউ ন্যাশনাল ল্যান্ড ট্রাস্ট। রাজীবনগর।
আমার স্ত্রী আমার নামের রসিদ দেখিয়া খুশি হইলেন। বলিলেন—কাঠা-পিছু পঞ্চাশ টাকা। ক-কাঠার জন্যে টাকা পাঠালে, মোটে দু-কাঠা?
—এখন এই থাক। পনেরোই আগস্ট কেটে যাক। সীমানা কমিশনের রায় বের হোক। পরে—
পনেরোই আগস্ট পার হয়ে গেল।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments